ক্যামেরায় জীবনের গল্প লেখেন লিঠু

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান ফটোগ্রাফি শুধুই ছবি তোলা নয়, এটি এক ধরনের অনুভূতি বন্দি করার শিল্প। সেই শিল্পকর্মের নেশাতেই আজ তিনি হয়ে উঠেছেন পরিচিত মুখ। তার নাম মো. এহসান আলী বিশ্বাস লিঠু। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও ছবি তোলা তার অন্যতম নেশা এবং ভালোবাসা। পাবনা সদরে বাবা, স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে পারিবারিক জীবনযাপন করছেন। পরিবারে আর কেউ ছবি তোলেন না। তবে তার এই আলোকচিত্রের জগতে ভ্রমণ শুরু হয়েছিল প্রায় দুই দশক আগে। ২০০৫ সালে একটি ডিজিটাল সাইবার শট ক্যামেরা কিনে ছবির জগতে প্রবেশ করেন লিঠু। প্রথমে শুধু বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের ছবি তুলেই সময় কাটাতেন। তবে ২০০৯ সালে ডিএসএলআর ক্যামেরা হাতে পাওয়ার পর থেকে তার ভেতরে ছবি তোলার নেশা প্রবলভাবে জাগ্রত হয়। ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরেই ক্যামেরার সাথে পরিচয়, সেই শখের ধারাবাহিকতায় আজও শিখে চলেছেন। ছবি তোলার কারণ হিসেবে তিনি জানান, মূলত শখের বসেই শুরু, তবে সময়ের সাথে সাথে নিজের জন্য কিছু করার তাগিদে এই কাজকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এ পর্যন্ত তিনি দেশের ও বিদেশের ১০০টিরও বেশি ছবির এক্সিবিশনে অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একাধিক পুরস্কার অর্জন করেছেন। পুরস্কারগ

ক্যামেরায় জীবনের গল্প লেখেন লিঠু

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

ফটোগ্রাফি শুধুই ছবি তোলা নয়, এটি এক ধরনের অনুভূতি বন্দি করার শিল্প। সেই শিল্পকর্মের নেশাতেই আজ তিনি হয়ে উঠেছেন পরিচিত মুখ। তার নাম মো. এহসান আলী বিশ্বাস লিঠু। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও ছবি তোলা তার অন্যতম নেশা এবং ভালোবাসা। পাবনা সদরে বাবা, স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে পারিবারিক জীবনযাপন করছেন। পরিবারে আর কেউ ছবি তোলেন না। তবে তার এই আলোকচিত্রের জগতে ভ্রমণ শুরু হয়েছিল প্রায় দুই দশক আগে।

২০০৫ সালে একটি ডিজিটাল সাইবার শট ক্যামেরা কিনে ছবির জগতে প্রবেশ করেন লিঠু। প্রথমে শুধু বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের ছবি তুলেই সময় কাটাতেন। তবে ২০০৯ সালে ডিএসএলআর ক্যামেরা হাতে পাওয়ার পর থেকে তার ভেতরে ছবি তোলার নেশা প্রবলভাবে জাগ্রত হয়। ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরেই ক্যামেরার সাথে পরিচয়, সেই শখের ধারাবাহিকতায় আজও শিখে চলেছেন।

ছবি তোলার কারণ হিসেবে তিনি জানান, মূলত শখের বসেই শুরু, তবে সময়ের সাথে সাথে নিজের জন্য কিছু করার তাগিদে এই কাজকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এ পর্যন্ত তিনি দেশের ও বিদেশের ১০০টিরও বেশি ছবির এক্সিবিশনে অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একাধিক পুরস্কার অর্জন করেছেন। পুরস্কারগুলো তাকে আরও অনুপ্রাণিত করেছে। তার তোলা ছবি দেশের প্রথম সারির বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়ে পেয়েছে ব্যাপক প্রশংসা।

lithu

তিনি প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ছবি তুলতে বিশেষভাবে পছন্দ করেন। বিশেষ করে বন্য পাখি ও প্রাণী তার ক্যামেরার প্রধান বিষয়। ছবি তোলা থেকে তেমন আয় না হলেও ভালোবাসার টানে ক্যামেরা ছাড়তে পারেননি তিনি। তার কাছে ফটোগ্রাফি মানেই নিছক ভালোবাসা। দেশের প্রায় ৭০ ভাগ জেলায় তিনি ছবি তুলেছেন আর দেশের বাইরে ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, সৌদি আরব, চীন, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় ভ্রমণ করেছেন ফটোগ্রাফির টানে। বিশেষ করে সুন্দরবনে গিয়েছেন প্রায় ১৭-১৮ বার ছবি তুলতে। যদিও এতবার যাওয়ার পরও বাঘের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়নি তার।

নিজের সেরা ছবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‌‘আমার কাছে প্রতিটি ছবিই সেরা।’ তবে তার ফটোগ্রাফির ভ্রমণকাহিনিতে ভয় ও আনন্দ দুটোই আছে। একবার সুন্দরবনে ছবি তুলতে গিয়ে যেন মৃত্যুর মুখোমুখিই হয়েছিলেন। হঠাৎ করেই আঘাত হানে ভয়াবহ বুলবুল ঝড়। তখন সমুদ্রবন্দরগুলোতে জারি হয়েছিল ১০ নম্বর বিপদসংকেত। নৌকার ভেতর চারদিক অন্ধকার, প্রচণ্ড বাতাসে দুলছিল সবকিছু। ঢেউ যেন এক ঝটকায় গিলে নিতে চাইছিল। সাথে ছিলেন আরও ৮ জন। তাদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে সিনিয়র। সবার চোখে তখন আতঙ্ক, প্রশ্ন—বাঁচা যাবে তো? তার মনে হচ্ছিল, হয়তো এ যাত্রায় আর ফেরা হবে না। তবুও সাহস ধরে সবাইকে স্থির রেখেছিলেন তিনি। অবশেষে জীবন হাতে নিয়েই ঝড় কাটিয়ে নিরাপদে ঘরে ফেরা সম্ভব হয়েছিল। মৃত্যুর ছায়া থেকে ফিরে আসার সেই মুহূর্তই আজও তার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের ঘটনা।

ছবি তোলার প্রথম ক্যামেরা ছিল পারিবারিক ইয়াসিকা ফিল্ম ক্যামেরা। বর্তমানে তিনি ব্যবহার করছেন সনি মিররলেস ক্যামেরা। ক্যামেরা নিয়ে তার আনন্দ, বেদনা, অভিজ্ঞতা সবই জড়িয়ে আছে ফটোগ্রাফির সাথে। বিখ্যাত আলোকচিত্রী কুদরত-এ-খোদা লিটু তার ছবির প্রশংসা করেছেন। এটি তার জন্য বড় স্বীকৃতি। ২০১৮ সালে তিনি প্রথম ধূসর তিতিরের ছবি তুলেছিলেন। সুন্দরবনে তুলেছিলেন রঙিন চিংড়ি মাছের ছবি। মহেশখালী থেকে তুলেছেন রেড ব্রেস্টেড মারগেঞ্জার হাঁস। এসব বিরল ছবি তাকে ফটোগ্রাফির জগতে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

lithu

যারা ভালো ছবি তুলতে চান; তাদের জন্য তার পাঁচটি পরামর্শ হলো—ধৈর্যশীল হওয়া, সব ধরনের ছবি দেখা, ছবি নিয়ে পড়াশোনা করা, প্রচুর ছবি তোলা এবং নিয়মিত অনুশীলন করা।

লিঠুর বেড়ে ওঠা পাবনাতেই। ১৯৯৯ সালে এসএসসি, ২০০১ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি সম্পন্ন করেন। প্রায় আট বছর চাকরি করার পর ফিরে আসেন পাবনায় পারিবারিক ব্যবসায়।

তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো—শখের ফটোগ্রাফিকে আরও এগিয়ে নেওয়া। জীববৈচিত্র্য, ভিন্ন দেশের সংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র ধারণ করাই তার লক্ষ্য। তবে সবকিছুর পরেও তিনি সাধারণ মানুষ হিসেবেই থাকতে চান।

lithu

মো. এহসান আলী বিশ্বাস লিঠুর ফটোগ্রাফির গল্প সাহস আর অনুপ্রেরণার অনন্য মিশ্রণ। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন—শখ যদি হৃদয়ের গভীর টানে লালিত হয়, তবে তা নেশায় রূপ নিয়ে জীবনের দিগন্ত বদলে দিতে পারে। তার লেন্সে ধরা প্রতিটি ফ্রেম কেবল ছবি নয় বরং স্বপ্ন, অধ্যবসায় আর ভালোবাসার রঙে আঁকা নতুন পৃথিবী, যা স্পর্শ করে যায় যে কোনো পাঠকের মন।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow