খাদ্য নিরাপত্তার রাজনীতি

রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক এবং সমাজ-সচেতন মহলে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি অধুনা অহরহ উচ্চারিত হচ্ছে । তার কারণ সহজেই অনুমেয় –বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ , বিশেষত চরম দরিদ্র খানাগুলো, তীব্র খাদ্য সংকটে নিপতিত। এই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা , সেমিনার, কনফারেন্সের কমতি ছিল না, এখনও নেই । কিন্তু সবই যেন সনাতনী ধারায় রোগ ধরার কৌশল – যেমন, উৎপাদন , ক্রয়ক্ষমতা , সচেতনতা , পুষ্টিকর খাবার ইত্যাদি বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের একগুচ্ছ সুপারিশমালা পেশ করা । আবার, অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর উৎস বহিঃস্থ অর্থায়নে কনসালটেন্টদের প্রতিবেদন। এতে করে খাদ্য ফি বছর নিরাপত্তা প্রস্নে প্রান্তিক উন্নতি ঘটেছে হয়তোবা কিন্তু বড়সড় ধাক্কা অভাবে এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষ অভুক্ত কিংবা আধপেটায় জীবন কাটায় । বলাবাহুল্য, খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত আমাদের এতদিনকার ‘আবিষ্কৃত’ উৎসগুলো যে সঠিক নয় তার প্রমাণ খাদ্যের জোগান বাড়ছে , সরকার বিশেষ বিশেষ কর্মসূচিতে গরিবের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করছে অথচ মানুষ ধুকছে খাদ্যের অভাবে। গলদটা তা হলে কোথায় ? দুই ।এই প্রস্নের উত্তর নিয়ে আমার বুকশেলফে সম্প্রতি জায়গা নিয়েছে একটা বই ঃ ‘হোয়

খাদ্য নিরাপত্তার রাজনীতি

রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক এবং সমাজ-সচেতন মহলে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি অধুনা অহরহ উচ্চারিত হচ্ছে । তার কারণ সহজেই অনুমেয় –বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ , বিশেষত চরম দরিদ্র খানাগুলো, তীব্র খাদ্য সংকটে নিপতিত। এই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা , সেমিনার, কনফারেন্সের কমতি ছিল না, এখনও নেই । কিন্তু সবই যেন সনাতনী ধারায় রোগ ধরার কৌশল – যেমন, উৎপাদন , ক্রয়ক্ষমতা , সচেতনতা , পুষ্টিকর খাবার ইত্যাদি বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের একগুচ্ছ সুপারিশমালা পেশ করা । আবার, অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর উৎস বহিঃস্থ অর্থায়নে কনসালটেন্টদের প্রতিবেদন। এতে করে খাদ্য ফি বছর নিরাপত্তা প্রস্নে প্রান্তিক উন্নতি ঘটেছে হয়তোবা কিন্তু বড়সড় ধাক্কা অভাবে এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষ অভুক্ত কিংবা আধপেটায় জীবন কাটায় । বলাবাহুল্য, খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত আমাদের এতদিনকার ‘আবিষ্কৃত’ উৎসগুলো যে সঠিক নয় তার প্রমাণ খাদ্যের জোগান বাড়ছে , সরকার বিশেষ বিশেষ কর্মসূচিতে গরিবের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করছে অথচ মানুষ ধুকছে খাদ্যের অভাবে। গলদটা তা হলে কোথায় ?

দুই ।
এই প্রস্নের উত্তর নিয়ে আমার বুকশেলফে সম্প্রতি জায়গা নিয়েছে একটা বই ঃ ‘হোয়াই নেশনস ফেইল টু ফিড দ্যা পুওর দি পলিটিক্স অফ ফুড সিকিউরিটি ইন বাংলাদেশ ‘ ( দেশগুলো কেন গরিবদের খাওয়াতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার রাজনীতি ) । জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম খাদ্য নিরাপত্তার সার্বিক বিষয় নিয়ে লিখেছেন ৩১৩ পৃষ্ঠার , হার্ড কভার বইটি (ম্যানোহার ২০২২) । তার বইতে অর্থনীতি , রাজনীতি এবং ইতিহাসের বাতাবরণে মোট সাতটি অধ্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তার খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে রয়েছে বিস্তৃত এবং চমকপ্রদ বিশ্লেষণ । লক্ষ করি, পরিমাণ এবং গুণগত পদ্ধতি অবলম্বনে লেখা বইটির উদ্দেশ্য কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী । মূলত রাজনৈতিক অর্থনীতির পদ্ধতি (পলিটিকেল ইকনমি এপ্রচ) ব্যবহার করে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত এবং খাদ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়েছে । মোট কথা , মূল প্রশ্ন হল বিদ্যমান খাদ্য নিরাপত্তা , সম্পদ এবং সর্বোপরি সুশাসনের প্রকট অভাবের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য বাংলাদেশ সরকার কীভাবে সাড়া দেয় এবং সেই সাড়ায় সীমাবদ্ধতা কী এবং কেন। লেখক মনে করেন বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণের মধ্যে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পৃক্ত রয়েছে এবং খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চায়ক হিসাবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বা রাষ্ট্রের ক্ষমতার বিষয়টি অবজ্ঞা করার মতো নয়।

তিন ।
আর তাই বইটি দাবী করছে যে , বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শেকড়ে গভীরভাবে প্রোথিত কারণটি হচ্ছে স্বয়ং রাষ্ট্রের প্রকৃতি – নেচার অফ বাংলাদেশ ষ্টেট – এবং তার সাথে যেসমস্ত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র এবং সমাজের মধ্যে সংযোগ ঘটায় সেগুলো । লাখো লাখো মানুষ অভুক্ত থাকে দেশটিতে যা সম্পদ অপ্রতুলতার জন্য নয় বরং রাষ্ট্রের প্রকৃতির কারণে । তিনি মনে করেন নিওপেটরিমনিয়াল বাংলাদেশ রাষ্ট্রে (neopatrimonial state) দুর্বল প্রশাসনিক ক্ষমতা , অকার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং সংগতিপূর্ণ চিন্তারীতির অভাব উন্নয়নমূলক এবং অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সরকারি প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়। উদ্বেগ আরও যে , সরকারের যতটুকু দক্ষতা আছে তাও ক্রমান্বয়ে ক্ষয়িষ্ণু বিধায় জনগণের দোরগোড়ায় সেবার নাম হয় ‘সোনার হরিণ’ । সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ , বাংলাদেশের এই নিওপেটরিমনিয়াল সরকারগুলো বেঁচে থাকে পৃষ্ঠপোষকতামূলক রাজনীতিতে যেখানে ব্যাক্তিকেন্দ্রিক বিনিময় সম্পর্ক সরকারের করণীয় নির্ধারণ করে । এভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে , নিওপেটরিমনিয়াল সরকার সুশাসন , এবং উন্নয়নেরও, সরাসরি বিপরীত বস্তু (এন্টিথেসিস ) । যেহেতু রাষ্ট্রের প্রকৃতি হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যকার দুর্বল সংযোগ , রাষ্ট্রের দুর্বল ধারণক্ষমতা , এবং পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি তাই এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার কাজটি দুরূহ দাঁড়ায় ।

আপাতদৃষ্টে মনে হবার যথেষ্ট কারণ আছে যে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের কাজটি নেহাত কঠিন । প্রতিস্রুতিবদ্ধ আমূল সংস্কার ছাড়া অর্থাৎ তোষণ ও শোষণমূলক রাজনীতি বেষ্টিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে বেরুতে না পারলে মুক্তি নেই। তার বড় প্রমাণ স্বাধীনতার ৫০ বছরের অধিক পরও বাংলাদেশের মানুষের একটা বড় অংশের খাদ্য নিরাপত্তা নেই। অর্থাৎ কুয়োতে পচা ব্যাঙ রেখে পানি সেচে লাভ নেই।

চার।
বইটির কিছু পর্যবেক্ষণ হৃদয় কাড়ে , মনে হয় বুঝিবা আমাদেরই মনের কথা। লেখক মনে করেন বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থাপনার নামে জা চলে তা নিছক রাজনৈতিক , লোকদেখানো – আসল কার্যকারণ নিয়ে মাথাব্যথা খুব কম এবং রাজনৈতিক লাভালাভ সরবচ্চকরনে নিবেদিত। এর ফলে জন নীতি বাজারে দক্ষতা বৃদ্ধিতে অক্ষম। দুই , হোক সে সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা, ভূমি সংস্কার , প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি , নীতিমালা বাস্তবায়নে ‘আংশিক সংস্কার’ ধারণা ফাঁদ পাতে এবং এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থতা হয়ে উঠে অনিবার্য । তিন , বাংলাদেশ এমনিতেই একটা দুর্বল রাষ্ট্র তার উপর নিওপেটরিমনিয়াল কাঠামোয় তোষণমূলক রাজনীতি এবং নিম্ন মানের আমলা রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে অধিকতর সংকুচিত করে রাখে। চার, রাষ্ট্রের ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতার পাশাপাশি প্রাক- ঔপনিবেশিক প্রথাগুলোর জন্য সমাজ এবং রাষ্ট্রের সংযোগ দুর্বল করে রেখেছে যার ফলে সমাজের জন্য নীতিমালা বাস্তবায়ন অনেকটাই অধরা থাকছে।

পাঁচ ।
বইটির বেশ কিছু জায়গা দখল করেছে খাজনা- খোঁজা (রেন্ট সিকিং) , দুর্নীতি এবং ‘অপশাসন ‘ , চাঁদাবাজি এবং বাজারের ব্যর্থতা , পরিসংখ্যানগত ত্রুটি প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তর তাত্ত্বিক , ঐতিহাসিক এবং প্রায়োগিক পর্যালোচনা। এগুলোর দাপুটে উপস্থিতিতে খাদ্য লভ্যতা এবং খাদ্যে প্রবেশগম্যতা হুমকির মুখে বলে মনে করেন বইয়ের লেখক। যেমন, খাজনা খাওয়া এবং সরকারি স্তরে দুর্নীতির জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ, বিশেষত খাদ্য বিতরণে এবং সংগ্রহে প্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে নি।

আপাতদৃষ্টে মনে হবার যথেষ্ট কারণ আছে যে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের কাজটি নেহাত কঠিন । প্রতিস্রুতিবদ্ধ আমূল সংস্কার ছাড়া অর্থাৎ তোষণ ও শোষণমূলক রাজনীতি বেষ্টিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে বেরুতে না পারলে মুক্তি নেই। তার বড় প্রমাণ স্বাধীনতার ৫০ বছরের অধিক পরও বাংলাদেশের মানুষের একটা বড় অংশের খাদ্য নিরাপত্তা নেই। অর্থাৎ কুয়োতে পচা ব্যাঙ রেখে পানি সেচে লাভ নেই।

ছয়।
মোহাম্মদ মোজা হিদুল ইসলামের লেখা বইটি নীতিনির্ধারক তো বটেই , সমাজ বিজ্ঞানীদের জন্য আশু পাঠ্য বলে মনে করি। খাদ্য সংকট সম্পর্কিত চলমান ডিসকোর্সে এর অবদান অপরিসীম । এতে আছে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের পর্যালোচনা এবং সম্ভবত খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে সরকারি অবদানের উপর বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনার প্রথম প্রয়াস। শুধুমাত্র কারিগিরি তথা অর্থনীতির লেন্সে বইটি লেখা হয় নি , একটা মাল্টি ডিসিপ্লিনারি দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হয়েছে বলা যায়।

তবে বইটির উপশিরোনামটি শিরোনাম হলে আরও ক্যাচি হতে পারতো বলে ধারণা। তাছাড়া , দু একটা অধ্যায় আরও একটু সংক্ষিপ্ত হলে পাঠক প্রশস্তি পেতে পারতেন। উঁচু মানসম্মত এই বইটির বাংলা ভার্সন আশা করছি।

এইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow