কোরবানি আরবি শব্দ। এর বাংলা অর্থ আত্মত্যাগ, সান্নিধ্য। অর্থাৎ, পরম করুণাময়ের সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট তারিখে সামর্থ্যবান মুসলমানদের হালাল উপায়ে অর্জিত হালাল ও বলবান পশু আল্লাহর নামে জবাই করা। আজ থেকে চার হাজার বছর আগে পবিত্র মক্কা নগরীর মিনা প্রান্তরে অশীতিপয় আল্লাহপ্রেমিক ইবরাহিম (আ.) তার প্রাণপ্রিয় পুত্র ইসমাইলকে (আ.) বিসর্জন দিতে উদ্যত হয়েছিলেন আল্লাহর নির্দেশ পালনে। পিতা-পুত্রের অভাবিতপূর্ব আত্মনিবেদনে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ ফেরেশতা মারফত দুম্বা পাঠিয়ে দেন এবং সেটা জবাই করা হয়। সে ধারাবাহিকতা আজও মুসলিম উম্মাহ আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে জারি রেখেছে পশু কোরবানির রীতি। সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আপনি আপনার প্রতিপালকের জন্য সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।’ (সুরা কাউসার: ২-৩)
sকোরবানি যাদের ওপর ওয়াজিব
ইসলামে ‘সাহেবে নিসাব’ (সম্পদশালী) মুসলমানের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। ‘সাহেবে নিসাব’ অর্থ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ৭.৫ (সাড়ে সাত) ভরি স্বর্ণ কিংবা ৫২.৫ (সাড়ে বায়ান্ন) তোলা রৌপ্য কিংবা সমমূল্যমান সম্পদের অধিকারী। কোরবানির দিনগুলোয় কেউ এ পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তার পক্ষ থেকে কোরবানি আদায় করতে হবে। বর্তমান বাজারে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্য ৬০ থেকে ৬৫ হাজারের মধ্যে। তাই কেউ যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণের অতিরিক্ত ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকার মালিক হয়, তা হলে সম্পদশালী হিসেবে গণ্য হবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক, পাগল বা মুসাফির ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হলেও তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।
কোরবানির নিয়তের শুদ্ধতা
কেবল কোরবানি নয়; আমাদের প্রতিটি ইবাদত ও পুণ্যকাজ শুধু আল্লাহতায়ালা ও তার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হতে হবে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘এগুলোর (কোরবানির পশুর) গোশত, রক্ত আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (অন্তরের বিশুদ্ধতা)’ (সুরা হজ: ৩৭)। প্রসিদ্ধ হাদিস ‘আমলের কর্মফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল’ এবং এ রকম আরও অনেক হাদিস রয়েছে। যেগুলো থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, বিশুদ্ধ নিয়ত ব্যতীত বান্দার কোনো আমলই আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। তাই কোরবানিদাতার জন্য সর্বাগ্রে আবশ্যক হচ্ছে—বিশুদ্ধ নিয়তে কোরবানি করা। অনেকেই লোক দেখানো, লোকলজ্জা, সম্মান অর্জন, প্রতিযোগিতা, রেওয়াজ, গোশত খাওয়া ইত্যাদি উদ্দেশ্যে কোরবানি করেন। এটা অনুচিত।
কোরবানি করা যায় যেসব দিনে
ঈদুল আজহার নির্ধারিত দিন ১০ জিলহজ। এ দিনেই ঈদের নামাজ পড়া হয় ও পশু ওকারবানি করা হয়। তবে কেউ এদিন কোরবানি করতে না পারলেও সুযোগ রয়েছে। ১০ জিলহজ ঈদুল আজহার দিনসহ আরও দুদিন কোরবানি করা যাবে। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদের নামাজ পড়ার পর থেকে শুরু করে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত কোরবানি করা যাবে। তবে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পর কোরবানি বৈধ নয়। এমনকি যদি কেউ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, ১০ ও ১১ জিলহজ ভ্রমণে থাকে। তারপর ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে বাড়ি ফিরে আসে, তবে তার ওপরও কোরবানি করা ওয়াজিব হবে।’ (ফাতাওয়া আলমগিরি)
কোরবানির উপযুক্ত পশু
কোরবানির জন্য পশুর স্বাস্থ্যগত ও গুণগত কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হয়। সব জায়েজ পশু দিয়ে কোরবানি দেওয়া যায় না। কোরবানি জন্য শরিয়ত পশু নির্ধারণ করে দিয়েছে। মোট ছয় ধরনের পশু দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ। সেগুলো হলো—উট, গরু, মহিষ, দুম্বা, ভেড়া ও ছাগল। এগুলো ছাড়া অন্য পশু দিয়ে কোরবানির জায়েজ নেই। কোরবানি করার জন্য ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার বয়স কমপক্ষে এক বছর পূর্ণ হতে হবে। অবশ্য ছয় মাসের ভেড়া যদি দেখতে মোটাতাজা হয় এবং এক বছর বয়সের মতো মনে হয়, তা হলে তা দিয়ে কোরবানি করা বৈধ। গরু-মহিষের হতে হবে পূর্ণ দুই বছর। আর উটের পাঁচ বছর পূর্ণ হতে হবে। (হেদায়া : ৪/১০৩)
পশুর যে দোষ থাকলে কোরবানি হবে না
কোরবানির পশু দোষত্রুটিমুক্ত হতে হবে। পশুর মধ্যে যেসব ত্রুটি থাকলে, কোরবানি দেওয়া যাবে না, সেগুলো হচ্ছে—১. দৃষ্টিশক্তি না থাকা। ২. শ্রবণশক্তি না থাকা। ৩. অত্যন্ত দুর্বল ও জীর্ণশীর্ণ হওয়া। ৪. এ পরিমাণ লেংড়া যে জবাই করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে অক্ষম। ৫. লেজের বেশিরভাগ অংশ কাটা। ৬. জন্মগতভাবে কান না থাকা। ৭. কানের বেশিরভাগ কাটা। ৮. গোড়াসহ শিং উপড়ে যাওয়া। ৯. পাগল হওয়ার কারণে ঘাস-পানি ঠিকমতো না খাওয়া। ১০. বেশিরভাগ দাঁত না থাকা। ১১. রোগের কারণে স্তনের দুধ শুকিয়ে যাওয়া। ১২. ছাগলের দুটি দুধের পঙ্গুত্ব স্পষ্ট ও আহত যার কোনো অঙ্গ ভেঙে গেছে।’ (ইবনে মাজা: ৩১৪৪)
পশুর যে দোষ থাকলেও কোরবানি হবে
পশুর কিছু ত্রুটি এমন আছে, যেগুলো থাকলেও কোরবানি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেগুলো হলো, ১. যে কোনো একটি কাটা। ১৩. গরু বা মহিষের চারটি দুধের যে কোনো দুটি কাটা। অর্থাৎ, কোরবানির পশু বড় ধরনের দোষত্রুটি থেকে মুক্ত হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘চার ধরনের পশু, যা দিয়ে কোরবানি জায়েজ হবে না—অন্ধ, যেটার অন্ধত্ব স্পষ্ট। রোগাক্রান্ত, যার রোগ স্পষ্ট। পঙ্গু, যার পশু পাগল, তবে ঘাস-পানি ঠিকমতো খায়। ২. লেজ বা কানের কিছু অংশ কাটা, তবে বেশিরভাগ অংশ আছে। ৩. জন্মগতভাবে শিং নেই। ৪. শিং আছে, তবে ভাঙা। ৫. কান আছে, তবে ছোট। ৬. পশুর একটি পা ভাঙা, তবে তিন পা দিয়ে সে চলতে পারে। ৭. পশুর গায়ে চর্মরোগ। ৮. কিছু দাঁত নেই, তবে বেশিরভাগ আছে। স্বভাবগত এক অণ্ডকোষের পশু। ৯. পশু বয়োবৃদ্ধ হওয়ার কারণে বাচ্চা জন্মদানে অক্ষম। ১০. পুরুষাঙ্গ কেটে যাওয়ার কারণে সঙ্গমে অক্ষম। তবে উত্তম হচ্ছে ত্রুটিমুক্ত পশু দিয়ে কোরবানি দেওয়া। পশু কেনার সময় এসব বিষয় বিবেচনা করা কর্তব্য।
পশু জবাইয়ের মাসআলা
কোরবানিদাতা নিজ হাতে জবাই করবেন। সম্ভব না হলে জবাইকালে সামনে থাকবেন। মুসলিম ব্যক্তি ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে পশু জবাই করবেন। জবাইকারী অমুসলিম হলে কোরবানি আদায় হবে না এবং গোশত খাওয়া জায়েজ হবে না। যে স্থানে জবাই করা হবে, সেখানে পশুকে কেবলার দিকে মুখ করে সহজভাবে শোয়ানো ও তাড়াতাড়ি জবাই করা মুস্তাহাব। জবাইকারী কেবলার দিকে চেহারা করে জবাই করা মুস্তাহাব। পশু কোরবানি করার পর জীবিত বাচ্চা পাওয়া গেলে কোরবানির দিনগুলোর মধ্যে তা কোরবানি করে দিতে হবে বাচ্চার গোশত খাওয়া জায়েজ। ধারালো ছুরি-চাকু দিয়ে জবাই করা মুস্তাহাব। এর বিপরীত মাকরুহ। এক পশুর সামনে আরেক পশু জবাই করা মাকরুহ। জবাই করার পর অঙ্গপ্রতঙ্গের নাড়াচাড়া পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পূর্বে কাটা-ছেঁড়া করা মাকরুহ। পশু জবাই করা, গোশত কাটা, চামড়া ছাড়ানো ইত্যাদি কোনো কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির পশুর গোশত, হাড্ডি, চামড়া তথা পশুর কোনোকিছু দেওয়া জায়েজ নয়। টাকা বা অন্য কোনোকিছু দিয়ে পারিশ্রমিক দেবেন। কোরবানিদাতার জন্য কোরবানি পশুর চামড়া ব্যতীত গোশত, হাড্ডি ইত্যাদি কোনোকিছুই বিক্রি করা জায়েজ নয়।
কোরবানির গোশত বণ্টনের নিয়ম
কোরবানির গোশত বণ্টনের মুস্তাহাব পদ্ধতি হচ্ছে, আহারযোগ্য সবকিছু তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য রাখবেন, এক ভাগ পাড়া-পড়শী, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বণ্টন করবেন এবং এক ভাগ দরিদ্রদের দেবেন। আবদুল্লাহ বিন ওমরের (রা.) একটি বর্ণনা এমন—‘এটা আল্লাহপাক হতে অনুগ্রহ; কোরবানির মাংস পুরোটা নিজেরা খাওয়া যাবে, দরিদ্রদের দান করা যাবে বা পুরোটা উপহার হিসেবে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদের বিতরণ করা যাবে। এ ছাড়া ইবন মাসউদ (রা.) কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজেরা খেতেন, এক ভাগ যাকে চাইতেন তাকে খাওয়াতেন এবং এক ভাগ ফকির-মিসকিনকে দিতেন বলে উল্লেখ রয়েছে। ইসলামের বিভিন্ন ইমামরাও কোরবানীয় গোশতকে তিন ভাগ করাকে মুস্তাহাব বলে উল্লেখ করেছেন।
লেখক: ইমাম ও খতিব