ক্ষুদ্র টিস্যু থেকে হাজারো চারা: বদলে যাচ্ছে দেশের উদ্যান খাত
একটি ক্ষুদ্র টিস্যু থেকেই জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার রোগমুক্ত চারা। আধুনিক টিস্যু কালচার প্রযুক্তির কল্যাণে দেশের কৃষিখাতে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন এক সম্ভাবনা। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে ফুল, ফল ও উদ্যান ফসলের চারা এখন দেশেই উৎপাদন করছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) গবেষকরা। জানা গেছে, ডিএই এ পর্যন্ত মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহ জেলার হর্টিকালচার সেন্টারে তিনটি আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ‘টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প’র মাধ্যমে এসব গড়ে উঠেছে। এরপর বান্দরবানের বালাঘাটা, সাভারের রাজালাখ, কুমিল্লা সদর, ভোলার চরফ্যাশন ও টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে আরও পাঁচটি আধুনিক ল্যাব নির্মাণাধীন। এসব ল্যাবের কল্যাণে এখন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা পাকিস্তানের চেয়ে অর্ধেকেরও কম খরচে পাওয়া যাচ্ছে উন্নত জাতের জারবেরা, লিলিয়াম কিংবা ডি৯ কলা-স্টবেরির উন্নত চারা। ফলে দেশের সরকারি ল্যাবগুলোতে উৎপাদিত রোগমুক্ত চারা ব্যবহার করে লাভবান হচ্ছেন হাজারো কৃষক ও নতুন কৃষি উদ্যোক্তারা। আরও পড়ুন পাহাড়ে হচ্ছে আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব, মিলবে মানসম্পন্ন চারা সংশ্
একটি ক্ষুদ্র টিস্যু থেকেই জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার রোগমুক্ত চারা। আধুনিক টিস্যু কালচার প্রযুক্তির কল্যাণে দেশের কৃষিখাতে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন এক সম্ভাবনা। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে ফুল, ফল ও উদ্যান ফসলের চারা এখন দেশেই উৎপাদন করছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) গবেষকরা।
জানা গেছে, ডিএই এ পর্যন্ত মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহ জেলার হর্টিকালচার সেন্টারে তিনটি আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ‘টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প’র মাধ্যমে এসব গড়ে উঠেছে। এরপর বান্দরবানের বালাঘাটা, সাভারের রাজালাখ, কুমিল্লা সদর, ভোলার চরফ্যাশন ও টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে আরও পাঁচটি আধুনিক ল্যাব নির্মাণাধীন।
এসব ল্যাবের কল্যাণে এখন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা পাকিস্তানের চেয়ে অর্ধেকেরও কম খরচে পাওয়া যাচ্ছে উন্নত জাতের জারবেরা, লিলিয়াম কিংবা ডি৯ কলা-স্টবেরির উন্নত চারা। ফলে দেশের সরকারি ল্যাবগুলোতে উৎপাদিত রোগমুক্ত চারা ব্যবহার করে লাভবান হচ্ছেন হাজারো কৃষক ও নতুন কৃষি উদ্যোক্তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাঁচটি নতুন আধুনিক ল্যাব পুরোদমে চালু হলে দেশের উদ্যান খাতে বড় ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। তখন দেশে রোগমুক্ত ও উন্নতমানের চারার উৎপাদন সক্ষমতা আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে চালু থাকা তিনটি টিস্যু কালচার ল্যাবে ২ লাখ ১২ হাজার ৩৮৭টি রোগমুক্ত চারা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৯২ হাজার ৬৩৭টি চারা কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে বিক্রি হয়েছে। বাকি ল্যাবগুলো চালু হলে এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৫ লাখের বেশি।
থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশে এ প্রযুক্তির সফল ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশে নির্মাণাধীন ল্যাবগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী উদ্যান খাতের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।—অধ্যাপক ড. এম. এ. রহিম
তথ্য বলছে, গত বছর মাদারীপুরে উৎপাদিত হয়েছে ৯০ হাজার ২৩৭টি চারা, বগুড়ায় ৬২ হাজার ৫০০টি এবং ময়মনসিংহে ৫৯ হাজার ৬৫০টি। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে জি-৯ কলা, জারবেরা, স্ট্রবেরি ও আলুর চারার। আগামী অর্থবছর তিনটি ল্যাবের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হয়েছে।
হর্টিকালচার সেন্টারে উৎপাদন হচ্ছে অসংখ্য চারা/ছবি: জাগো নিউজ
সরেজমিনে মাদারীপুরের হর্টিকালচার সেন্টার ঘুরে দেখা গেছে উদ্যান খাতের বড় পরিবর্তন। সেখানে টিস্যু কালচার ল্যাব ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হচ্ছে জীবাণুমুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। গবেষক ও প্রযুক্তিবিদরা ল্যামিনার এয়ারফ্লোর সামনে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্ভিদ টিস্যু স্থানান্তর করছেন। সেটি এক বয়াম থেকে আরেক বয়ামে গিয়ে প্রাণ পাচ্ছে আরেক চারার।
সেখানে ল্যাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষিবিদ মো. এনামুল হক জাগো নিউজকে বলেন, নির্বাচিত মাতৃগাছ থেকে সংগ্রহ করা শুট টিপ প্রথমে জীবাণুমুক্ত করা হয়। এরপর বিশেষ পুষ্টিমাধ্যমে স্থাপন করা হলে উদ্ভিদ হরমোনের প্রভাবে কোষ বিভাজন শুরু হয়। কয়েক দফা সাব-কালচারের মাধ্যমে একটি ক্ষুদ্র টিস্যু থেকেই তৈরি করা যায় হাজার হাজার চারা।
ল্যাবে উৎপাদিত চারা সরাসরি মাঠে দেওয়া হয় না। প্রথমে পলি হাউজ ও হার্ডেনিং জোনে ধাপে ধাপে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া হয়। পর্যাপ্ত শক্ত হওয়ার পরই সেগুলো কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এনামুল হকের ভাষায়, টিস্যু কালচারে উৎপাদিত প্রতিটি চারা মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। রোগমুক্ত হওয়ায় এসব চারা দ্রুত বাড়ে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাঠে ভালো ফলন দেয়।
একসময় জারবেরা, লিলিয়াম কিংবা এমডি-২ আনারসের মতো উচ্চমূল্যের চারার জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো। বর্তমানে সরকারি টিস্যু কালচার ল্যাবেই এসব চারা উৎপাদিত হচ্ছে। ভারত থেকে আমদানি করা একটি জারবেরা চারার দাম যেখানে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, সেখানে সরকারি ল্যাবে উৎপাদিত একই মানের চারা পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ টাকায়।
বর্তমানে তিনটি ল্যাবে সফলভাবে চারা উৎপাদন হচ্ছে। নির্মাণাধীন নতুন ল্যাবগুলো চালু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানসম্মত চারার প্রাপ্যতা আরও বাড়বে।—মো. আব্দুর রহিম
মাদারীপুর ল্যাবে প্রথমবারের মতো টিস্যু কালচার প্রযুক্তিতে লিলিয়ামের চারা উৎপাদন শুরু হয়েছে। চলতি বছর প্রায় আট হাজার চারা উৎপাদিত হয়েছে। আগামী মৌসুমে লক্ষ্য ২০ হাজার। স্টেভিয়া নিয়েও পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলছে। বিদেশি চারার দাম যেখানে কয়েকশ টাকা, সেখানে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত চারা স্বল্পমূল্যে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি শুধু চারা উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি, প্রশিক্ষণ, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণেও সহায়তা দিচ্ছে। এরই মধ্যে হাজারো কৃষি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অনেকে টিস্যু কালচার চারা ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে ফুল, ফল ও উচ্চমূল্যের উদ্যান ফসলের চাষ শুরু করেছেন।
দেশে উৎপাদিত চারা তুলনামূলক কম দামে পাচ্ছেন কৃষকেরা/ছবি: জাগো নিউজ
জানতে চাইলে কৃষি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এম. এ. রহিম জাগো নিউজকে বলেন, ভাইরাসমুক্ত ও মানসম্মত চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির কার্যকারিতা আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। যেসব ফসলের দ্রুত ও বৃহৎ পরিসরে বংশবিস্তার প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির বিকল্প সীমিত।
‘থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশে এ প্রযুক্তির সফল ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশে নির্মাণাধীন ল্যাবগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী উদ্যান খাতের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে’—যোগ করেন তিনি।
একসময় উচ্চমূল্যের চারার জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সরকারি ল্যাবেই এসব চারা উৎপাদিত হচ্ছে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমছে, দেশীয় নার্সারি খাত শক্তিশালী হচ্ছে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে।—তালহা জুবাইর মাসরুর
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম মনে করেন, আধুনিক কৃষিতে মানসম্মত ও রোগমুক্ত চারা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষক শুরু থেকেই সুস্থ ও অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের চারা পাচ্ছেন, যা উৎপাদনশীলতা ও ফসলের গুণগত মান বাড়াতে সহায়তা করছে।
তার মতে, বর্তমানে তিনটি ল্যাবে সফলভাবে চারা উৎপাদন হচ্ছে। নির্মাণাধীন নতুন ল্যাবগুলো চালু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানসম্মত চারার প্রাপ্যতা আরও বাড়বে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে টিস্যু কালচার প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর জাগো নিউজকে বলেন, উন্নতমানের রোগমুক্ত চারা সহজলভ্য করা এবং গবেষণাগারের প্রযুক্তি দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়াই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
দেশীয় নার্সারি খাত তৈরি করছে নতুন উদ্যোক্তা/ছবি: জাগো নিউজ
তিনি বলেন, একসময় জি-৯ কলা, এমডি-২ আনারস, জারবেরা কিংবা লিলিয়ামের মতো উচ্চমূল্যের চারার জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সরকারি ল্যাবেই এসব চারা উৎপাদিত হচ্ছে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমছে, দেশীয় নার্সারি খাত শক্তিশালী হচ্ছে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা এবং কৃষকের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করছে এ প্রকল্প। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্রুত মাঠে পৌঁছানোর ফলে নতুন জাত ও উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির সম্প্রসারণ সহজ হচ্ছে—বলছিলেন তালহা জুবাইর মাসরুর।
এনএইচ/এমকেআর/ এমএফএ
What's Your Reaction?


