গুমে নিখোঁজদের মধ্যে বিএনপির ৬৮ শতাংশ, জামায়াত-শিবিরের ২২ শতাংশ

গুম কমিশনের কাছে জমা দেওয়া দেড় সহস্রাধিক গুমের মামলার অভিযোগের মধ্যে ২৮৭টি মৃত্যুর ঘটনা জোরপূর্বক গুমের সঙ্গে যুক্ত। এ মামলাগুলোর মধ্যে ২৫১ জন ভুক্তভোগী আর কখনো ফিরে আসেননি এবং তারা মৃত বলে ধারণা করা হয়।আরও ৩৬টি ক্ষেত্রে গুমের পর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে- অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’ ঘটনার পর বা নদীতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায়। গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশনের সদস্যরা চূড়ান্ত রিপোর্ট তুলে দেন। এ সময় কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেনসহ উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া উপস্থিত ছিলেন। সংখ্যাগত চিত্রের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা কমিশনের সংগৃহীত তথ্যের আলোকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুমের প্রকৃতি, ব্যাপ্তি ও বিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যাচাইকৃত অভিযোগ, পরবর্তী অনুসন্ধান, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য এবং স্বাধীন

গুমে নিখোঁজদের মধ্যে বিএনপির ৬৮ শতাংশ, জামায়াত-শিবিরের ২২ শতাংশ

গুম কমিশনের কাছে জমা দেওয়া দেড় সহস্রাধিক গুমের মামলার অভিযোগের মধ্যে ২৮৭টি মৃত্যুর ঘটনা জোরপূর্বক গুমের সঙ্গে যুক্ত। এ মামলাগুলোর মধ্যে ২৫১ জন ভুক্তভোগী আর কখনো ফিরে আসেননি এবং তারা মৃত বলে ধারণা করা হয়।আরও ৩৬টি ক্ষেত্রে গুমের পর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে- অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’ ঘটনার পর বা নদীতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায়।

গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশনের সদস্যরা চূড়ান্ত রিপোর্ট তুলে দেন। এ সময় কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেনসহ উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া উপস্থিত ছিলেন।

সংখ্যাগত চিত্রের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

কমিশনের সংগৃহীত তথ্যের আলোকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুমের প্রকৃতি, ব্যাপ্তি ও বিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যাচাইকৃত অভিযোগ, পরবর্তী অনুসন্ধান, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য এবং স্বাধীনভাবে সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে এখানে তুলে ধরা হয়েছে- কোন কোন গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, কীভাবে ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়েছে, কোন কোন প্রতিষ্ঠান এতে জড়িত ছিল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিণতিতে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, জোরপূর্বক গুম কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়; বরং এটি ছিল একটি কাঠামোবদ্ধ অনুশীলন, যা রাজনৈতিক চাপ, নিরাপত্তা অভিযান ও প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিস্তৃত ও অভিযোজিত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে উদ্ভূত এই ধরণগুলো জোরপূর্বক গুম ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত যুক্তি ও কার্যপ্রণালীকে স্পষ্ট করে।

অভিযোগের বিশ্লেষণ

কমিশনের কাছে মোট ১হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। গভীর যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ২৩১টি অভিযোগকে পুনরাবৃত্ত (ডুপ্লিকেট) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একই ঘটনা একাধিক মাধ্যমে জমা পড়েছিল- ইমেইল, কুরিয়ার ও সরাসরি উপস্থিত হয়ে; আবার কোথাও একই ঘটনার বিষয়ে একটি সংগঠন ও ভুক্তভোগী ব্যক্তি আলাদাভাবে অভিযোগ করেছেন। এই পুনরাবৃত্ত অভিযোগ শনাক্ত করা ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। নাম, ঘটনার বিবরণ এমনকি তারিখেও প্রায়ই পার্থক্য ছিল এবং বহু ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দেওয়া হয়নি, যা কমিশনকে নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করতে হয়েছে।

প্রয়োজনে ফোন নম্বর ব্যবহার, সাক্ষীদের ক্রস-রেফারেন্স এবং ফলো-আপ যাচাই করা হয়েছে। এর ফলে ১হাজার ৬৮২টি স্বতন্ত্র অভিযোগ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। এছাড়া, ডুপ্লিকেট (২৩১টি) এবং অযোগ্য মামলা (নিচে আলোচিত ১১৩টি) বাদ দেওয়ার পর সর্বমোট ১হাজার ৫৬৯টি অভিযোগকে সম্ভাব্য জোরপূর্বক গুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা মোট অভিযোগের প্রায় ৮২ শতাংশ। অর্থাৎ, অধিকাংশ অভিযোগই প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, যা ইঙ্গিত করে যে জোরপূর্বক গুম কোনো প্রান্তিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি পদ্ধতিগত সমস্যা।

কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয় সর্বমোট

১ হাজার ৫৬৯টি সম্ভাব্য গুমের মামলার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা পরে ফিরে এসেছেন। মোট ১ হাজার ২৮২ জন ব্যক্তি বিভিন্ন সময় অবৈধ হেফাজতে থাকার পর পুনরায় আত্মপ্রকাশ করেছেন। যদিও অধিকাংশই ফিরে এসেছেন, তবুও প্রতি ছয়জনের একজন এখনো নিখোঁজ- যা পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, গভীর মানসিক আঘাত এবং অসমাপ্ত বেদনার সাক্ষ্য। নথিভুক্ত মৃত্যুগুলো সংখ্যায় তুলনামূলক কম হলেও, এগুলো গুম ব্যবস্থার প্রাণঘাতী ঝুঁকিকে স্পষ্ট করে।

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ হাজার ৫৪৬ জন ভুক্তভোগী পুরুষ (প্রায় ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ) এবং ২৩ জন নারী (প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ)। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে যে জোরপূর্বক গুম প্রধানত পুরুষদের লক্ষ্য করেই সংঘটিত হয়েছে- যা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, তথাকথিত নিরাপত্তা হুমকি বা সমাজে পুরুষদের ভূমিকার সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে নারীদের সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে কম দেখাচ্ছে বলেই ধারণা করা হয়। অনেক পরিবার সামাজিক কলঙ্ক, ভয় ও চাপের কারণে নারীদের গুমের ঘটনা জানাতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে নারীরা নিজেরাই অভিযোগ জমা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ফলে নারী ভুক্তভোগীর স্বল্পসংখ্যক নথিভুক্ত তথ্যকে এই নীরবতা ও অনীহার প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করতে হবে।

তবুও, নারী ভুক্তভোগীদের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ এবং তাদের বিশেষ ঝুঁকি ও ভঙ্গুরতার কারণে তা আলাদা মনোযোগের দাবি রাখে।

কিছু পরিসংখ্যানের সঙ্গে আগের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের ভিন্নতা থাকতে পারে। এর কারণ হলো কমিশনের চলমান কাজ-ডুপ্লিকেট বাদ দেওয়া, অযোগ্য মামলা সরানো এবং বিভিন্ন উৎসের তথ্যের অসঙ্গতি সমাধান করা। ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানে আরও সংশোধন হতে পারে।

২০০৯-২৪ সময়কালে জোরপূর্বক গুমের আনুমানিক সংখ্যা

কমিশনের কাছে জমা পড়া অভিযোগগুলো প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম বলে ধারণা করা হয়, বিশেষত প্রাথমিক বছরগুলোতে। অনেক পরিবার জানতো না কোথায় অভিযোগ করা উচিত, কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন না যে অভিযোগে ফল আসবে। আবার অনেকেই প্রতিশোধের আশঙ্কায় চুপ ছিলেন। যেসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হয়েছে, সেখানে আন্ডার-রিপোর্টিং আরও তীব্র। পরিবারগুলো প্রায়ই মৃত্যুর কারণ বা পরিস্থিতি জানতে পারে না এবং তাই সেটিকে গুমের পরিণতি হিসেবে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। এসব মৃত্যু আনুষ্ঠানিক নথিতেই আসে না।

প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, প্রাপ্ত ১ হাজার ৫৬৯টি স্বতন্ত্র অভিযোগ সম্ভবত মোট ঘটনার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এ হিসাব সম্প্রসারণ করলে মোট জোরপূর্বক গুমের সংখ্যা আনুমানিক ৪ হাজার থেকে ৬ হাজারের মধ্যে হতে পারে।

জানা গেছে, এই অনুমান দুইভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমত, যেসব ব্যক্তি পরে সাজানো ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন, তারা প্রায়ই জানিয়েছেন যে, তাদের সহ-আসামিদের অনেকেই গুমের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু, তারা কেউ কমিশনের কাছে অভিযোগ করেননি। কেউ কেউ সাময়িকভাবে মামলা থেকে রেহাই পেয়েছেন, কেউ আবার ভয়ে সামনে আসেননি। বহু ফাইলে দেখা গেছে, একটি চার্জশিটে চার-পাঁচজনের নাম থাকলেও কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন মাত্র একজন। এই ধারাবাহিকতা প্রকৃত সংখ্যার বহুগুণ বেশি হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

দ্বিতীয়ত, নিখোঁজদের অনেক মামলায় পরবর্তী অনুসন্ধানে আরও ভুক্তভোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের সম্পর্কে আগে কোনো তথ্য ছিল না। এর একটি উদাহরণ কোড DEF12। ২২ বছর বয়সে এক যুবক নিখোঁজ হন। অনুসন্ধানে জানা যায়, তাকে ও তার ভাইকে একসঙ্গে তুলে নেওয়া হয়েছিল এবং ঘটনাস্থলে র‌্যাব-১১ চিহ্নিত একটি যানবাহন দেখা গিয়েছিল। পরে সেদিনই অপহরণ ঠেকাতে আসা এক বন্ধুকেও আটক করা হয়।

প্রথমে শুধু নিখোঁজ ভাইয়ের অভিযোগ জমা পড়ে। পরবর্তী অনুসন্ধানে অন্য দুইজনকে খুঁজে পাওয়া যায়, তারা তখন বিদেশে (মালদ্বীপ ও সৌদি আরব) ছিলেন। তাদের সাক্ষ্য তিনটি আন্তঃসংযুক্ত গুমের ঘটনা পুনর্গঠনে সহায়ক হয়।
এই ঘটনাগুলো থেকে প্রাথমিকভাবে র‌্যাবের সংশ্লিষ্টতা প্রতীয়মান হয়। তবে কে চূড়ান্তভাবে নিখোঁজ ব্যক্তির হেফাজতে ছিল- র‌্যাব-১১ নাকি র‌্যাব ইন্টেলিজেন্স সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। এ অনিশ্চয়তাই হেফাজত ও কমান্ড কাঠামোর অস্বচ্ছতা তুলে ধরে।

এ উদাহরণ দেখায়, কীভাবে একটি রিপোর্টকৃত গুমের আড়ালে একাধিক আনরিপোর্টেড ঘটনা লুকিয়ে থাকে এবং ব্যাপক অনুসন্ধানের পরও পুরো চিত্র আংশিক থেকে যায়। তাই সামগ্রিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কমিশনের রক্ষণশীল অনুমান হলো- আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে প্রায় ৪হাজার থেকে ৬ হাজার জোরপূর্বক গুমের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

জোরপূর্বক গুম নয় এমন মামলা

১ হাজার ৬৮২টি স্বতন্ত্র ফাইলের মধ্যে ১১৩টি অভিযোগ অনুসন্ধানের পর আইনি সংজ্ঞা অনুযায়ী জোরপূর্বক গুম হিসেবে গণ্য হয়নি। কোথাও অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছিলেন না, আবার কোথাও আটক ছিল নিয়মিত গ্রেফতার এবং ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের জন্য। এসব বিষয় নির্ধারণ করাও সহজ ছিল না; অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা নেই- এটি প্রমাণ করতেও সমান শ্রম দিতে হয়েছে।

একটি মামলা (কোড BHED13) এই জটিলতার বিষয়টি তুলে ধরে। এক যুবক চট্টগ্রামের পাহাড়ে উগ্রবাদী প্রশিক্ষণে গিয়ে নিখোঁজ হন। পরে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিরা জানায়, তিনি প্রাকৃতিক কারণে মারা গেছেন এবং সেখানেই দাফন করা হয়েছে। র‌্যাব ইন্টেলিজেন্স তার পরিবারকে হেলিকপ্টারে করে কথিত কবরস্থানে নিয়ে যায়। কবর খুঁড়ে সেখানে কেবল একটি কম্বল পাওয়া যায়। পরে গুজব ছড়ায় যে র ্যাব-৭ এর একটি সেলে তার মতো একজনকে দেখা গেছে। এতে পরিবার গভীর অনিশ্চয়তায় পড়ে।

কমিশনের অনুসন্ধানে শেষ পর্যন্ত প্রমাণ মেলে যে, যুবকটি সত্যিই প্রশিক্ষণ শিবিরেই মারা গিয়েছিলেন। পরে জানা যায়, একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী দল কবর খুঁড়ে মরদেহ নদীতে ফেলে দেয়। এই বিভ্রান্তি পরিবারকে দীর্ঘ মানসিক যন্ত্রণায় রেখেছে। ভুক্তভোগীর বোনের ভাষ্য- রাস্তায় চলতে গিয়ে আমার ভাইয়ের মতো কাউকে দেখলেই মনে হয়, সে-ই কি না।

এই ঘটনা আমাদের এটি দেখিয়ে দেয় যে, কখনো কখনো কখনো বিচারব্যবস্থা কতটা বিশৃঙ্খল এবং মানবিক ক্ষতির মাত্রা কত গভীর হতে পারে।

রাজনৈতিক পরিচয় ও গুমের ধরণ

বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুম বোঝার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায়, কারা ঝুঁকিতে ছিলেন এবং ঘটনাগুলো এলোমেলো পুলিশি কর্মকাণ্ড নাকি বেছে নেওয়া টার্গেটেড দমন ছিল।

রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বণ্টন

রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে গুমের ঘটনা বণ্টনের ক্ষেত্রে দেখা যায় ৯৪৮টির মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৪৭৬ (৫০.২ শতাংশ), ইসলামী ছাত্রশিবির ২৩৬ (২৪.৯ শতাংশ), বিএনপি ১৪২ (১৫ শতাংশ), জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ৪৬ ( ৪.৯ শতাংশ) ও‌ জাতীয়তাবাদী যুবদল ১৭ (১.৮ শতাংশ)। মোট হিসেবে দেখা যায় বিরোধী দল-সংযুক্ত সংগঠনগুলোই প্রায় ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ ভুক্তভোগীর প্রতিনিধিত্ব করে। ক্ষমতাসীন দলের সংশ্লিষ্টতা নগণ্য। এটি স্পষ্ট করে যে গুম রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ছিল না।

নিখোঁজদের রাজনৈতিক পরিচয়

নিখোঁজদের মধ্যে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো প্রায় ৬৮ শতাংশ, আর জামায়াত ও শিবির প্রায় ২২ শতাংশ। এই পার্থক্য ইঙ্গিত করে যে, অনেককে আটক করে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, আবার অন্যদের ক্ষেত্রে নির্মূলের প্রবণতা বেশি ছিল।

সময়ের ধারায় জোরপূর্বক গুমের প্রবণতা

বছরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে গুমের সংখ্যা বাড়তে থাকে, ২০১২-এর পর দ্রুত বাড়ে এবং দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত উচ্চমাত্রায় থাকে। ২০১৮-এর পর কমলেও এ প্রথা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

২০১৩ সালে গুমের ঘটনার হার ২০১৪ এর নির্বাচন পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে মিলে যায়। ২০১৮ ও ২০২২ সালেও রাজনৈতিক সংঘাতের প্রতিফলন দেখা যায়। ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার পর সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে একই পদ্ধতি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহৃত হয়েছে।

২০১৭-এর পর নিখোঁজ হয়ে স্থায়ীভাবে না ফেরার ঘটনা কমে আসে। তবে আটক, ভয়ভীতি ও পরে আইনি প্রক্রিয়ায় হাজির করার প্রবণতা বাড়ে। অর্থাৎ, যন্ত্রটি রয়ে গেছে, কেবল ফলাফল বদলেছে।

এমইউ/এএমএ/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow