খাবার-ওষুধের দামে দিশাহারা পোলট্রি খামারিরা

ডিমের দাম বাড়লেও স্বস্তি নেই পিরোজপুরের খামারিদের। খাবার, ওষুধসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে বাড়তি দামের সুফল পাচ্ছেন না তারা। লোকসান গুনতে গুনতে ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ খামার বন্ধের উপক্রম হয়েছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে জেলার প্রায় ৩১ কোটি ডিমের ২৫০ কোটি টাকার পোলট্রি শিল্প। জানা যায়, দেশের আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে দক্ষিণের জেলা পিরোজপুর। মাছ ও মাংসের বাড়তি দামের মধ্যে তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রোটিন হিসেবে ডিমের সরবরাহ সচল রাখতে বড় অবদান রাখছে জেলার ডিম উৎপাদনকারী খামারগুলো। জেলার নেছারাবাদ ও নাজিরপুরে সব থেকে বেশি খামার রয়েছে। এসব খামার থেকে বছরে প্রায় ৩১ কোটি ডিম উৎপাদন হয়। যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। তবে স্বস্তিতে নেই খামারিরা। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসান সামলে খামার টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন তারা। এদিকে উৎপাদিত ডিমের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় ইতোমধ্যেই অনেক খামারি ঋণে জর্জরিত হয়ে বেছে নিয়েছে ভিন্ন পেশা। খাবার ও ওষুধের দাম না কমলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হ

খাবার-ওষুধের দামে দিশাহারা পোলট্রি খামারিরা

ডিমের দাম বাড়লেও স্বস্তি নেই পিরোজপুরের খামারিদের। খাবার, ওষুধসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে বাড়তি দামের সুফল পাচ্ছেন না তারা। লোকসান গুনতে গুনতে ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ খামার বন্ধের উপক্রম হয়েছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে জেলার প্রায় ৩১ কোটি ডিমের ২৫০ কোটি টাকার পোলট্রি শিল্প।

জানা যায়, দেশের আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে দক্ষিণের জেলা পিরোজপুর। মাছ ও মাংসের বাড়তি দামের মধ্যে তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রোটিন হিসেবে ডিমের সরবরাহ সচল রাখতে বড় অবদান রাখছে জেলার ডিম উৎপাদনকারী খামারগুলো। জেলার নেছারাবাদ ও নাজিরপুরে সব থেকে বেশি খামার রয়েছে। এসব খামার থেকে বছরে প্রায় ৩১ কোটি ডিম উৎপাদন হয়। যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা।

তবে স্বস্তিতে নেই খামারিরা। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসান সামলে খামার টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন তারা। এদিকে উৎপাদিত ডিমের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় ইতোমধ্যেই অনেক খামারি ঋণে জর্জরিত হয়ে বেছে নিয়েছে ভিন্ন পেশা। খাবার ও ওষুধের দাম না কমলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে জেলার কয়েক হাজার খামারি।

উৎপাদিত ডিমের খরচ তুলতে পরছে না বলে দাবি করছেন খামারিরা। জুলাই মাসের শুরুতে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হতো ১২০ থেকে ১২৫ টাকায়। এক মাসের ব্যবধানে আগস্টের শুরুতে সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায়। অর্থাৎ ডজনে প্রায় ২০ টাকা দাম বাড়লেও এর সুফল পাচ্ছেন না খামারিরা।

খামারিদের অভিযোগ, মুরগির খাবার, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ। একদিকে বাড়তি খরচ, অন্যদিকে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটের প্রভাব। ফলে বাজারে ডিমের দাম বাড়লেও উৎপাদন খরচের চাপ সামলে লাভ করতে পারছেন না তারা। লোকসানের কারণে অনেকেই ব্যবসা বন্ধের শঙ্কায় রয়েছেন।

এদিকে ডিমের দাম বাড়ায় কমেছে বিক্রি। গত মাসে যে পরিমাণ ডিম বিক্রি হয়েছে খুচরা বাজারে আগস্ট মাসে তেমন বিক্রি হয়নি এমনটাই বলছেন ডিম বিক্রেতারা। দাম বেড়ে যাওয়ায় কম বিক্রি হওয়ার ডিম নিয়ে বিপাকে বিক্রেতারা।

খামারা পালন করা হচ্ছে ডিম দেওয়া মুরগি/ ছবি: জাগো নিউজ
খামারা পালন করা হচ্ছে ডিম দেওয়া মুরগি/ ছবি: জাগো নিউজ

ক্রেতারা বলছেন, গত মাসেও ৪০ থেকে ৪২ টাকা হালিতে ডিম বিক্রি হয়েছে কিন্তু আগস্ট মাসের শুরুতে তা বেড়ে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। সিন্ডিকেট ব্যবসার কারণে ডিমের দাম বৃদ্ধি পেলে প্রশাসনকে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

সদর উপজেলার টোনা ইউনিয়নের খামারি ইমন শেখ বলেন, ‘বর্তমানে ডিমের দাম বৃদ্ধি থাকলেও খামারিরা তার সুফল পাচ্ছে না। এর মূল কারণ হচ্ছে যখন দাম কম থাকে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা তখন ডিম ক্রয় করে মজুত করে। পরে তারাই ডিমের দাম বাড়িয়ে নিজেদের মজুত করা ডিম বাজারে বিক্রি করে। যা খামারিদের জন্য মারাত্মক ক্ষতি। এ কারণে অনেক খামারি ঋণে জর্জরিত হয়ে ভিন্ন পেশায় চলে গিয়েছে।’

সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের খামারি প্রসেনজিৎ হাওলাদার বলেন, ‘ডিমের সিন্ডিকেট না ভাঙলে কোনো খামারি টিকবে না। একটা ডিম উৎপাদন করতে যে টাকা খরচ হয়, এই পরিমাণ বিক্রি মূল্য পাওয়া যায় না। তার উপরে খাবারের দাম বৃদ্ধি, ওষুধের দাম বৃদ্ধি তা তো আছেই। এত খরচ দিয়ে উৎপাদিত ডিমে লাভের কথা চিন্তা করা যায় না। সরকারের কাছে দাবি জানাই খাবার এবং ওষুধের দাম কমানো হোক। তাহলে খামারিরা বাঁচবে।’

নেছারাবাদের দৈহারি ইউনিয়নের খামারি ফিরোজ শেখ বলেন, ‘এখন খাবারের দাম অনেক বেশি, ওষুধের দাম বেশি, মুরগির বাচ্চার দাম বাইড়া গেছে। যে ডিম উৎপাদন হয় তাতে খাবার খরচ হয় না। অনেকে ধার দেনায় জর্জরিত হইয়া খামার বন্ধ কইরা দিছে এবং দেশ ছেড়ে চইলা গেছে। এখন খাবারের দাম আর ওষুধের দামটা যদি একটু কমে তাহলে খামারিরা ভালো থাকতে পারবে।’

ডিম বিক্রেতা আনিস শেখ বলেন, ‘বেচাকেনা অর্ধেক হয়ে গেছে। গত মাসে যে পরিমাণ ডিম বিক্রি হয়েছে এই মাসে তেমন বেচা হচ্ছে না। আমরাও চাই ডিমের দাম কমুক, ডিমের দাম কমলে আমাদেরও বেচাকেনা ভালো হয়, ক্রেতারা খুশি থাকে।’

বিক্রি জন্য ডিম সাজাচ্ছেন এক দোকানি/ ছবি: জাগো নিউজ
বিক্রি জন্য ডিম সাজাচ্ছেন এক দোকানি/ ছবি: জাগো নিউজ

ডিম ক্রেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা যারা সাধারণ মানুষ আছি তাদের ডিম কিনতেই হয়, না কিনে উপায় নাই। ডিমের যে দাম, এত দাম দিয়ে কিনে ডিম খেতে পারি না। মাছ-মাংসে প্রচুর দাম, এজন্যই ডিম একটু বেশি কেনা হয়। কিন্তু ডিমেরও দাম বেড়ে গেছে। ৪০ টাকার ডিম এখন ৪৮ টাকা কিনতে হয়।’

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তরুন কুমার সিকদার বলেন, জেলায় প্রায় সাড়ে চার হাজারেরও বেশি পোলট্রি খামার রয়েছে। বাৎসরিক উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৩১ কোটি ডিম। যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। সব থেকে বেশি ডিম উৎপাদন হয় নেছারাবাদ ও নাজিরপুরে। জেলায় ৩০০ এর মতো খামার বন্ধের উপক্রম। নতুন করে প্রায় ১৬০ টি খামার তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এই ফার্ম বন্ধের কারণ খাবারের দামের ঊর্ধ্বগতি, যার কারণে ডিম উৎপাদনে খরচ বেশি হচ্ছে। উৎপাদন খরচ না ওঠায় অনেক খামারি তাদের খামার বন্ধ করে দিয়েছে। জেলার উৎপাদিত ডিম স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল সহ বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। মধ্যস্বত্বভোগী কিছু ব্যবসায়ী আছে যাদের কারণে খামারিরা বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। খামারি থেকে ভোক্তা পর্যন্ত একটি ডিম আসতে দুই থেকে তিন টাকা চলে যায়। জেলা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর খামারিদের সব রকম সহযোগিতা করে আসছে।

দেশের ডিমের বড় একটি চাহিদা পূরণ হচ্ছে পিরোজপুর থেকে। খামারিদের মতে, উৎপাদন খরচ কমানো এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আরও সংকটে পড়তে পারে এই শিল্প।

মো. তরিকুল ইসলাম/এসজেডএইচ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow