কী ঘটেছিল কারবালায়?

মরুভূমির বুকে যেখানে বালি আর আকাশ একাকার হয়ে মিলে যায়, সেখানে লেখা হয়েছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবিধুর রক্তিম অধ্যায়। ইরাকের ফুরাত নদীর তীরে, কারবালার প্রান্তরে সেদিনও সূর্য উঠেছিল অন্যদিনের মতোই। কিন্তু সেই সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই ইতিহাস নিজ বুকে ধারণ করেছিল এমন এক ক্ষত, যা চৌদ্দশ বছর পরে আজও দগদগে। কারবালা—যে নামটি উচ্চারণ করলে আজও অসংখ্য মানুষের বুকে একটি দীর্ঘশ্বাস জেগে ওঠে। কারবালার মাটি শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নয়, কারবালার মাটি সত্য ও মিথ্যার চিরকালীন সংজ্ঞাতের প্রতীক; কালো ও সাদার পার্থক্যকারী। পটভূমি সময় তখন ৬০ হিজরি। পরপারে পাড়ি জমান কাতিবে ওহী হজরত মুয়াবিয়া রাজিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। তার মৃত্যুর পর দামেস্কের মসনদে বসেন ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়া। মসনদে বসেই তিনি তার আসল রূপ দেখাতে শুরু করেন। যারা তার বায়আত গ্রহণ করতে সম্মত হননি, তাদের সকলের ওপর শুরু হয় কঠোর চাপ। ক্রমান্বয়ে সেই চাপ নির্মম নির্যাতনে রূপান্তরিত হয়। ইতিহাসের সেই ক্রান্তিকালে হিজাজ ও মদিনার সকলেই তাকিয়ে ছিলেন হজরত হোসাইন, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাজিয়াল্লাহ আনহুম প্রমুখ সাহাবির কর

কী ঘটেছিল কারবালায়?

মরুভূমির বুকে যেখানে বালি আর আকাশ একাকার হয়ে মিলে যায়, সেখানে লেখা হয়েছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবিধুর রক্তিম অধ্যায়। ইরাকের ফুরাত নদীর তীরে, কারবালার প্রান্তরে সেদিনও সূর্য উঠেছিল অন্যদিনের মতোই। কিন্তু সেই সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই ইতিহাস নিজ বুকে ধারণ করেছিল এমন এক ক্ষত, যা চৌদ্দশ বছর পরে আজও দগদগে।

কারবালা—যে নামটি উচ্চারণ করলে আজও অসংখ্য মানুষের বুকে একটি দীর্ঘশ্বাস জেগে ওঠে। কারবালার মাটি শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নয়, কারবালার মাটি সত্য ও মিথ্যার চিরকালীন সংজ্ঞাতের প্রতীক; কালো ও সাদার পার্থক্যকারী।

পটভূমি

সময় তখন ৬০ হিজরি। পরপারে পাড়ি জমান কাতিবে ওহী হজরত মুয়াবিয়া রাজিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। তার মৃত্যুর পর দামেস্কের মসনদে বসেন ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়া। মসনদে বসেই তিনি তার আসল রূপ দেখাতে শুরু করেন। যারা তার বায়আত গ্রহণ করতে সম্মত হননি, তাদের সকলের ওপর শুরু হয় কঠোর চাপ। ক্রমান্বয়ে সেই চাপ নির্মম নির্যাতনে রূপান্তরিত হয়।

ইতিহাসের সেই ক্রান্তিকালে হিজাজ ও মদিনার সকলেই তাকিয়ে ছিলেন হজরত হোসাইন, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাজিয়াল্লাহ আনহুম প্রমুখ সাহাবির কর্মপন্থার দিকে।  

সে সময়ে ইয়াজিদের নির্দেশে মদিনার প্রশাসক ওয়ালিদ ইবনে উতবা কর্তৃক হজরত হোসাইন (রা). ও হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরকে (রা.) বায়আতের জন্য তলব করা হলে তাঁরা বায়আত গ্রহণ করতে প্রত্যাখ্যান করেন এবং মদিনা ছেড়ে মক্কায় চলে যান। ইতিহাসবিদদের মতে, রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিলুপ্ত করে খোলাফায়ে রাশিদিনের শুরাভিত্তিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকেই তাঁরা ইয়াজিদের হাতে বায়আত গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন।  

এদিকে কুফার লোকেরা তখন হজরত হোসাইন রাজিয়াল্লাহু আনহুকে কুফায় এসে খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য চিঠির পর চিঠি লিখতে থাকেন। হাজার হাজার পত্রে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, ‘আসুন, আমরা আপনার সঙ্গে আছি; আমরা হাতে বায়আত হতে চাই।’

এমন অবস্থায় বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য হজরত হোসাইন রাজিয়াল্লাহু আনহু’র পক্ষ থেকে হজরত মুসলিম ইবনে আকিলকে দূত হিসেবে কুফায় পাঠানো হয়। তিনি কুফার সন্তোষজনক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে একটি চিঠি প্রেরণ করেন।

এই চিঠি হজরত হোসাইন (রা).-এর কাছে পৌঁছাতে তিন-চার সপ্তাহ সময় লাগে। আর এ সময়ের মধ্যেই কুফার পরিস্থিতি বদলে যায়। ইয়াজিদ তখন নুমান ইবনে বাশিরকে (রা.) কুফার গভর্নরের পদ থেকে সরিয়ে উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে দায়িত্ব দেন। ইবনে জিয়াদ কুফার গভর্নরের পদে বসেই মুসলিম ইবনে আকিলকে হত্যা করে, কিন্তু এই হত্যার বিষয়টি তখন হজরত হোসাইন (রা.)-এর অজানা ছিল।

অন্যদিকে, কুফার উৎসাহী জনতাকে ইয়াজিদের প্রতিনিধি উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ একে একে দমন করতে থাকে। ভয়, লোভ ও হুমকির মুখে কুফাবাসীরা ধীরে ধীরে হজরত হোসাইন (রা.)-এর পক্ষ থেকে সরে যেতে থাকেন।

কারবালা প্রান্তর: প্রেক্ষাপট ও প্রাথমিক শান্তির প্রস্তাবসমূহ

হিজরি ৬১ সনের মহররম মাসে হজরত হোসাইন (রা.) তাঁর পরিবারের নারী-শিশুসহ মাত্র বাহাত্তর জন সঙ্গী নিয়ে কারবালার প্রান্তরে পৌঁছান। সেখানে তাঁদের মুখোমুখি হয় ইয়াজিদের সেনাপতি উমর ইবনে সাদের নেতৃত্বে কয়েক হাজার সশস্ত্র সৈন্য। রক্তপাত এড়াতে হজরত হোসাইন (রা.) তিনটি প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাব তিনটি হলো, তাঁকে মক্কায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। ইয়াজিদের সাথে সরাসরি সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হোক অথবা সীমান্তে গিয়ে জিহাদের অনুমতি দেওয়া হোক। কিন্তু কুফার গভর্নর ইবনে জিয়াদ এই প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে ।

অবরোধ

যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ের আগে টানা তিন দিন হজরত হোসাইন (রা.)-এর কাফেলার জন্য ফোরাত নদীর পানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা তীব্র পিপাসায় চরম কষ্টে নিপতিত হন। কিন্তু এত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও হজরত হোসাইন (রা.) সত্য, ন্যায় ও আদর্শের অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। অবশেষে ১০ই মহররম, আশুরার দিন সকালে যুদ্ধের সূচনা হয়।

সাথী-সঙ্গীদের বীরত্ব ও শাহাদাত

অসম এই যুদ্ধে হজরত হোসাইন (রা.)-এর সাথীরা অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে একে একে শাহাদাত বরণ করেন। হজরত আব্বাস (রা.), যিনি কারবালার পতাকাবাহক হিসেবে পরিচিত, তিনি শিবিরের শিশুদের জন্য পানি আনার উদ্দেশে ফোরাতের দিকে অগ্রসর হন। ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে বর্ণিত আছে যে, এ সময় তিনি গুরুতর আক্রমণের শিকার হন এবং শেষ পর্যন্ত শাহাদাত বরণ করেন।

আলি আসগর (রাহি.) হজরত হোসাইন (রা.)-এর মাত্র ছয় মাস বয়সী দুগ্ধপোষ্য শিশু। কারবালার প্রান্তরে যখন তীব্র পিপাসা ও পানির সংকট চরমে পৌঁছে, তখন তাঁর জন্য সামান্য পানির আবেদন জানানো হয়। কিন্তু নির্মমতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শত্রুপক্ষ ইয়াজিদের বাহিনি শিশুটির দিকে তীর নিক্ষেপ করে, ফলে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর এই মর্মান্তিক শাহাদাত কারবালার ঘটনার অন্যতম হৃদয়বিদারক অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

হজরত হোসাইন (রা.)-এর অলৌকিক বীরত্ব

হজরত হোসাইন (রা.)-এর সকল সাথী শহীদ হওয়ার পর তিনি একা হয়ে পড়েন। কিন্তু সে সময়েও তাঁর তেজস্বী রূপ দেখে শত্রুপক্ষের কেউ শুরুতে তাঁর দিকে অগ্রসর হওয়ার সাহস পাচ্ছিল না, কারণ একে তো তিনি অসীম সাহসী চিতার মতো লড়ছিলেন, দ্বিতীয়ত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৌহিত্রের রক্তে হাত রাঙিয়ে মহাপাপের বোঝা বহন করতে কেউ চাচ্ছিল না। এই সময় ‘কিন্দা’ গোত্রের অভিশপ্ত মালিক ইবনে নুসাইর হজরত হোসাইন (রা.)-এর মাথায় তলোয়ারের আঘাত করলে তিনি মারাত্মক জখম হন। তৃষ্ণায় কাতর হজরত হোসাইন (রা.) তখন ফোরাত নদীর দিকে এগোতে চাইলে হাসীন ইবনে নুমাইরের তীর তাঁর কণ্ঠনালি বিদ্ধ করে।

হজরত হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত

মারাত্মক আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় শিমার দশজনের একটি চৌকস বাহিনী নিয়ে তাঁকে আক্রমণ করে। কিন্তু এক অলৌকিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তিনি একাই এই বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরদর্পে লড়াই চালিয়ে যান এবং তাঁর তীব্র আক্রমণে সুসজ্জিত শত্রু বাহিনী বারবার পিছু হটতে বাধ্য হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, চোখের সামনে পরিবারের সবার মৃত্যু দেখে এবং নিজে ক্ষতবিক্ষত হয়েও এমন দৃঢ়তা প্রদর্শন করা এক অসাধারণ বীরত্বের নজির ছিল। পরিশেষে শিমারের নির্দেশে শত্রুরা সম্মিলিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কলিজার টুকরা হজরত হোসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর এই মহান আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় তাঁকে অমর করে রেখেছে। 

কারবালার চেতনা

কারবালা কোনো সাধারণ যুদ্ধের ইতিহাস নয়। এটি ন্যায় ও অন্যায়ের সংঘর্ষের এক চিরন্তন প্রতীক। হজরত হোসাইন ইবন আলী (রা.) সেদিন শুধু নিজের জীবনই উৎসর্গ করেননি; তিনি এই বার্তাও দিয়েছিলেন যে, অত্যাচারীর সামনে মাথা নত করা মৃত্যুর চেয়েও কঠিন পরাজয়। তাঁর এই আত্মত্যাগ শুধু ইসলামের ইতিহাসেই নয়, সমগ্র মানবজাতির ইতিহাসেও এক অনির্বাণ আলোকশিখা হয়ে আছে। মহররমের চাঁদ উঠলে আজও কোটি মানুষের চোখে জল আসে। সেই কান্না কেবল শোকের নয়, এটি এক শপথেরও অশ্রু। অত্যাচারের বিরুদ্ধে, মিথ্যার বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার সেই শপথ, যা কারবালার মাটি থেকে উঠে আজও প্রতিধ্বনিত হয় প্রতিটি বিবেকবান মানুষের অন্তরে। কারবালা শেষ হয়ে যায়নি। কারবালা প্রতিদিন ঘটে—যেখানেই অন্যায় ও সত্য মুখোমুখি দাঁড়ায়।

তথ্যসূত্র : আল কামিল লিইবনিল আসির ৩/২৮০-২৯৭, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৮/১৭৮-১৮৫, তারিখে তাবারি ৪/৩২০-৩৪১

লেখক : ফতোয়া বিভাগীয় প্রধান, জামিয়াতুল ইসলামিয়া বায়তুস সালাম মিরপুর (১২), ঢাকা

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow