কোমর না বাঁকিয়ে চলতে পারে না ঢাকার বাস

রাজধানীর উত্তরার আব্দুল্লাহপুর থেকে মতিঝিল প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ। স্বাভাবিক সময়ে দেড় ঘণ্টায় পাড়ি দেওয়ার কথা থাকলেও এখন সেই যাত্রায় সময় লাগছে প্রায় তিন ঘণ্টা, কখনো বা তারও বেশি। সড়কের যানবাহনের এই ধীরগতিতে প্রতিদিন কর্মজীবীদের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল রুটে নির্ধারিত প্রায় ১২টি স্টপেজ থাকলেও বাস্তবে বাস থামছে ১৭ থেকে ১৮টি স্থানে। আবার যাত্রী কম থাকার অজুহাতে সড়কের যে কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে। এতে যাত্রার সময় যেমন বাড়ছে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও সড়কে অতিরিক্ত জটও তৈরি হচ্ছে। গত বুধবার সকাল ১০টায় আব্দুল্লাহপুর থেকে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গাজীপুর পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন এই প্রতিবেদক। ভাড়া নেওয়া হয় ৫০ টাকা। বাসটি এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার না করে মূল সড়ক দিয়েই চলাচল করে। পথে একাধিকবার দেখা যায়, ওই বাসটি পেছনে থাকা একই কোম্পানির আরেকটি বাসকে সামনে যেতে বাধা দিচ্ছে। কখনো গতি কমিয়ে, কখনো বাসের কোমর বাঁকিয়ে আড়াআড়ি অবস্থান নিয়ে ওভারটেক ঠেকানোর চেষ্টা করছিলেন চালক। রাস্তার মাঝ বরাবর অবস্থান নিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোও নিয়মি

কোমর না বাঁকিয়ে চলতে পারে না ঢাকার বাস

রাজধানীর উত্তরার আব্দুল্লাহপুর থেকে মতিঝিল প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ। স্বাভাবিক সময়ে দেড় ঘণ্টায় পাড়ি দেওয়ার কথা থাকলেও এখন সেই যাত্রায় সময় লাগছে প্রায় তিন ঘণ্টা, কখনো বা তারও বেশি। সড়কের যানবাহনের এই ধীরগতিতে প্রতিদিন কর্মজীবীদের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল রুটে নির্ধারিত প্রায় ১২টি স্টপেজ থাকলেও বাস্তবে বাস থামছে ১৭ থেকে ১৮টি স্থানে। আবার যাত্রী কম থাকার অজুহাতে সড়কের যে কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে। এতে যাত্রার সময় যেমন বাড়ছে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও সড়কে অতিরিক্ত জটও তৈরি হচ্ছে।

গত বুধবার সকাল ১০টায় আব্দুল্লাহপুর থেকে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গাজীপুর পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন এই প্রতিবেদক। ভাড়া নেওয়া হয় ৫০ টাকা। বাসটি এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার না করে মূল সড়ক দিয়েই চলাচল করে। পথে একাধিকবার দেখা যায়, ওই বাসটি পেছনে থাকা একই কোম্পানির আরেকটি বাসকে সামনে যেতে বাধা দিচ্ছে। কখনো গতি কমিয়ে, কখনো বাসের কোমর বাঁকিয়ে আড়াআড়ি অবস্থান নিয়ে ওভারটেক ঠেকানোর চেষ্টা করছিলেন চালক। রাস্তার মাঝ বরাবর অবস্থান নিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোও নিয়মিত ঘটনা। এতে পেছনে থাকা বাস কিংবা অন্য সব বাহন ক্রমাগত বিকট শব্দে হর্ন বাজিয়ে শব্দ দূষণ করে। তৈরি হয় লম্বা যানজট। তবে যাত্রীরা সাময়িক চিল্লালেও তাতে ভ্রুক্ষেপ থাকে না চালকের।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, একই রুটের পেছনে থাকা বাসকে ওভারটেক করতে না দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য বেশি যাত্রী তোলা। আবার সামনের বাসটি যেন যাত্রী না পায়, সে কারণে পেছনের বাসটি ইচ্ছাকৃতভাবে গতি কমায় বা বাড়ায়। বাসের পেছন দিক ইচ্ছাকৃতভাবে বাঁকা করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সাময়িকভাবে কোনো একটি বাস হয়তো দু-একজন অতিরিক্ত যাত্রী পায়, কিন্তু সামগ্রিকভাবে সড়কে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। এই কোমর সোজা করার কাজটি কখনোই করতে পারেনি ঢাকার ট্রাফিক।

jagonews24

শৃঙ্খলহীনতায় যানজট

ঢাকার সড়কে চালকদের ‘অসুস্থ প্রতিযোগিতা’ যাত্রীদের দুর্ভোগই শুধু বাড়াচ্ছে না, নগর পরিবহন ব্যবস্থার শৃঙ্খলাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

মানুষের কর্মকোলাহল আর ব্যস্ততা যতই থাকুক—সড়কে গাড়ির ধীরগতি যেন প্রতিমুহূর্তে মানুষকে পেছন থেকে টেনে ধরে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন সড়কে চোখ রাখলেই দেখা যায় যানবাহনের ধীরগতি। সারি সারি গাড়ির জ্যাম ঠেলে সামনে এগোনো।

সড়কের স্থবিরতার জন্য শুধু যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধিই দায়ী নয়; লোকাল বাসগুলোর অসম প্রতিযোগিতা, যাত্রী ওঠানামাকে কেন্দ্র করে রেষারেষি এবং ট্রাফিক নিয়মের তোয়াক্কা না করার প্রবণতাও সড়কের স্বাভাবিক গতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

একই রুটে চলাচলকারী বাস একটি অন্যটিকে ওভারটেক করতে না দিয়ে মাঝরাস্তায় আড়াআড়ি দাঁড় করিয়ে রাখছে, নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে, এমনকি দু-একজন যাত্রীর আশায় হঠাৎ যত্রতত্র গাড়ি থামাচ্ছে। এ ধরনের শৃঙ্খলাহীনতা সড়কে যানজটের বড় কারণ। এতে প্রতিদিন দেড় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে তিন ঘণ্টা। এতে যাত্রীদের ভোগান্তিই শুধু বাড়ছে না, প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘণ্টা, ব্যাহত হচ্ছে নগরজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি লোকাল বাসের অসম প্রতিযোগিতা ও বিশৃঙ্খল পরিচালনাও ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ। বিশেষ করে একই কোম্পানির বাস একটি অন্যটিকে ওভারটেক করতে না দেওয়া, মাঝরাস্তায় আড়াআড়ি করে দাঁড় করানো কিংবা যাত্রী তুলতে হঠাৎ ব্রেক করার মতো প্রবণতায় সড়কে তৈরি হচ্ছে ধীরগতি। এতে শুধু ওই বাস দুটিরই নয়, পেছনে থাকা প্রাইভেটকার, সিএনজি, অন্য বাসসহ সব ধরনের যানবাহন জটে পড়ছে।

jagonews24

যাত্রীদের ক্ষোভ
আব্দুল্লাহপুর থেকে বনানী পর্যন্ত সড়কে নিয়মিত যাতায়াত করেন ব্যাংকে চাকরি করা সাইফুল। কথা হলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘চালক কত ভাড়া তুলবেন সেটা আমার বিষয় নয়। আমি গাড়িতে উঠেছি নির্দিষ্ট সময়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা আর এক বাস অন্য বাসকে ওভারটেক করতে না দেওয়ার কারণে প্রতিদিনই জ্যামে পড়তে হয়।’

এসব নিয়ে প্রতিবাদ করলে অনেক সময় চালক বা হেলপাররা যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান রহিম, আসাদুল, তৌহিদুজ্জামান নামে ওই রুটের আরও বেশ কয়েকজন নিয়মিত যাত্রী।

তাদেরও অভিযোগ, বাসে বসে অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললেও কার্যত কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না; বরং প্রতিবাদ করলে কখনো কখনো চালক ইচ্ছেকৃত গাড়ির গতি আরও কমিয়ে দেন। এতে যাত্রীদেরই বিড়ম্বনা বাড়ে।

ধাক্কাধাক্কি-রেষারেষি, ভাঙছে গ্লাস
অসম প্রতিযোগিতার কারণে সড়কে দুই বাসের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটছে। যাত্রী তোলাকে কেন্দ্র করে এক বাস অন্যটির ওভারটেক ঠেকাতে গিয়ে কখনো সামান্য সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এতে লুকিং গ্লাস কিংবা জানালার কাচ ভেঙে পড়ার ঘটনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। পাশাপাশি ঘন ঘন যাত্রী ওঠানামা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, ভাড়া নিয়ে অভিযোগ-আপত্তি, এসবও ঢাকার গণপরিবহনে নিত্যদিনের চিত্র।

গত বুধবারের ওই যাত্রাপথে এ প্রতিবেদক জানতে পারেন, উত্তরা থেকে মহাখালী পর্যন্ত অন্তত তিনটি বাসের প্রতিযোগিতায় এক চালক অন্য বাসের গা ঘেঁষে চলতে গিয়ে গাড়ির লুকিং গ্লাস ভেঙে দিয়েছেন। যদিও পরে তারা একে অন্যের সঙ্গে নেগোসিয়েশন (আর্থিক সমঝোতা) করে নেন।

নির্দিষ্ট স্থানে ‘চাঁদা’ নেওয়ার অভিযোগ
এসব বিষয়ে বাসচালকদের বক্তব্য জানতে চাইলে তারা সরাসরি এড়িয়ে যান। এক্ষেত্রে তারা হেলপার বা সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

গাজীপুর পরিবহন বাসের হেলপার সুমন দাবি করেন, প্রতিদিন গাড়ি বের করলেই নির্দিষ্ট পয়েন্টে টাকা দিতে হয়। সকালে জয়দেবপুরের শিমুলতলীতে ৩৮০ টাকা লাইনম্যানকে দিতে হয়। মতিঝিলে পৌঁছালে আবার ৫০০ টাকা। গাড়ির সব কাগজপত্র ঠিক থাকলেও নানা অজুহাতে আটকানো হয়। তখন লাইনম্যান ২০০ টাকা আর পুলিশ ৩০০ টাকা নেয়, নেগোসিয়েশনও তারাই করে।

তিনি বলেন, রেকার করলে খরচ পড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকার বেশি। তেল খরচ বাদ দিয়ে দিনে একটি বাসে যদি প্রায় ৫ হাজার টাকা থাকে, সেখান থেকে মালিক নিয়ে নেন আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। বাকি টাকা চালক, হেলপার ও সুপারভাইজার ভাগাভাগি করে নেন।

অন্য একটি বাসের সুপারভাইজার বোরহান বলেন, দিন শেষে অনেক সময় ১০০ টাকাও হাতে থাকে না। বাসা ভাড়া, খাবার, সন্তানের পড়াশোনা- এসব চিন্তা তো মাথায় রাখতে হয়। তাই সবাই চায় যতটা সম্ভব গাড়িতে যাত্রী তুলতে। কারণ, যাত্রী বেশি থাকলে ভাড়াটাও একটু বেশি উঠে। এ কারণে একই রুটের এক বাস অন্য বাসকে সামনে যেতে দিতে চায় না।

jagonews24

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, আর্থিক চাপ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার সুযোগেই সড়কে তৈরি হচ্ছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। যার চূড়ান্ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে প্রথমেই দরকার রুটভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও কঠোর মনিটরিং। একই রুটে একাধিক বাস কোম্পানির মধ্যে সমন্বয় না থাকা এবং নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুসরণ না করায় এ ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।

এছাড়া নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠানামা বন্ধ, ডিজিটাল টিকেটিং ব্যবস্থা চালু এবং নিয়মিত তদারকি জোরদার না করলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন। যানজট কমাতে মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও সড়কে গণপরিবহনের শৃঙ্খলা না ফিরলে ভোগান্তি কমবে না—এমনটিই মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের প্রশ্ন—কবে শেষ হবে লোকাল বাসের এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা? কবে ফিরবে সড়কে শৃঙ্খলা?

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক, ডিসি উত্তরা) আনোয়ার সাঈদ জাগো নিউজকে জানান, যানজট নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে ট্রাফিক বিভাগ। তিনি বলেন, আব্দুল্লাহপুর ফ্লাইওভারের ওপর আন্তঃজেলা বাসগুলো যাত্রী ওঠানামার জন্য থামে। সেখানে একাধিক কাউন্টার গড়ে ওঠায় স্থানটি কার্যত একটি অস্থায়ী টার্মিনালে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বাসগুলো থামানোর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়। এ কারণে ট্রাফিক পুলিশ চেষ্টা করছে যেন বাসগুলো দুই লেনে না দাঁড়িয়ে একটি লেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এতে যানজট তুলনামূলকভাবে কম থাকে।

বৃহস্পতিবার ও বিভিন্ন ছুটির দিনে যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় গাড়ির গতি কিছুটা ধীর হয়ে পড়ে বলেও জানান তিনি। এরপরও যারা আইন অমান্য করছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই মামলা দেওয়া হচ্ছে।

‘ফ্লাইওভারে ফুটওভারব্রিজ বা নির্ধারিত চলাচলের পথ না থাকলেও সুশৃঙ্খলভাবে যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করতে পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। এক লেনে বাস রেখে যাত্রী ওঠানামা করানোর মাধ্যমে যানজট কমিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে’—বলেন ডিএমপির এ ট্রাফিক কর্মকর্তা।

ইএআর/এমকেআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow