খাল ভরাট করে পার্ক নির্মাণের অভিযোগ

দেশজুড়ে খাল খনন, পুনঃখনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। তবে মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভায় দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।  স্থানীয়দের দাবি, একটি সরকারি খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণ করে পার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে এলাকায় জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত সংকটের কারণ হতে পারে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু গাংনী পৌরসভার মালসাদহ মহল্লার দহ খাল। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে খালটি আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রধান পানি নিষ্কাশনের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে খালের ওপর কংক্রিট স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে পার্ক তৈরির কাজ চলায় ভবিষ্যতে খালটির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, নগর শাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি (আইইউজিআইপি) এর আওতায় ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৮ হাজার ৭২২ টাকা ব্যয়ে দহ খালের সৌন্দর্যবর্ধন ও ল্যান্ডস্কেপিং প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড। গত ৭ অক্টোবর ২০২৫ থেকে খালের ওপর কংক্রিট স্থাপনা, হাঁটার পথ, বসার স্থান ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হ

খাল ভরাট করে পার্ক নির্মাণের অভিযোগ

দেশজুড়ে খাল খনন, পুনঃখনন ও সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। তবে মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভায় দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। 

স্থানীয়দের দাবি, একটি সরকারি খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণ করে পার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে এলাকায় জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত সংকটের কারণ হতে পারে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু গাংনী পৌরসভার মালসাদহ মহল্লার দহ খাল। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে খালটি আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রধান পানি নিষ্কাশনের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে খালের ওপর কংক্রিট স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে পার্ক তৈরির কাজ চলায় ভবিষ্যতে খালটির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, নগর শাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি (আইইউজিআইপি) এর আওতায় ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৮ হাজার ৭২২ টাকা ব্যয়ে দহ খালের সৌন্দর্যবর্ধন ও ল্যান্ডস্কেপিং প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জাকাউল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড। গত ৭ অক্টোবর ২০২৫ থেকে খালের ওপর কংক্রিট স্থাপনা, হাঁটার পথ, বসার স্থান ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সৌন্দর্যায়নের নামে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ সংকুচিত করা হচ্ছে। তাদের মতে, এই খালটি আশপাশের এলাকার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ পানি নিষ্কাশনের পথ। ফলে খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণ করা হলে বর্ষা মৌসুমে ফসলি জমি প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

মালসাদহ এলাকার এক বাসিন্দা জানান, একসময় এই খালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত এবং মানুষ গবাদিপশুর গোসলসহ বিভিন্ন কাজে খালটি ব্যবহার করত। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে খালটি দখল ও ভরাটের শিকার হয়েছে। এখন পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় খালটির অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় কৃষক কুদ্দুস বলেন, আশপাশের জমিতে ব্যাপক পাটের আবাদ হয়। খালের পাড় উঁচু করে স্থাপনা নির্মাণ করা হলে ভবিষ্যতে পাট জাগ দেওয়ার জন্য খাল ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। এতে পাট চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

স্থানীয়দের মতে, সরকারি খালের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং জলাধার সংরক্ষণ নীতিমালার পরিপন্থি। এতে খালের স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হয়ে ভবিষ্যতে বড় ধরনের জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এদিকে সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ শাখা-২ এর সিনিয়র সহকারী সচিব শাহ মো. শামসুজ্জোহা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খালের হালনাগাদ ডাটাবেজ তৈরি এবং খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান একটি খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগকে নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন পরিবেশ সচেতনরা।

মালসাদহ এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, ১৯৬২ সালের এসএ রেকর্ডে জায়গাটি নদী হিসেবে উল্লেখ ছিল। পরে আরএস রেকর্ডে ইউসুফসহ কয়েকজন ব্যক্তি সেটি নিজেদের নামে রেকর্ড করে নেন। এ নিয়ে গ্রামবাসী আদালতে মামলা করলে উচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রায় ৩৫ বিঘা জমি দখলমুক্ত হয়। তবে এখনো রেকর্ড সংশোধন হয়নি এবং আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জমির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখার কথা রয়েছে।

তার অভিযোগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পার্ক নির্মাণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বরাদ্দ আসেনি। স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার প্রভাবেই পৌরসভা থেকে থোক বরাদ্দ দিয়ে খালের অবশিষ্ট অংশ দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণ করা হলে গাংনী উপজেলার চেংগাড়া ও মালসাদহসহ সাত থেকে আটটি গ্রামের ফসলি জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। কারণ গাংনী পৌর শহরের বর্জ্য ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের অন্যতম পথ এই খালটি। 

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন গাংনী পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী শামীম রেজা।

তিনি বলেন, ‘খালের অস্তিত্ব অক্ষুণ্ন রেখেই পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে এবং পানিপ্রবাহ সচল রাখার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। যে স্থাপনা করা হবে তা অন্য কারও জমিতে নয়, খালের জায়গাতেই হবে। এটিকে আমরা দখল বলছি না, বরং সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।’

বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল মেহেরপুর জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান বলেন, ‘বর্তমান সরকার খাল খনন ও সংরক্ষণের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু গাংনী পৌরসভা ১৪ কোটির বেশি টাকা ব্যয়ে খালের ওপর স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ফসলি জমির পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, সাত দিনের মধ্যে প্রকল্পটি বাতিল না করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow