ঈদের সকাল। হালকা রোদের কোমল আলোয় ধীরে ধীরে জেগে ওঠে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার সুদামপাড়া। মসজিদের দিক থেকে ভেসে আসে তাকবিরের ধ্বনি।
নামাজ শেষে মানুষজন যখন দলে দলে বেরিয়ে আসে, তখনই যেন শুরু হয় অন্য এক দৃশ্য—গ্রামের প্রধান সড়কে একে একে হাজির হয় গরু, ছাগল, ভেড়া; পাশে দাঁড়িয়ে তরুণদের ব্যস্ততা, বয়োজ্যেষ্ঠদের তদারকি। কোথাও কোনো হট্টগোল নেই, তবু চারপাশে এক অদৃশ্য উৎসবের ঢেউ।
এই গ্রামে কোরবানি মানেই একসাথে থাকা, একসাথে দেওয়া, আর একসাথে পাওয়ার গল্প।
এই গল্প নতুন নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহমান। অনেকের মতে, প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চলে আসছে এই প্রথা—গ্রামে বসতি গড়ে ওঠার শুরুর সময় থেকেই। সেই থেকে আজও সুদামপাড়ার মানুষ কোরবানিকে ব্যক্তিগত আচার হিসেবে নয়, বরং সামষ্টিক দায়বদ্ধতার এক মহৎ রূপ হিসেবে দেখেছে।
গ্রামের সচ্ছল মানুষরা ঈদের দিন একত্রে তাদের গবাদিপশু কোরবানি করেন। তারপর নির্দিষ্ট নিয়মে সেই গোশতের একটি অংশ তুলে রাখা হয় ‘সমাজের’ জন্য—যারা কোরবানি দিতে পারেন না, তাদের জন্য।
এই ‘সমাজ’ এখানে কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি মানুষই গুরুত্বপূর্ণ।
ঈদের আগের দিন থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। স্বেচ্ছাসেবকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরি করেন, পৌঁছে দেন ক্রমিক নম্বরযুক্ত কাগজ। ঈদের দিন নামাজ শেষে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো মসজিদের মাঠকে ঘিরে শুরু হয় কোরবানির আয়োজন, আর পাশাপাশি চলে গোশত সংগ্রহ ও বণ্টনের নিখুঁত প্রক্রিয়া।
নিয়মও স্পষ্ট—কেউ একা কোরবানি দিলে তার পশুর এক-তৃতীয়াংশ, আর যৌথভাবে দিলে এক-চতুর্থাংশ গোশত জমা দিতে হয় ‘সমাজে’। সেই জমাকৃত ভান্ডার থেকেই পরে সমানভাবে বণ্টন করা হয়। ২০২৫ সালে এই ভান্ডারে জমা হয়েছিল প্রায় সাড়ে তিন টন গোশত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ১,০০০ থেকে ১,২০০ পরিবারের প্রতিটি গড়ে প্রায় তিন কেজি করে গোশত পেয়েছে। এবারও তিন টনের বেশি গোশত দেওয়া হয়েছে ১১০০ পরিবারকে, অথচ কোরবানি দিয়েছে মাত্র তিন শ’র মতো পরিবার।
তবে এই ব্যবস্থার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—যারা কোরবানি দেন, তারা এই ভান্ডার থেকে কোনো অংশ নেন না। অর্থাৎ, এটি নিছক ভাগাভাগি নয়; এটি একধরনের নীরব ত্যাগ, যেখানে নিজের অংশ ছেড়ে দিয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোই প্রধান লক্ষ্য।
নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের যারা বণ্টনস্থলে যেতে সংকোচবোধ করেন, তাদের জন্যও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। স্বেচ্ছাসেবকরাই তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেন প্রাপ্য গোশত। ফলে এখানে কেউ উপেক্ষিত থাকে না, কেউ বঞ্চিত হয় না।
গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি, প্রায় শতবর্ষী আসাদ আলী স্মৃতির ভাঁজ খুলে বলেন, ‘আমি ছোটকাল থিকাই একসাথে এক জায়গায় কুরবানি দেয়া দেখতেছি। আমাদের মুরুব্বিদের মুখেও একই কথা শুনছি। তাঁরা এই সিস্টেম দিয়া গ্রামের মানুষরে ঐক্যবদ্ধ করছিলেন। তাতে সবাই মাংস খাইতে পারে; আমাগো সবারই এতে ভালো লাগে।’
এই ঐতিহ্য সময়ের সঙ্গে বদলায়নি, বরং আরও গভীর হয়েছে। শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা—যে ঋতুতেই ঈদ আসুক না কেন, এই আয়োজন থেমে থাকে না। ধলেশ্বরী নদীবিধৌত নিম্নাঞ্চল হওয়ায় কোনো কোনো বর্ষায় গ্রাম ডুবে যায় পানিতে, তবু একটু উঁচু জায়গা খুঁজে নিয়েই চলে গোশত ভাগাভাগির কাজ।
বণ্টন প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়া ইউসুফ আলীর কণ্ঠে ধরা পড়ে সেই গর্ব, সেই মমতা—‘এটা সুদামপাড়ার মানুষের একসঙ্গে হাসা, একসঙ্গে কাঁদার ঐতিহ্য। আমরা চাই আগামী প্রজন্ম পরার্থপরতার এই রীতি ধরে রাখুক।’
সুদামপাড়ার এই গল্প আসলে কোরবানির গভীর দর্শনেরই প্রতিফলন। এখানে ত্যাগ মানে শুধু ধর্মীয় কর্তব্য পালন নয়; বরং নিজের প্রাপ্তিকে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার এক সচেতন সিদ্ধান্ত। এখানে ঈদ মানে কেবল আনন্দ নয়; বরং নিশ্চিত করা—এই আনন্দে কেউ যেন বাদ না পড়ে।
এই গ্রাম যেন নীরবে বলে যায়—সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে সমাজ হয়ে ওঠে, যখন সেখানে সবাই মিলে ভালো থাকার চেষ্টা করে। আর কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা—সেই চেষ্টার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।