ক্রমেই অস্থিতিশীল হচ্ছে ভারত, বিপাকে প্রবাসী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ভারতের কর্মসংস্থানের দুটি বড় খাতকে চাপে ফেলেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করা শ্রমিকরা দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন, আর চামড়াজাত পণ্য থেকে শুরু করে কাচশিল্প পর্যন্ত ভারতের উৎপাদিত পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদাও কমে যাচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে কাজের সুযোগ এবং জুতা ও পোশাকশিল্পের মতো শ্রমনির্ভর উৎপাদন খাতে বৈশ্বিক চাহিদা বহু ভারতীয়কে স্থায়ী, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে লাভজনক আয় এনে দিয়েছে। কিন্তু এখন বিদেশের সংঘাত ভারতের অর্থনীতিতে দ্বিমুখী আঘাত হেনেছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ফেরা শ্রমিকরা দেশে এসে নিজ শহরে আগের মতো আয় করতে পারছেন না। এতে বেকারত্ব বাড়ার পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়ছে। গত জানুয়ারি পর্যন্ত মোহাম্মদ কুরেশি সৌদি আরবের একটি গয়নার দোকানে কাজ করতেন। মাসে প্রায় ৩০ হাজার রুপি আয় করে তিনি একটি ছোট বাড়ি নির্মাণ এবং বোনের বিয়ের খরচ জোগানোর মতো সঞ্চয় করেছিলেন। এখন ৩২ বছর বয়সী কুরেশি ভারতের কানপুর শহরে চাচাতো ভাইদের চায়ের দোকানে কাজ করে আগের আয়ের এক-তৃতীয়াংশও পাচ্ছেন না। ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে ফেরার পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় তিনি এখন মা ও বড় বোনের সঙ্গে থাকছেন এবং

ক্রমেই অস্থিতিশীল হচ্ছে ভারত, বিপাকে প্রবাসী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ভারতের কর্মসংস্থানের দুটি বড় খাতকে চাপে ফেলেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করা শ্রমিকরা দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন, আর চামড়াজাত পণ্য থেকে শুরু করে কাচশিল্প পর্যন্ত ভারতের উৎপাদিত পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদাও কমে যাচ্ছে।

দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে কাজের সুযোগ এবং জুতা ও পোশাকশিল্পের মতো শ্রমনির্ভর উৎপাদন খাতে বৈশ্বিক চাহিদা বহু ভারতীয়কে স্থায়ী, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে লাভজনক আয় এনে দিয়েছে।

কিন্তু এখন বিদেশের সংঘাত ভারতের অর্থনীতিতে দ্বিমুখী আঘাত হেনেছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ফেরা শ্রমিকরা দেশে এসে নিজ শহরে আগের মতো আয় করতে পারছেন না। এতে বেকারত্ব বাড়ার পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়ছে।

গত জানুয়ারি পর্যন্ত মোহাম্মদ কুরেশি সৌদি আরবের একটি গয়নার দোকানে কাজ করতেন। মাসে প্রায় ৩০ হাজার রুপি আয় করে তিনি একটি ছোট বাড়ি নির্মাণ এবং বোনের বিয়ের খরচ জোগানোর মতো সঞ্চয় করেছিলেন।

এখন ৩২ বছর বয়সী কুরেশি ভারতের কানপুর শহরে চাচাতো ভাইদের চায়ের দোকানে কাজ করে আগের আয়ের এক-তৃতীয়াংশও পাচ্ছেন না। ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে ফেরার পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় তিনি এখন মা ও বড় বোনের সঙ্গে থাকছেন এবং আবার উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজের সুযোগের অপেক্ষায় আছেন।

কুরেশি বলেন, সৌদিতে জীবন সহজ ছিল, আর আয়ও ভালো ছিল। এখানে জীবন খুব কঠিন। যুদ্ধ যেন দ্রুত শেষ হয়, যাতে আমরা আবার ফিরতে পারি—এই দোয়া করি।

ভারতের অর্থনীতি এখনো প্রায় ৭ শতাংশ হারে বাড়ছে এবং শহরাঞ্চলে বেকারত্বের হার ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে অর্থনীতিবিদ ও নিয়োগদাতারা সতর্ক করে বলেছেন, প্রতি বছর কর্মবাজারে প্রবেশ করা ৬ থেকে ৭ মিলিয়ন তরুণের জন্য চাকরির সুযোগ দুর্বল, মজুরি বৃদ্ধির গতি ধীর এবং চাকরির মানও খারাপ হচ্ছে।

তাদের মতে, এই পরিস্থিতি সামাল না দেওয়া হলে ভোগব্যয় কমে যেতে পারে এবং গত মাসে উত্তর ভারতে হওয়া বিক্ষোভের মতো সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।

উত্তর প্রদেশের শিল্পনগরী কানপুরে এই চাপ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

বিদেশে জিনিসপত্র ও খেলাধুলার সরঞ্জাম সরবরাহকারী চামড়াজাত পণ্যের কারখানা কিংস ইন্টারন্যাশনালের মালিক তাজ আলম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি, গ্যাস, পরিবহন ও শিপিং খরচ বেড়ে গেছে, ঠিক যখন চাহিদা কমছে। এতে মুনাফা সংকুচিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, তার কারখানা প্রতিদিন ২০০টি চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম হলেও এখন অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে। একসময় যেখানে ৫০০-র বেশি শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে অর্ধেক কর্মী রয়েছেন। ফলে নতুন বিনিয়োগ বা নিয়োগে আগ্রহ কমে গেছে।

তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত ভবিষ্যৎ অন্ধকারই থাকবে। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলে বিনিয়োগ করবো কেন?

