কুয়াকাটায় যেভাবে রাখাইনদের গোড়াপত্তন

ভ্রমণপিয়াসু সবার কাছেই ‘কুয়াকাটা’ নামটি আজ বেশ পরিচিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত কুয়াকাটাকে বলা হয় ‘সাগর কন্যা’। সাগর জলে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগের পাশাপাশি রাখাইন সংস্কৃতিকে কাছ থেকে অনুধাবনের সুযোগ রয়েছে এখানে। দেখা মিলবে, সুউচ্চ ঢেউ আর সাদা ঝিনুকের বালুকাবেলা। উন্মুক্ত প্রাণ-প্রকৃতি, জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্যও যেন মুগ্ধকর। সমুদ্র জলসীমায় মুগ্ধকর লীলাভূমি দেখতে প্রতিদিনই কুয়াকাটায় ছুটে আসে দেশ-বিদেশি পর্যটক। এই সাগর কন্যা কুয়াকাটার গোড়াপত্তনে রয়েছে রাখাইন আদিবাসীর অবদান। চলুন জেনে নিই, রাখাইন সম্প্রদায় ও কুয়াকাটার আদি সম্পর্কের কিছু ইতিকথা। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের দক্ষিণের জনপদ কুয়াকাটা। নৈসর্গিক কুয়াকাটার আদি ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, মিয়ানমার থেকে আগত রাখাইন জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষের হাত ধরে এখানকার মানব সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়। সাগরে ভাসতে ভাসতে আসা রাখাইনরা সুন্দরবন থেকে গাছ কেটে এখানে প্রথম বসতি গড়ে। তাইতো কুয়াকাটা নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাখাইনদের ইতিহাস। উচাচি মাতুব্বর, চানাফ্রু, উত্তর ভিক্ষুসহ কুয়াকাটায় বসবাসরত স্থানীয় রাখাইনদের সঙ্গে কথা বলে জান

কুয়াকাটায় যেভাবে রাখাইনদের গোড়াপত্তন

ভ্রমণপিয়াসু সবার কাছেই ‘কুয়াকাটা’ নামটি আজ বেশ পরিচিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত কুয়াকাটাকে বলা হয় ‘সাগর কন্যা’। সাগর জলে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগের পাশাপাশি রাখাইন সংস্কৃতিকে কাছ থেকে অনুধাবনের সুযোগ রয়েছে এখানে।

দেখা মিলবে, সুউচ্চ ঢেউ আর সাদা ঝিনুকের বালুকাবেলা। উন্মুক্ত প্রাণ-প্রকৃতি, জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্যও যেন মুগ্ধকর। সমুদ্র জলসীমায় মুগ্ধকর লীলাভূমি দেখতে প্রতিদিনই কুয়াকাটায় ছুটে আসে দেশ-বিদেশি পর্যটক। এই সাগর কন্যা কুয়াকাটার গোড়াপত্তনে রয়েছে রাখাইন আদিবাসীর অবদান।

চলুন জেনে নিই, রাখাইন সম্প্রদায় ও কুয়াকাটার আদি সম্পর্কের কিছু ইতিকথা। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের দক্ষিণের জনপদ কুয়াকাটা। নৈসর্গিক কুয়াকাটার আদি ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, মিয়ানমার থেকে আগত রাখাইন জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষের হাত ধরে এখানকার মানব সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়। সাগরে ভাসতে ভাসতে আসা রাখাইনরা সুন্দরবন থেকে গাছ কেটে এখানে প্রথম বসতি গড়ে। তাইতো কুয়াকাটা নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাখাইনদের ইতিহাস।

jagonews

উচাচি মাতুব্বর, চানাফ্রু, উত্তর ভিক্ষুসহ কুয়াকাটায় বসবাসরত স্থানীয় রাখাইনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৭৮৪ সালে বার্মিজ রাজা ‘বোদোপয়া’ আরাকান রাজ্য জয় করেন। তার জয়লাভে ভয় পেয়ে রাখাইন সম্প্রদায়ের বিপুল সংখ্যক মানুষ পালিয়ে এসে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আরাকানের মেঘবতির সান্ধ্যে জেলা থেকে বাঁচার আশায় ৫০টি পরিবার ৫০টি নৌকা নিয়ে অজানা উদ্দেশ্যে বঙ্গোপসাগরে পাড়ি জমায়। প্রায় একমাস পর কূলের সন্ধান মেলে। তারা বর্তমান বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার কিছু এলাকায় নৌকা ভেড়ায়। সেখানেই নিরাপদ বসতি গড়েন তারা। সঙ্গে করে আনা ধান ফলমূলের বীজ বপন করে জমিতে আবাদ শুরু করে। ক্যাপ্টেন প্যোঅং, অক্যো, উগোম্বাগ্রীসহ বেশ কয়েকজন ছিলেন সে সময়ের নেতৃত্বে থাকা বিভিন্ন দলের রাখাইন প্রধান।

চুচিলা মাতুব্বর, লুমা, চোনেসহ স্থানীয় রাখাইনরা জানান, সাগরের নোনা জল পান করতে না পেরে সুপেয় পানির জন্য গভীর কুয়া (কূপ) খনন করে সেই পঞ্চাশটি পরিবার। এই ‘কুয়া’ শব্দটি থেকে পরবর্তীতে এই স্থানের নামকরণ হয় কুয়াকাটা। কূপ ছাড়াও নিজেদের উপাসনা ও বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য তারা স্থাপন করতে থাকেন বৌদ্ধ মন্দির।

কুয়াকাটা সৈকতের বেড়ি বাধেঁর পাশে অবস্থিত শত বছরের পুরানো সীমা বৌদ্ধ মন্দির। চীনের স্থাপত্য সৌন্দর্য অনুকরণে নির্মিত এ মন্দিরের ভেতরে স্থাপিত হয়েছে নবম ধাতুর তৈরি সাড়ে ৩৭ মন ওজনের ধ্যানমগ্ন মূর্তি। মূর্তিটি প্রায় সাড়ে তিন ফুট উঁচু বেদিতে স্থাপিত হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মের আড়াই হাজার বছর পূর্তি উপলক্ষে ৮৩ বছর আগে পৌনে সাত ফুট উচ্চতায় এই মূর্তিটি স্থাপন করেন উপেংইয়া ভিক্ষু। মন্দিরের বাইরে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী সেই কূপগুলোর একটি। চীনের স্থাপত্য অনুকরণ করে পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে শ্রী মঙ্গল বৌদ্ধ বিহার।

jagonewsকুয়াকাটা সৈকত থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে রয়েছে মিস্ত্রিপাড়া। এখানকার রাখাইন সম্প্রদায়ের আরেকটি বসতি সেখানে। উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মূর্তিটি রয়েছে এই মিস্ত্রীপাড়ায়। এ মূর্তিটির উচ্চতা ৩৫ ফুট। মিস্ত্রিপাড়া মন্দিরের সামনে রয়েছে সিমেন্ট দিয়ে তৈরি দুটি বাঘ, যা দেখে মনে হয় জীবন্ত দুটি বাঘ সারাক্ষণ মন্দিরটিকে পাহাড়া দিচ্ছে।

কুয়াকাটায় রাখাইন সম্প্রদায়ের সবচেয়ে ঘন বসতি আমখোলা পাড়া। শতাধিক রাখাইন পরিবারের বসবাস এই পাড়ায়। ছোট বড় মিলিয়ে এখানে বৌদ্ধ মূর্তির সংখ্যা প্রায় ১৭টি। রাখাইন নারীদের পিঠা তৈরি, তাঁত বুনুনসহ উপজাতি রাখাইনদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে-দেখতে দর্শনার্থীরা সময় পেলেই ছুটে যায় আমখোলা পাড়ায়।

রাখাইন সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার পাশাপাশি কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতটিতে রয়েছে অসাধারণ মুগ্ধতা। এ সৈকতটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত। বর্তমানে যার দৈর্ঘ্যে ১৮ কিলোমিটার। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সৈকত কুয়াকাটা, যেখানে একই স্থানে দড়িয়ে দেখা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। পর্যটকদের কাছে এই সৈকতের অন্যতম আকর্ষণ সমুদ্রের বিশাল ঢেউ। সৈকত জুড়ে ঢেউয়ের সঙ্গে আসা সাদা ঝিনুকের দৃশ্যও চোখ জুড়ায়। সৈকত ঘেঁষে রয়েছে সারি সারি ঝাউ ও নারিকেল গাছের সমারোহ।

jagonewsদর্শনার্থীদের সুবিধার্থে শুয়ে শুয়ে সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য রয়েছে সারিবদ্ধ কাঠের বিছানা। রোদ থেকে রক্ষা পেতে সেসব বিছানায় রয়েছে নানা রঙের ছাতা। রয়েছে ভাড়ায় চালিত স্পিডবোট, মোটরসাইকেল, ভ্যান ও ঘোড়া। আর ছবি তোলার জন্য রয়েছে অসংখ্য ফটোগ্রাফার।

রাখাইন সম্প্রদায় ও স্থানীয়রা জানান, কুয়াকাটায় পর্যটক ও রাখাইনদের মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে প্রকৃতিকে ঘিরে। তাইতো সবার কামনা প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গেই সুন্দর ও সুস্থ থাকুক কুয়াকাটার পরিবেশ। ভালো থাকুক রাখাইন সম্প্রদায় ও সাগর কন্যার আাদি ইতিহাস। সুষ্ঠুভাবে সযত্নে থাকুক রাখাইন সংস্কৃতি ও পর্যটকদের আগমন।

আরও পড়ুন
নারী-শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে, কী ভাবছে এই প্রজন্ম?
নারীবাদে নারীর প্রকৃত অবস্থান বনাম পুরুষতান্ত্রিক দ্বিচারিতা

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow