কোথায় হারালো ‘হুক্কাহুয়া’ সুর, বিপন্ন শেয়াল
সাব্বির হোসাইন রাতের নীরবতা ভেঙে একসময় গ্রামীণ জনপদে যে চেনা সুর প্রতিধ্বনিত হতো, তা আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। বেশিদিন আগের কথা নয়। গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই ঝোঁপঝাড় কিংবা বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে দলবেঁধে ডেকে উঠতো শেয়াল—‘হুক্কাহুয়া, কেকে হুয়া’। এক শেয়ালের ডাকে সুর মেলাতো পুরো এলাকার শিয়াল। মুখরিত হয়ে উঠতো চারপাশ। এমনকি ভোররাতে কুয়াশা ঠেলে মক্তবগামী শিশুর চোখেও পড়তো এদের চঞ্চল আনাগোনা। আধুনিকতার করাল গ্রাসে আজ সেই চিরচেনা দৃশ্য যেন রূপকথা। বাংলাদেশ থেকে দিনদিন বিলুপ্তির পথে হেঁটে চলেছে বাস্তুতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীটি। পরিবেশবিদদের মতে, শেয়ালের এই অস্তিত্ব সংকটের প্রধান কারণ অবাধে বনভূমি ও ঝোঁপঝাড় উজাড় করা। মানুষের বসতি স্থাপন, নগরায়ণ এবং কলকারখানা নির্মাণের জন্য প্রতিনিয়ত কাটা হচ্ছে গাছপালা, পরিষ্কার করা হচ্ছে গ্রামীণ জঙ্গল। শেয়ালের যেটা আদিম ও নিরাপদ বাসস্থান—সেই ঝোঁপঝাড়, খড়বন কিংবা মাটির গর্ত—তা আজ মানুষের দখলে। প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার কারণে তাদের স্বাভাবিক প্রজনন ও জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। বাসস্থান হারানোর পাশাপাশি তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে এ অবলা প্রাণী। বনে শ
সাব্বির হোসাইন
রাতের নীরবতা ভেঙে একসময় গ্রামীণ জনপদে যে চেনা সুর প্রতিধ্বনিত হতো, তা আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। বেশিদিন আগের কথা নয়। গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই ঝোঁপঝাড় কিংবা বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে দলবেঁধে ডেকে উঠতো শেয়াল—‘হুক্কাহুয়া, কেকে হুয়া’। এক শেয়ালের ডাকে সুর মেলাতো পুরো এলাকার শিয়াল। মুখরিত হয়ে উঠতো চারপাশ। এমনকি ভোররাতে কুয়াশা ঠেলে মক্তবগামী শিশুর চোখেও পড়তো এদের চঞ্চল আনাগোনা।
আধুনিকতার করাল গ্রাসে আজ সেই চিরচেনা দৃশ্য যেন রূপকথা। বাংলাদেশ থেকে দিনদিন বিলুপ্তির পথে হেঁটে চলেছে বাস্তুতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীটি। পরিবেশবিদদের মতে, শেয়ালের এই অস্তিত্ব সংকটের প্রধান কারণ অবাধে বনভূমি ও ঝোঁপঝাড় উজাড় করা। মানুষের বসতি স্থাপন, নগরায়ণ এবং কলকারখানা নির্মাণের জন্য প্রতিনিয়ত কাটা হচ্ছে গাছপালা, পরিষ্কার করা হচ্ছে গ্রামীণ জঙ্গল। শেয়ালের যেটা আদিম ও নিরাপদ বাসস্থান—সেই ঝোঁপঝাড়, খড়বন কিংবা মাটির গর্ত—তা আজ মানুষের দখলে। প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার কারণে তাদের স্বাভাবিক প্রজনন ও জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।
বাসস্থান হারানোর পাশাপাশি তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে এ অবলা প্রাণী। বনে শিকারের অভাব দেখা দেওয়ায় ক্ষুধার্ত শেয়াল বাধ্য হয়ে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। আর তখনই বাঁধছে বিপত্তি। লোকালয়ে চলে আসা শেয়ালকে মানুষ অবলীলায় মেছো বাঘ বা ক্ষতিকর ভেবে পিটিয়ে হত্যা করছে। অনেক সময় ফসলের ক্ষেতে দেওয়া বৈদ্যুতিক ফাঁদে কিংবা বিষটোপে পড়ে মারা যাচ্ছে। রাস্তায় দ্রুতগামী গাড়ির নিচে চাপা পড়েও প্রাণ হারাচ্ছে বহু শেয়াল।

বন বিড়াল প্রকৃতির এক অজানা সহযোদ্ধা
কিন্তু শেয়াল তো প্রকৃতির বন্ধু। শেয়ালের প্রধান খাবার ইঁদুর, কাঁকড়া ও ক্ষতিকর পোকামাকড়। এরা মাঠের ইঁদুর ও পোকা খেয়ে কৃষকের ফসল রক্ষা করে। মরা-পচা আবর্জনা ও পশুপাখির অবশিষ্টাংশ খেয়ে প্রকৃতিকে রোগজীবাণুমুক্ত রাখে। শেয়াল বিলুপ্ত হলে ফসলের মাঠে ইঁদুরের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাবে, যা দেশের খাদ্য সুরক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলবে। পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করতে না পারলে এ পৃথিবী একদিন মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
শেয়ালসহ আমাদের চারপাশের বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের বাঁচাতে হলে এখনই নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ:
আইনের কঠোর প্রয়োগ
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। শেয়াল বা যে কোনো বন্যপ্রাণী হত্যাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে কঠোরভাবে দমন করতে হবে।
বাসস্থান সংরক্ষণ
গ্রামীণ সামাজিক বনায়ন এবং ঝোঁপঝাড় সম্পূর্ণ উজাড় না করে বন্যপ্রাণীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল বা করিডোর রাখতে হবে।
কাঠঠোকরা পাখির অজানা কাহিনি
গণসচেতনতা বৃদ্ধি
লোকালয়ে শেয়াল চলে এলে তা পিটিয়ে না মেরে বন বিভাগকে জানানো অথবা তাড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
গ্রামের বুক থেকে ‘হুক্কাহুয়া’ ডাক হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি প্রাণীর হারিয়ে যাওয়া নয় বরং আমাদের শৈশব, আমাদের ঐতিহ্য এবং প্রকৃতির একটা বড় অংশের মৃত্যু। শৈশবের গল্পে যে শেয়াল ছিল ‘পণ্ডিত মশাই’, তাকে বাস্তব পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। প্রকৃতিকে তার আপন রূপে বাঁচতে দেওয়া আমাদের বিলাসিতা নয়, আমাদের টিকে থাকারই লড়াই।
লেখক: শিক্ষার্থী, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, টঙ্গী।
এসইউ
What's Your Reaction?