আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২৫। নতুন বিধান অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো জোটগতভাবে নির্বাচন করলেও আর কোনো দলের প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না; প্রত্যেক দলকে নিজ নিজ প্রতীকেই প্রার্থী দিতে হবে।
এই পরিবর্তনের একটি বড় প্রভাব পড়েছে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা কয়েকটি শরিক দলের ওপর। তাদের অন্যতম জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। অতীতে একাধিক নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জোট করে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করলেও এবার জমিয়তকে নামতে হচ্ছে নিজস্ব দলীয় প্রতীক খেজুর গাছ নিয়ে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, ধানের শীষের বাইরে এসে খেজুর গাছ প্রতীকে জমিয়ত কতটা আত্মবিশ্বাসী?
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জমিয়ত সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক কাসেমি কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপির ঘোষণা, ধানের শীষের পক্ষ নিন খেজুর গাছে ভোট দিন। যে কারণে তৃণমূল পর্যন্ত সবাই এটা সাপোর্ট করে নিয়েছে, এবারের নির্বাচনে খেজুর গাছই হলো তাদের ধানের শীষ। ফলে খেজুর গাছ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। প্রথমে কিছুটা সন্দেহ থাকলেও এখন কোনো শঙ্কা নেই।’
জমিয়ত খেজুর গাছে আত্মবিশ্বাসী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল জোটগতভাবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে। তাই আমরাও খেজুর গাছ নিয়েছি। তবে, এটা নেওয়ার কারণে কোনো প্রভাব পড়বে- এরকম কোনোকিছু মনে হচ্ছে না। আলহামদুলিল্লাহ চতুর্দিকেই সাধারণ ভোটাররা আমাদের সাদরে গ্রহণ করছেন।’
একই সুরে কথা বলেছেন দলের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীও।
কালবেলাকে তিনি জানান, অতীতে জোটগতভাবে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার অভিজ্ঞতার পর এবার নিজস্ব প্রতীক খেজুর গাছ নিয়েও জমিয়ত দারুণভাবে আত্মবিশ্বাসী।
আফেন্দী বলেন, মানুষ যথেষ্ট সাড়া দিচ্ছে এবং আমাদের খেজুর গাছ সব জায়গায় ছড়িয়ে যাচ্ছে- কোনো সমস্যা হবে বলে মনে করছি না (ইনশাআল্লাহ)। হাঁ, একটু বেশি পরিশ্রম করতে হবে। তবে, আমরা দলীয় প্রতীক খেজুর গাছ নিয়েই বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হবো ইনশআল্লাহ।
ধানের শীষের জায়গায় খেজুর গাছ জমিয়তের জন্য চ্যালেঞ্জ, নাকি এটি দলীয় স্বতন্ত্র পরিচয় তুলে ধরার সুযোগ- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,‘আমরা এটাকে চ্যালেঞ্জ মনে করছি এবং জমিয়তের স্বতন্ত্র স্বকীয়তা মানুষের কাছে উপস্থাপন করার সুযোগ হিসেবেও গ্রহণ করছি।’
বিএনপির সঙ্গে আসনসমঝোতা থাকলেও ভিন্ন প্রতীকে নির্বাচন ভোটের অঙ্কে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না বলেও আশা জমিয়ত মহাসচিবের।
মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, আশা করি একটা পর্যায়ে ‘প্রভাব পড়বে না’ এই জায়গাতে আমরা পৌঁছাতে সক্ষম হব (ইনশাআল্লাহ)। আমার দিন দিন উন্নতির পথে অগ্রসর হচ্ছি। আমাদের অবস্থান ক্রমাগতভাবে শক্তিশালী হচ্ছে। আল্লাহ সবাইকে কবুল করুন।’
প্রচারণায় খেজুর গাছ
প্রতীককে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচারণায় বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে দলটির প্রচার বিভাগ। জমিয়তের প্রচার সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী কালবেলাকে জানান, ধানের শীষ না থাকায় ভোটারদের মধ্যে যেন বিভ্রান্তি না তৈরি হয়, সে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ খেজুর গাছ প্রতীকটা এখন কারো কাছে অপরিচিত না। দেশের বাইরে বিশ্বমিডিয়াতেও এর আলোচনা আছে। তাই দেশের মানুষের কাছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বা খেজুর গাছ অপরিচিত কোনো দল বা প্রতীক নয়।’
মাঠপর্যায়ের অবস্থান
কেন্দ্রের আত্মবিশ্বাস মাঠে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর মিলছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের কথায়।
জমিয়ত সিলেট জেলা উত্তরের সাধারণ সম্পাদক মুফতি এবাদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘শুরুতে কর্মীদের মধ্যে প্রতীক নিয়ে কিছু প্রশ্ন ছিল। কিন্তু এখন খেজুর গাছ নিয়েই সবাই প্রচারণায় নেমেছে। আমাদের অঞ্চলে খেজুর গাছ পূর্ব পরিচিত। তাই মানুষ ধানের শীষের জায়গায় খেজুর গাছকে মানুষ সহজেই গ্রহণ করছে।’
উপজেলা পর্যায়ের এক নেতা জানান, জোটের মাঠে প্রতীকটি নতুন হলেও আমজনতার কাছে খেজুর গাছ আদি প্রতীক। তাই পরিচিত করতে খুব বেশি সময় লাগছে না।
তিনি বলেন, ‘খেজুর গাছ ইসলামী সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। তাই অনেক ভোটার এটাকে সহজেই চিনতে পারছেন।’
সুযোগ নাকি ঝুঁকি?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজ প্রতীকে নির্বাচন জমিয়তের জন্য একদিকে যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘমেয়াদে দলীয় পরিচয় গড়ে তোলার সুযোগ।
এক বিশ্লেষকের ভাষায়, ‘জমিয়ত যদি খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে উল্লেখযোগ্য ভোট পায়, তাহলে ভবিষ্যতে জোট রাজনীতিতেও তাদের দরকষাকষির শক্তি বাড়বে।’
সব মিলিয়ে খেজুর গাছ প্রতীক নিয়ে জমিয়তের এবারের নির্বাচন শুধু একটি ভোটের লড়াই নয়; এটি দলটির সাংগঠনিক শক্তি, ভোটভিত্তি ও রাজনৈতিক স্বকীয়তার বাস্তব পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় জমিয়ত কতটা সফল হয় তার উত্তর মিলবে ভোটের দিন।