খুলনার জলাবদ্ধতা কাটতে লাগবে দেড় বছর: নজরুল ইসলাম মঞ্জু

খুলনা মহানগরীতে একটু বৃষ্টি মানেই জলাবদ্ধতা। বৃষ্টি হলে নগরীর বয়রা, মুজগুন্নি, রয়েল মোড়, টুটপাড়া, রুপসা, শিববাড়ি ও ডাকবাংলো এলাকা এবং হাজি মহসিন রোডসহ অলিগলি পর্যন্ত ডুবে যায়। এমনকি জোয়ার-ভাটার সময় অনেক বাড়ির নিচতলাও তলিয়ে যায়। অথচ রাস্তা ও ড্রেনের পেছনে প্রতিবছর খরচ হয় কোটি কোটি টাকা। কিন্তু ভোগান্তি থেকে নিষ্পত্তি মেলে না নগরবাসীর। তিন মাসে আগে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন খুলনা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি সিটি করপোরেশন এলাকার সমস্যা সমাধানে নিজের কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন জাগো নিউজে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খুলনা প্রতিনিধি আরিফুর রহমান। জাগো নিউজ: মহানগরীতে জলাবদ্ধতা ঘিরে কী কী সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে? কেসিসি প্রশাসক: আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরে প্রথমে জলাবদ্ধতা সমস্যার কারণগুলো চিহ্নিত করেছি। বিগত সরকারের আমলে ড্রেন ব্যবস্থা নিয়ে করা ডিজাইন ও প্রজেক্টগুলোর অনেক ত্রুটি এখন ধরা পড়ছে। বিগত দিনে অপরিকল্পিতভাবে অনেক রাস্তা উঁচু করা হয়েছে। যে কারণে এখন দেখছি অনেক বাড়ির নিচতলা পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। এটা শহরবাসীর জন্য নতুন একটি সমস্যা।

খুলনার জলাবদ্ধতা কাটতে লাগবে দেড় বছর: নজরুল ইসলাম মঞ্জু

খুলনা মহানগরীতে একটু বৃষ্টি মানেই জলাবদ্ধতা। বৃষ্টি হলে নগরীর বয়রা, মুজগুন্নি, রয়েল মোড়, টুটপাড়া, রুপসা, শিববাড়ি ও ডাকবাংলো এলাকা এবং হাজি মহসিন রোডসহ অলিগলি পর্যন্ত ডুবে যায়। এমনকি জোয়ার-ভাটার সময় অনেক বাড়ির নিচতলাও তলিয়ে যায়। অথচ রাস্তা ও ড্রেনের পেছনে প্রতিবছর খরচ হয় কোটি কোটি টাকা। কিন্তু ভোগান্তি থেকে নিষ্পত্তি মেলে না নগরবাসীর।

তিন মাসে আগে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন খুলনা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি সিটি করপোরেশন এলাকার সমস্যা সমাধানে নিজের কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন জাগো নিউজে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খুলনা প্রতিনিধি আরিফুর রহমান

জাগো নিউজ: মহানগরীতে জলাবদ্ধতা ঘিরে কী কী সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে?

কেসিসি প্রশাসক: আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরে প্রথমে জলাবদ্ধতা সমস্যার কারণগুলো চিহ্নিত করেছি। বিগত সরকারের আমলে ড্রেন ব্যবস্থা নিয়ে করা ডিজাইন ও প্রজেক্টগুলোর অনেক ত্রুটি এখন ধরা পড়ছে। বিগত দিনে অপরিকল্পিতভাবে অনেক রাস্তা উঁচু করা হয়েছে। যে কারণে এখন দেখছি অনেক বাড়ির নিচতলা পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। এটা শহরবাসীর জন্য নতুন একটি সমস্যা। শহরের ভেতর থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্য যে ধরনের বেসিন থাকার দরকার তা নেই।

শহরের পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ২২টি খাল বদ্ধ অবস্থায় আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছিল। পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি পাম্প হাউজ নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু বিগত দিনে পাঁচবার টেন্ডার হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। রুপসার স্লুইস গেট ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। যে কারণে জোয়ারের সময় নদীর পানি শহরে চলে আসে। এমনকি পানি নিষ্কাশনের অনেকগুলো আউটলেট বন্ধ ছিল।

খুলনার জলাবদ্ধতা কাটতে লাগবে দেড় বছর: নজরুল ইসলাম মঞ্জু

খানজাহান আলী রোডে সিটি কলেজ সংলগ্ন ড্রেন হয়ে নগরীর পানির বড় একটি অংশ রুপসা নদীতে যায়। সেই ড্রেনের কাজ বন্ধ ছিল। জমি অধিগ্রহণ হলেও কেসিসি বিগত দিনে কাজ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এজন্য রয়েল মোড় এলাকা ঘিরে বৃষ্টি হলেই বড় ধরনের জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।

জাগো নিউজ: জলাবদ্ধতা সমস্যা দূর করতে কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

কেসিসি প্রশাসক: আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন মাসে ২২টি খালের মধ্যে ২১টি খালের বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হল আউটলেটগুলো উন্মুক্ত করা, যা আমরা করেছি। রয়েলের মোড় ও সিটি কলেজের পাশের ড্রেনের কাজ বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন। সে কাজ এখন শুরু হয়েছে। খানজাহান আলী রোডের ড্রেনের কাজ করতে গিয়ে ওখানে ১২টি বাড়ির মালিকদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়। তাদের ড্রেনের জায়গা ছাড়ার জন্য বলা হলে তারা রাজি হন।

খুলনার জলাবদ্ধতা কাটতে লাগবে দেড় বছর: নজরুল ইসলাম মঞ্জু

কাজ শুরু করার আগেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে প্রায় আড়াই মাস সময় লেগেছে। আমরা গত সপ্তাহে কাজ শুরু করেছি, যা দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। শহরের পাঁচটি ওয়ার্ডের পানি এই খানজাহান আলী রোডের ড্রেন থেকে রুপসা নদীতে গিয়ে নিষ্কাশন হবে। এই কাজ এখনই না করলে বর্ষাকালে অনেক সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে। এজন্য দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

শহরের পানি নিষ্কাশনের জন্য বেসিন থাকার দরকার। বেসিনগুলো ব্যবহার করে পানি দ্রুত সরে যেতে পারবে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যেসব খাল দিয়ে শহরের পানি যাবে, সেসব খাল পরিষ্কার করে উন্মুক্ত করা হচ্ছে। গত তিন মাসে ২২টি খালের মধ্যে ২১ খালের বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। আউটলেটগুলো উন্মুক্ত করা হয়েছে।

খুলনার জলাবদ্ধতা কাটতে লাগবে দেড় বছর: নজরুল ইসলাম মঞ্জু

আমাদের সামনে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হলো রয়েল মোড়ের আটকে যাওয়া পানি নিষ্কাশন। এর মধ্যে রয়েছে ২১, ২৩ ও ২৯ এর সম্পূর্ণ এবং ২৮ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের একাংশের পানি। এই ওয়ার্ডগুলোর পানি খানজাহান আলী রোডের ড্রেন হয়ে রূপসা নদীতে যায়। এই লাইনের শেষ মাথায় একটি পাম্প হাউজ হওয়ার কথা ছিল। আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে এই পাম্প হাউজ করতে পাঁচবার টেন্ডার হয়েছে। এই পাম্প হাউজের কনসেপ্ট ছিল জোয়ারের সময় নদীর পানি অনেক উচু হয় এবং নদীর পানি শহরে ঢুকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। কিন্তু সেই পানি তখন এই পাম্প হাউজের মাধ্যমে পাম্প করে পানি নিষ্কাশন করা হবে। ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশি সংস্থার অর্থায়নে প্রজেক্টটি বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু বিগত সরকারের সময় তা বাস্তবায়ন হয়নি। মন্ত্রণালয় থেকে এটা আবার রি-টেন্ডার করার জন্য বলেছে। এটা গত সপ্তাহেই আমরা রি-টেন্ডার করেছি। যা বাস্তবায়িত হলে শহরের জলাবদ্ধতা সমস্যার একটি বড় অংশের সমাধান হবে।

জাগো নিউজ: ভোগান্তি স্থায়ী সমাধানে রূপ নেবে কবে?

কেসিসি প্রশাসক: সব ধরনের উদ্যোগ নিলেও কিন্তু ভোগান্তি এখনই কমছে না। কারণ রুপসা ঘাটের স্লুইস গেটটি ভেঙেচুরে চুরমার অবস্থায় রয়েছে। সেটা ঠিক করার জন্য পাঁচ লাখ টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি পাম্প হাউস না হওয়া পর্যন্ত আপাতত পানি বের করার জন্য ঠিক করা হবে। স্লুইস গেটটি ভাঙার কারণে নদীর পানি এখন শহরে ড্রেনের মাধ্যমে চলে আসে। এজন্য জলাবদ্ধতা হচ্ছে। এটি মেরামতের জন্য আমরা কাজ শুরু করেছি। খান জাহান আলী রোডের কাজ শুরু করা হয়েছে। কিন্তু এই জলাবদ্ধতা নিয়ে যে সমস্যা, তা আরও এক থেকে দেড় বছর থাকবে। কারণ কেবল টেন্ডার হয়েছে। কাজ সম্পন্ন করতে প্রায় দেড় বছর সময় লাগবে। খালগুলো উন্মুক্ত করা হয়েছে। সচলের কাজ চলছে। তবে এটা নতুন কোনো পরিকল্পনা নয়। পরিকল্পনা আগেই ছিল। কিন্তু তা বিগত দিনে বাস্তবায়ন হয়নি।

খুলনার জলাবদ্ধতা কাটতে লাগবে দেড় বছর: নজরুল ইসলাম মঞ্জু

জাগো নিউজ: আগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ ও আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে কি?

কেসিসি প্রশাসক: জলাবদ্ধতা নগরবাসীর একটা বড় সমস্যা। এগুলো নিরসনে বিগত দিনে নেওয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ আমরা খতিয়ে দেখছি। অনেক ত্রুটি সামনে আসছে। এগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। আর আর্থিক ব্যয় বৃদ্ধির কোনো সুযোগ এখন এখানে নেই। তবে ওয়াসার কাজ আরও নতুন করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে শহরে।

খুলনার জলাবদ্ধতা কাটতে লাগবে দেড় বছর: নজরুল ইসলাম মঞ্জু

জাগো নিউজ: কেসিসি ও শহরে চলমান ওয়াসার কাজ কি সাংঘর্ষিক?

কেসিসি প্রশাসক: সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন রাস্তা কেটে ওয়াসা কাজ করছে। এই কাটা রাস্তা মেরামতের জন্য সিটি করপোরেশনকে ওয়াসা ক্ষতিপূরণ বাবদ ১০০ কোটির কিছু বেশি অর্থ দিয়েছিল। কিন্তু কাটা রাস্তাগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি হিসেবে ৩০০ কোটি টাকা চেয়েছিল কেসিসি, যা ঘিরে একটা অচল অবস্থা তৈরি হয়েছে। কারণ একটা রাস্তা কাটার পরে সেখানকার ফাউন্ডেশন নষ্ট হয়ে যায়। যেটুকু কাটা হয়েছে তার থেকে একটু বাড়িয়ে মেরামত করতে হবে। এই বিষয়টা দীর্ঘসময় ধরে অচল অবস্থায় ছিল। কিছুদিন আগে ওয়াসার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। যেটা আমরা সমাধান করেছি।

খুলনার জলাবদ্ধতা কাটতে লাগবে দেড় বছর: নজরুল ইসলাম মঞ্জু

সিটি করপোরেশন এখন আর ওয়াসার কাটা রোড মেরামত করবে না। রাস্তাগুলো ওয়াসার ঠিক করে দিতে হবে। তারা কাটবে আবার তারাই মেরামত করবে কিন্তু আমাদের ডিজাইন সম্পর্কে অবগত করতে হবে। আমরা রাস্তার কাজ তদারকি করবো।

জাগো নিউজ: চলমান কাজ ও সমস্যা কি মুখোমুখি হবে? স্থায়ী সমাধান হতে কত সময় লাগবে?

কেসিসি প্রশাসক: না, চলমান কাজের জন্য নগরবাসীর ভোগান্তি তৈরি হবে না। শহরের বিভিন্ন জায়গায় জলাবদ্ধতা সমস্যা দূর করতে আউটলেটগুলো সচল করেছি। কিন্তু রয়েল মোড় কেন্দ্রিক একটি বড় জায়গাজুড়ে সমস্যা। শহরের মূল পানিটাই এই খানজাহান আলী রোড সংশ্লিষ্ট ড্রেন হয়ে নিষ্কাশন হয়। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ ড্রেনের কাজই দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। আমরা ড্রেনের এক পাশ খুলে দিয়ে পানি যাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। কাজ চলমান রাখার পাশাপাশি পাইপ বসিয়ে কিছু পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও করেছি। কারণ কাজের কারণে পানি নিষ্কাশন বন্ধ থাকলে নতুন করে জলাবদ্ধতা তৈরি হবে। কাজও চলবে, পানিও চলবে। তবে বিগত সরকারের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে নতুন করে কাজ বাস্তবায়ন করতে ও সমস্যা স্থায়ী রূপে সমাধান করতে আরও এক থেকে দেড় বছর সময় লাগবে।

এসআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow