গণতন্ত্র তুমি কার
গণতন্ত্র তোমাকে দিয়ে কী হবে, যদি তুমি মানুষের মৌলিক অধিকারই নিশ্চিত করতে না পারো? অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং শিক্ষা, এই পাঁচটি অধিকার যুগের পর যুগ ধরে মানুষের সামনে প্রতিশ্রুতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এখনো সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত। প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রতিশ্রুতির দায়িত্ব নিয়েছিল কে? কোন শক্তির ওপর ভরসা করে আমাদের পূর্বপুরুষদের এই স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল? সেই দলিল কোথায়, কার কাছে এবং তার কার্যকারিতা আজ কোথায়? যদি এই প্রতিশ্রুতির রক্ষক হিসেবে জাতিসংঘ বা বিশ্বব্যবস্থার বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দাবি করে, তাহলে মানুষ আজ তার বাস্তব প্রমাণ দেখতে চায়। কারণ কাগজে লেখা অধিকার আর বাস্তব জীবনের অধিকার এক জিনিস নয়। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ভাষণ মূল্যহীন। চিকিৎসাহীন মানুষের কাছে আন্তর্জাতিক সনদ অর্থহীন। শিক্ষাবঞ্চিত শিশুর কাছে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা একটি দূরের শব্দমাত্র। সবচেয়ে বড় সত্য হলো, গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোর মধ্যেই একটি গভীর শূন্যতা রয়ে গেছে। মানুষের সবচেয়ে জরুরি অধিকার, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতা, বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত না হলে বাকি সব অধি
গণতন্ত্র তোমাকে দিয়ে কী হবে, যদি তুমি মানুষের মৌলিক অধিকারই নিশ্চিত করতে না পারো? অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং শিক্ষা, এই পাঁচটি অধিকার যুগের পর যুগ ধরে মানুষের সামনে প্রতিশ্রুতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এখনো সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রতিশ্রুতির দায়িত্ব নিয়েছিল কে? কোন শক্তির ওপর ভরসা করে আমাদের পূর্বপুরুষদের এই স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল? সেই দলিল কোথায়, কার কাছে এবং তার কার্যকারিতা আজ কোথায়?
যদি এই প্রতিশ্রুতির রক্ষক হিসেবে জাতিসংঘ বা বিশ্বব্যবস্থার বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দাবি করে, তাহলে মানুষ আজ তার বাস্তব প্রমাণ দেখতে চায়। কারণ কাগজে লেখা অধিকার আর বাস্তব জীবনের অধিকার এক জিনিস নয়।
ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ভাষণ মূল্যহীন। চিকিৎসাহীন মানুষের কাছে আন্তর্জাতিক সনদ অর্থহীন। শিক্ষাবঞ্চিত শিশুর কাছে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা একটি দূরের শব্দমাত্র।
সবচেয়ে বড় সত্য হলো, গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোর মধ্যেই একটি গভীর শূন্যতা রয়ে গেছে। মানুষের সবচেয়ে জরুরি অধিকার, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতা, বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত না হলে বাকি সব অধিকার ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
কারণ যেখানে বিচার নেই, সেখানে অধিকার কেবল স্লোগান হয়ে যায়। যেখানে জবাবদিহিতা নেই, সেখানে গণতন্ত্র ক্ষমতাবানদের খেলায় পরিণত হয়। ফলে মানুষের ভোট থাকে, কিন্তু মানুষের মর্যাদা থাকে না।
আজ পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রে গণতন্ত্রকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন এটি একটি চূড়ান্ত সমাধান। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, গণতন্ত্র নিজে কোনো অলৌকিক শক্তি নয়। এটি কেবল একটি কাঠামো, আর সেই কাঠামো তখনই কার্যকর হয় যখন মানুষের বিবেক, সততা এবং দায়িত্ববোধ সক্রিয় থাকে।
কিন্তু যখন দুর্নীতি প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করে, যখন ক্ষমতা মানুষের ওপরে দাঁড়িয়ে যায়, তখন গণতন্ত্রও ধীরে ধীরে একটি বিমূর্ত শব্দে পরিণত হয়। মানুষ তখন বিশ্বাস হারায়, সমাজ বিভক্ত হয়, আর মানবতা ধীরে ধীরে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে।
ইতিহাস সাক্ষী, মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাম ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো ধর্মের নামে, কখনো রাজতন্ত্রের নামে, কখনো মতাদর্শের নামে, কখনো গণতন্ত্রের নামে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের মূল শক্তি মানুষের নিজের মধ্যেই থাকে।
স্রষ্টা মানুষকে সেই ক্ষমতা দিয়েই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। কোনো ব্যবস্থাই মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে না, যদি মানুষ নিজেই নিজের দায়িত্ব নিতে না শেখে।
তাহলে উপায় কী?
উপায় হচ্ছে অন্ধ অনুসরণ থেকে বেরিয়ে আসা। ব্যক্তিপূজা থেকে বেরিয়ে এসে সমস্যা সমাধানের সংস্কৃতি তৈরি করা। মানুষকে ব্যবহার করার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ গড়ার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও নয়, বরং নৈতিক। আমরা ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছি যেখানে মানুষ মানুষকে আর মানুষ হিসেবে দেখে না। এখানেই আমাদের ব্যর্থতা।
‘গোলাম’ মানসিকতা নিয়ে কোনো জাতি কখনো মুক্ত হতে পারে না। নামের আগে, চিন্তার ভিতরে কিংবা মানসিকতার গভীরে যদি দাসত্ব লুকিয়ে থাকে, তাহলে স্বাধীনতার স্লোগান দিয়েও মুক্তি আসবে না।
তাই অন্যের পেছনে অন্ধভাবে দৌড়ানোর পরিবর্তে আমাদের উচিত সত্যিকারের সমাধান খোঁজা। কারণ এই পৃথিবীতে মানুষকে স্রষ্টা অসহায় হয়ে বেঁচে থাকার জন্য পাঠাননি। মানুষকে পাঠানো হয়েছে মর্যাদা নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য।
যেদিন মানুষ নিজের শক্তি, নিজের দায়িত্ব এবং নিজের মানবিকতার মূল্য বুঝতে শিখবে, সেদিনই হয়তো নতুন এক পৃথিবীর সূচনা হবে। তখন গণতন্ত্র কাগজের শব্দ হবে না, মানুষের জীবনের বাস্তবতা হবে।
আরেকটি অপ্রিয় সত্য এখন স্বীকার করার সময় এসেছে। করুণার পাত্র হয়ে মানুষ কখনো সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হতে পারে না। মানুষকে ভিক্ষুক মানসিকতা দিয়ে নয়, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের ভিতের ওপর দাঁড়াতে হয়। আর সেই কারণেই আজ বিচারহীন রাষ্ট্রকে লাল কার্ড দেখানোর উপযুক্ত সময় আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সুযোগ এখন মানুষের নিজের হাতেই।
রাষ্ট্র যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্র মানুষের আনুগত্য দাবি করার নৈতিক অধিকার কোথায় পায়?
বাংলাদেশ আজ শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সংকটে নেই, বরং এক গভীর মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।
অথচ একটি রাষ্ট্র তখনই টিকে থাকে, যখন সাধারণ মানুষ অন্তত এই বিশ্বাস ধরে রাখে যে শেষ পর্যন্ত কোথাও না কোথাও বিচার আছে। কিন্তু যখন একটি শিশুর মৃত্যুর পর তার নিজের বাবাই প্রকাশ্যে বলে বসেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ বিচার হবে না’, তখন বুঝতে হবে শুধু একটি পরিবার নয়, রাষ্ট্রের ভিতও কেঁপে উঠেছে।
রামিসার মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়। এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের গভীর অনাস্থার প্রতীক। মানুষ আজ আদালতের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার খোঁজে, পুলিশের আগে জনতার ক্ষোভে আশ্রয় নেয়। কারণ মানুষের মনে একটি নির্মম বিশ্বাস গেঁথে গেছে, ক্ষমতাবানদের দেশে বিচার হয় না।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই অবিশ্বাস এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় বিপদ আর কিছু হতে পারে না। কারণ আইন তখনই কার্যকর থাকে, যখন মানুষ আইনকে ভয় করার আগে আইনকে সম্মান করে। কিন্তু যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আইন শুধু দুর্বলদের জন্য, তখন সমাজে নীরব ক্ষোভ, প্রতিশোধ এবং ঘৃণা জমতে থাকে। একসময় সেই ঘৃণা পুরো রাষ্ট্র কাঠামোর বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশের মানুষ আজ প্রশ্ন করছে ওসমান হাদির বিচার কোথায়? কত হত্যাকাণ্ড, কত নির্যাতন, কত শিশু মৃত্যু, কত ক্ষমতার অপব্যবহার, কত দুর্নীতির অভিযোগ বছরের পর বছর ঝুলে থাকে কেন? বিচার পেতে এত ভয়, এত দেরি, এত অদৃশ্য দেয়াল কেন? রাষ্ট্র কি ধীরে ধীরে শুধু ক্ষমতা রক্ষার যন্ত্রে পরিণত হয়ে যাচ্ছে?
একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিচার শুধু আদালতের কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিচার মানুষের মনেও প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। মানুষকে অনুভব করতে হয় যে রাষ্ট্র তার পাশে আছে। কিন্তু বাংলাদেশে আজ উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। মানুষ রাষ্ট্রকে ভয় পায়, সন্দেহ করে, এড়িয়ে চলে, কখনো কখনো ঘৃণাও করে। এটি কোনো সুস্থ রাষ্ট্রের লক্ষণ নয়।
প্রশ্ন এখন শুধু পুলিশের নয়। প্রশ্ন প্রশাসনের। প্রশ্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের। প্রশ্ন বিচার বিভাগের। প্রশ্ন সেনাবাহিনীসহ পুরো নিরাপত্তা কাঠামোর। প্রশ্ন পুরো জাতিরও।
কারণ অন্যায় যখন বারবার ঘটে আর সমাজ নীরব থাকে, তখন অন্যায়ের দায় শুধু অপরাধীর ওপর থাকে না। নীরব দর্শকরাও ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট আজ অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো মানুষের বিশ্বাস ভেঙে যাওয়া। কারণ একবার যদি মানুষ সত্যিই বিশ্বাস করে ফেলে যে দেশে বিচার বলে কিছু নেই, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো সরকার, কোনো আদালত, কোনো বাহিনী খুব সহজে সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে না। তখন রাষ্ট্র শুধু মানচিত্রে থাকবে, মানুষের হৃদয়ে নয়।
এই বাস্তবতা থেকেই ‘লাল কার্ড’ কথাটি এসেছে। এটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, কোনো আবেগের বিস্ফোরণও নয়। এটি রাষ্ট্রকে শেষবারের মতো সতর্ক করার ভাষা।
ফুটবলের মাঠে লাল কার্ড মানে খেলা থামিয়ে দেওয়া, কারণ নিয়ম ভাঙা সীমা অতিক্রম করেছে। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যখন বিচার বিলম্বিত হয়, যখন ক্ষমতার কাছে আইন দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন মানুষ থানায় গিয়ে নিরাপত্তার বদলে অপমানের আশঙ্কা করে, যখন নিহতের পরিবার বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্র বিপজ্জনক সীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আমি দূর পরবাস থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সেই লাল কার্ড দেখিয়েছি। কারণ নীরব থাকা মানে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা। কারণ সময়মতো সতর্কবার্তা না দিলে ভবিষ্যতের বিপর্যয়ের দায় থেকেও মুক্ত থাকা যায় না। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, মানুষের ক্ষোভকে অবহেলা করলে একসময় রাষ্ট্র নিজেই মানুষের কাছে বৈধতা হারায়।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, এত সতর্কতা কেন?
কারণ পরিস্থিতি শুধু একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যখন বিচারহীনতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন সমাজের ভেতরে ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি জন্ম নেয়। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, ‘ক্ষমতাই সত্য’, ‘সংযোগই আইন’, ‘টাকা থাকলে বিচার বদলে যায়’। এই মানসিকতা ছড়িয়ে পড়লে রাষ্ট্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় নতুন প্রজন্মের। একটি শিশু যদি বড় হতে হতে দেখে অন্যায় করেও পার পাওয়া যায়, বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, নিরীহ মানুষ ন্যায়বিচার পায় না, তাহলে তার মনেও রাষ্ট্রের প্রতি সম্মান তৈরি হবে না। তখন নাগরিক ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক ভেঙে গিয়ে শুধু ভয়, ক্ষোভ এবং স্বার্থের সম্পর্ক টিকে থাকবে।
এই কারণেই আজকের সতর্কবার্তা শুধু সরকারের উদ্দেশ্যে নয়। এটি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্দেশ্যে। এটি প্রশাসনের উদ্দেশ্যে। এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশ্যে। এটি বিচার বিভাগের উদ্দেশ্যে। এমনকি সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যেও।
কারণ একটি জাতি যখন অন্যায়ের সঙ্গে বসবাস করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সেই জাতির মানবিক মেরুদণ্ডও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
আজ বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন; রাষ্ট্র কি এখনও মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা রাখে? না কি মানুষ এরই মধ্যে মনে মনে রাষ্ট্রকে লাল কার্ড দেখিয়ে ফেলেছে?
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
[email protected]
এমআরএম
What's Your Reaction?