কানপুর ভারতের বছরে ৬ বিলিয়ন ডলারের চামড়া রপ্তানির প্রায় এক-চতুর্থাংশ জোগান দেয় এবং সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করে বলে জানিয়েছেন কাউন্সিল ফর লেদার এক্সপোর্টসের সহসভাপতি মুখতারুল আমিন।

তিনি বলেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো নিয়োগ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, যদিও তারা কর্মীদের ধরে রাখার এবং ছাঁটাই এড়ানোর চেষ্টা করছে।

বিদেশে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ভারতীয়ের মধ্যে প্রায় ৯০ লাখই উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে ১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা কর্মসংস্থানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

নিয়োগদাতারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর থেকে চাকরির বাজার আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। নিয়োগদাতারা নতুন কর্মী নেওয়া বিলম্বিত করছেন এবং পরিবারগুলোও বিদেশে কাজের জন্য খরচ করতে দ্বিধায় পড়ছে।

কানপুরের হায়াত প্লেসমেন্ট সার্ভিসেসের নিয়োগদাতা গৌতম বাটাগার বলেন, দেশে এবং বিদেশে—দুই জায়গাতেই চাকরির সুযোগ কমে গেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কতজন ভারতীয় শ্রমিক দেশে ফিরেছেন, তার সরকারি তথ্য নেই। তবে গত মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত প্রায় ১১ লাখ ভারতীয়—যাদের মধ্যে যাত্রী, শ্রমিক ও অন্যান্য ভ্রমণকারী রয়েছেন—ফিরে এসেছেন।

এই অনিশ্চয়তার প্রভাব দক্ষিণের কেরালা রাজ্যেও পড়ছে, যেখানে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা রেমিট্যান্স বহু বছর ধরে স্থানীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি।

৫০ বছর বয়সী থমাস চেরিয়ান সৌদি আরবে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে ১৮ বছর কাজ করার পর গত ডিসেম্বরে ছুটিতে দেশে ফেরেন। মার্চে তার কাজে ফেরার কথা ছিল, কিন্তু কোম্পানিটি প্রকল্প বন্ধ করে প্রায় ৬০০ ভারতীয় কর্মীকে ছাঁটাই করে।

তিনি বলেন, জুনের শেষ নাগাদ ফিরতে না পারলে তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।

কেরালার প্রবাসী কল্যাণ সংস্থা নোরক রুটের প্রধান নির্বাহী অজিত কোলাসারি বলেন, এখনো ব্যাপকহারে কেউ ফেরেনি। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক চাপের কারণে ব্যাপক প্রত্যাবাসন হতে পারে, যা কেরালার আগেই চাপে থাকা চাকরির বাজারকে আরও সংকটে ফেলবে।

২০২৫ সালের এপ্রিল-ডিসেম্বর সময়ে বিদেশে থাকা ভারতীয়দের পাঠানো রেমিট্যান্স ছিল ১০২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৯২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় বেশি। তবে জানুয়ারি-মার্চ সময়ের তথ্য এখনো প্রকাশ হয়নি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারের জন্য এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করছে।

ভারতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য কৃষির বাইরে কর্মসংস্থান তৈরি করা দেশটির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ান এন্টারপ্রেনিউরসের চেয়ারম্যান কেই রগুনাতান বলেন, এটি শুধু সাময়িক অর্থনৈতিক মন্দা নয়। এআই, দুর্বল বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে উৎপাদন, আইটি এবং বিদেশি শ্রমবাজার—সবখানেই প্রচলিত কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

ভারতের বেকারত্বের হার ফেব্রুয়ারির ৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে এপ্রিল মাসে বেড়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে শহুরে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১৪ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, অনেক শিক্ষিত তরুণ কম বেতনের বা অনিরাপদ চাকরিতে আটকে আছেন, যা তাদের দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ফরেন ট্রেডের অর্থনীতিবিদ রাম সিং বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে চাকরির অনিশ্চয়তা, রপ্তানিতে ঝুঁকি এবং ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন, পরিবহন ও বাণিজ্যনির্ভর খাতে নতুন নিয়োগ কমে যেতে পারে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো মজুরি বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, বিশেষ করে কম দক্ষতা ও নিয়মিত অফিসভিত্তিক কাজগুলোতে, যেগুলো এআই-স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। শ্রমবাজারে অতিরিক্ত কর্মী এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর নমনীয়তা চাওয়ার কারণে আরও বেশি চুক্তিভিত্তিক, গিগ ও অনানুষ্ঠানিক কাজ বাড়তে পারে।

সূত্র: রয়টার্স

এমএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow