কেমন হলো ইনফান্তিনোর ফুটবল বিশ্বকাপ, বাণিজ্য নাকি রাজনীতি?

ফুটবল এখন আর ৯০ মিনিটের খেলা নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিনোদন শিল্পগুলোর একটি হলো ফুটবল। যেখানে ফুটবলপ্রেমীদের মায়া আর আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার কোটি ডলার বাণিজ্য, কূটনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। বিশ্বায়নের এই যুগে ফুটবলকে বাণিজ্য থেকে আলাদা করা অসম্ভব, তেমনি রাজনীতির ছায়া থেকেও পুরোপুরি মুক্ত রাখাও কঠিনও বটে। ফুটবলপ্রেমীরা মনে করেন, মাঠের লড়াই যেন মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকে। খেলার সৌন্দর্যকে যেন কোনোভাবেই রাজনীতি বা ক্ষমতার প্রভাবে ম্লান না করা হয়। কিন্তু সেটি কী সম্ভব? সেই দায়িত্বের বড় অংশই বর্তায় আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার ওপরেই। আর ফিফার মুখপাত্র হিসেবে সেই দায়িত্ব এখন বহন করছেন সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে ফিফা সভাপতি হিসেবে তৃতীয় বিশ্বকাপ সম্পন্ন করলেন সুইস এই কর্মকর্তা। কিন্তু তার এই যাত্রায় সাফল্য থাকলেও বাড়ছে বিতর্কও। সেপ ব্লাটারের পতনের পর ইনফান্তিনোর উত্থান২০১৫ সালে দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘদিনের ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটার নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিশ্ব ফুটবলে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। সেই পরিবর্তনের ন

কেমন হলো ইনফান্তিনোর ফুটবল বিশ্বকাপ, বাণিজ্য নাকি রাজনীতি?

ফুটবল এখন আর ৯০ মিনিটের খেলা নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিনোদন শিল্পগুলোর একটি হলো ফুটবল। যেখানে ফুটবলপ্রেমীদের মায়া আর আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার কোটি ডলার বাণিজ্য, কূটনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা। বিশ্বায়নের এই যুগে ফুটবলকে বাণিজ্য থেকে আলাদা করা অসম্ভব, তেমনি রাজনীতির ছায়া থেকেও পুরোপুরি মুক্ত রাখাও কঠিনও বটে।

ফুটবলপ্রেমীরা মনে করেন, মাঠের লড়াই যেন মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকে। খেলার সৌন্দর্যকে যেন কোনোভাবেই রাজনীতি বা ক্ষমতার প্রভাবে ম্লান না করা হয়। কিন্তু সেটি কী সম্ভব? সেই দায়িত্বের বড় অংশই বর্তায় আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার ওপরেই। আর ফিফার মুখপাত্র হিসেবে সেই দায়িত্ব এখন বহন করছেন সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে ফিফা সভাপতি হিসেবে তৃতীয় বিশ্বকাপ সম্পন্ন করলেন সুইস এই কর্মকর্তা। কিন্তু তার এই যাত্রায় সাফল্য থাকলেও বাড়ছে বিতর্কও।

jagonews

সেপ ব্লাটারের পতনের পর ইনফান্তিনোর উত্থান
২০১৫ সালে দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘদিনের ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটার নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিশ্ব ফুটবলে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। সেই পরিবর্তনের নেতৃত্বে আসেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ২০১৬ সালে প্রথমবার তিন বছরের জন্য ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ২০১৯ ও ২০২২ সালে টানা আরও দুইবার নির্বাচিত হয়ে নিজের অবস্থান আরও পাকাপোক্ত করেন ইনফান্তিনো। বিশ্বকাপের কাঠামো, আয়োজন এবং বাণিজ্যিক দিক সবখানেই বড় পরিবর্তন এসেছে তার হাত ধরেই।

বিশ্বকাপের ইতিহাস, আরেকটি নতুন অধ্যায়
১৯৩০ সালে প্রথম পুরুষ বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফিফা। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ ছাড়া প্রতি চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রীড়া আসর। বর্তমানে দীর্ঘ বাছাইপর্ব পেরিয়ে ৪৮টি দল মূল পর্বে অংশ নেয়। প্রায় এক মাস ধরে চলা এই টুর্নামেন্ট বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় ক্রীড়া আয়োজনগুলোর একটি।

১৯৯১ সাল থেকে শুরু হয়েছে নারী বিশ্বকাপও। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২২টি আসরে মাত্র আটটি দেশ শিরোপা জিতেছে। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এখনও সবচেয়ে সফল দল। চারটি করে শিরোপা জিতেছে জার্মানি ও ইতালি, তিনবার জিতেছে আর্জেন্টিনা। উরুগুয়ে, ফ্রান্স ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন জিতেছে দুটি করে শিরোপা, আর ইংল্যান্ডের সংগ্রহে একটি।

আয়োজক দেশ
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ প্রথমবারের মতো তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে আয়োজন করলো। ইনফ্যান্তিনোর অধীনে এর আগের বিশ্বকাপ কাতারেও আয়োজন নিয়েও ছিল বিতর্ক।

ইনফান্তিনোর দর্শন কী বলে, ‘যত বেশি দল, তত ভালো’
ফিফা সভাপতির সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত বিশ্বকাপের সম্প্রসারণ। ৩২ দলের বিশ্বকাপকে তিনি বাড়িয়ে করেছেন ৪৮ দলের। তার যুক্তি, ছোট দেশগুলোকে সুযোগ না দিলে তারা কখনোই উন্নতি করার অনুপ্রেরণা পাবে না।

এই যুক্তির বাস্তবতাও দেখা গেছে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে। প্রথমবারের মতো অংশ নিয়ে কেপ ভার্দের মতো দল নজর কেড়েছে সবার। টুর্নামেন্ট শেষে তাদের কোচও বলেছেন, বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরাই ছিল মূল লক্ষ্য। অন্যদিকে, ফুটবলপ্রেমীরাও বড় আসরে নতুন দেশের অংশগ্রহণকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। নতুন প্রতিপক্ষ, নতুন গল্প আর নতুন চমক সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের রঙ আরও বৈচিত্র্যময় হয়েছে।

২০৩০-এ লক্ষ্য ৬৪ দল নিয়ে আয়োজন
৪৮ দলেও থেমে থাকতে রাজি নন ইনফান্তিনো। তার পরবর্তী স্বপ্ন ৬৪ দলের বিশ্বকাপ। এতে গ্রুপের সংখ্যা বেড়ে হবে ১৬টি। প্রতিটি গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুই দল সরাসরি শেষ ৩২-এ উঠবে। ফলে ‘সেরা তৃতীয়’ দলের জটিল হিসাব থাকবে না।

২০২৬ বিশ্বকাপে তৃতীয় হয়ে পরের রাউন্ডে ওঠা আটটি দলই শেষ পর্যন্ত শেষ ষোলোতে পৌঁছাতে পারেনি। সেই জটিলতা দূর করার যুক্তিও দেখাচ্ছে ফিফা। এ ছাড়া বাছাইপর্ব থেকেই ইতালি, ডেনমার্ক, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, সার্বিয়া, ওয়েলস ও পোল্যান্ডের মতো দল বাদ পড়েছিল। ফলে আরও ১৬টি দল যোগ হলেও মানের বড় অবনতি হবে না এমন মতও রয়েছে।

বাণিজ্যের নতুন মুখ
ইনফান্তিনোর সমর্থকরা বলেন, তিনি বিশ্বকাপকে আরও বৈশ্বিক করেছেন। অন্যদিকে, সমালোচকরা বলেন, তিনি বিশ্বকাপকে আরও বেশি বাণিজ্যিক করেছেন। ৪৮ দল, বেশি ম্যাচ, নতুন টুর্নামেন্ট, ক্লাব বিশ্বকাপের সম্প্রসারণ, মধ্যবিরতির নতুন বিনোদন হাইড্রেশন ব্রেক সবকিছুর পেছনেই অর্থনৈতিক হিসাব দেখেন অনেকে। তার দর্শনকে অনেকেই এক বাক্যে ব্যাখ্যা করেন-যত বেশি ম্যাচ, তত বেশি দর্শক; যত বেশি দর্শক, তত বেশি আয়।

সাফল্যের আড়ালে রাজনৈতিক বিতর্ক
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়া। বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী, লাল কার্ডের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ নেই। পরের ম্যাচে খেলোয়াড়কে নিষিদ্ধই থাকার কথা। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই সিদ্ধান্ত বদলে যায়। ফিফা পরে দীর্ঘ বিবৃতি দিলেও সিদ্ধান্তের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমিই তাদের দিয়ে এটা করিয়েছি।’এই মন্তব্যের পরই শুরু হয় বিতর্ক।

ইনফান্তিনো অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি স্বাধীনভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই গেছে। কারণ সুবিধাটা পেয়েছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। আর ট্রাম্প বহুবার প্রকাশ্যেই ইনফান্তিনোকে নিজের ‘বন্ধু’ বলে উল্লেখও করেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে অসহায় ফিফা?
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। বিশ্বকাপ চলাকালেই দেখা যায়, আয়োজক দেশের অভিবাসননীতি নিয়েও কার্যত অসহায় ছিল ফিফা। সোমালিয়ান রেফারি ওমর আরতান যুক্তরাষ্ট্রের ভিসাই পাননি। ইরান ফুটবল দল টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র ১০ দিন আগে ভিসা পায়। তাদের অনেক কর্মকর্তা ভিসা পাননি। যুক্তরাষ্ট্রে অনুশীলনের বদলে ইরানকে থাকতে হয় মেক্সিকোর তিহুয়ানায়। ম্যাচের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকে খেলা শেষে আবার ফিরে যেতে হয়েছে।

ইরাক ও সুইজারল্যান্ডের দলকে সীমান্তে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়েছে। ইরাকের একজন ফটোসাংবাদিককে প্রবেশের অনুমতিও দেওয়া হয়নি। হাইতি ও ইরানের বহু সমর্থক ভিসা না পাওয়ায় বিশ্বকাপ দেখতে পারেননি। প্রশ্ন উঠেছে- ফিফা কি সত্যিই আয়োজক দেশের ওপর নিজের নিয়ম কার্যকর করতে পেরেছে এবার?

সামনে আরও বড় পরীক্ষা
২০৩০ সালে বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদযাপন। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই আয়োজন হবে ছয় দেশে। সেগুলো হলো স্পেন, পর্তুগাল, মরক্কো, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে। এত বড় আয়োজনকে সামনে রেখে ৬৪ দলের বিশ্বকাপের পরিকল্পনাও জোরালো হচ্ছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগে ইনফান্তিনোর নিজের অবস্থানই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

বালোগান বিতর্ক, ট্রাম্পের প্রভাব, রাজনৈতিক সমালোচনা এবং ইউরোপীয় ফুটবল মহলের অসন্তোষ সব মিলিয়ে তার পরবর্তী নির্বাচন সহজ হবে না। ফিফার ২১১ সদস্য দেশের প্রত্যেকের একটি করে ভোট রয়েছে। সভাপতি হতে প্রয়োজন ১০৬ ভোট। ইনফান্তিনো যদি নিজের চেয়ারই ধরে রাখতে না পারেন, তাহলে ৬৪ দলের বিশ্বকাপের স্বপ্ন পূরণ হবে কীভাবে? প্রশ্ন থেকেই যায়।

এসএনআর/এমএমআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow