গোলাম রববানীর একগুচ্ছ কবিতা

ধ্রুপদী পিপাসা ফিরে এসো   আজকাল বুকের ভেতর অজানা একটি ঝড় ওঠে  ঝড়টির কোনও নামকরণ  করতে আমি পারিনা  হৃদয়ে নিম্নচাপের ফলে হৃদয়ে প্রচণ্ড ভাঙচুর করে  হৃদমণ্ডলের উত্তাল এ ঢেউয়ের নাম হয়তোবা কেউ কেউ প্রেম বলেই চালিয়ে দেয়  এইতো সেদিন কপোতাক্ষে প্রচুর জোয়ার-ভাটা হতো মাইকেলের অর্থ কষ্টতো সেই কবেই চুকিয়ে দিয়ে গেছে অথচ আমাদের প্রেমের কষ্টটা ঠিকই রয়ে গেছে বরঞ্চ সেই ভালো তুমি না হয় ফিরে এসো ধ্রুপদী পিপাসা হয়ে তুমি আরেকটিবার ফিরে এসো মন মনমণ্ডলের ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় হয়ে  তুমি ফিরে এসো  নির্দিষ্ট মাত্রাতে এসো তাহলে একটি নামকরণ করা যাবে...   দুই. ত্যাগের শেষ নেই   আর কতবার বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে বাংলাদেশ আর কতবার খালি হবে হাজারো গ্রামবাংলার বুক শহর নগর মহানগরের বুক- বুক তো আর কোনো  ঢাল না। বাংলা আর কতবার হবে স্মৃতিসৌধ আর যাদুঘর  আর কতবার রাজপথ রঞ্জিত হবে রক্তে সমগ্র স্বদেশের হৃদয় আর কতশতবার ফাঁড়বে  ক্ষুধার্ত বাঘের হিংস্র নখের সব ভয়াল থাবা    আর কত সহ্য করে যাবে তলোয়ারের আঘাত,  গুলি-বন্দুক, কামান-বোমা আর গ্রেনেডের আঘাত আর কত ট্রাঙ্ক-ড্রোন আর যুদ্ধবিমানের আঘাত? আর কতবার বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে সো

গোলাম রববানীর একগুচ্ছ কবিতা

ধ্রুপদী পিপাসা ফিরে এসো

 

আজকাল বুকের ভেতর অজানা একটি ঝড় ওঠে 
ঝড়টির কোনও নামকরণ 
করতে আমি পারিনা 

হৃদয়ে নিম্নচাপের ফলে হৃদয়ে প্রচণ্ড ভাঙচুর করে 
হৃদমণ্ডলের উত্তাল এ ঢেউয়ের নাম
হয়তোবা কেউ কেউ প্রেম বলেই চালিয়ে দেয় 

এইতো সেদিন
কপোতাক্ষে প্রচুর জোয়ার-ভাটা হতো
মাইকেলের অর্থ কষ্টতো সেই কবেই চুকিয়ে দিয়ে গেছে
অথচ আমাদের প্রেমের কষ্টটা ঠিকই রয়ে গেছে

বরঞ্চ সেই ভালো তুমি না হয় ফিরে এসো
ধ্রুপদী পিপাসা হয়ে তুমি আরেকটিবার ফিরে এসো
মন মনমণ্ডলের ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় হয়ে 
তুমি ফিরে এসো 
নির্দিষ্ট মাত্রাতে এসো তাহলে একটি নামকরণ করা যাবে...

 

দুই.
ত্যাগের শেষ নেই

 

আর কতবার বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে বাংলাদেশ

আর কতবার খালি হবে হাজারো গ্রামবাংলার বুক

শহর নগর মহানগরের বুক- বুক তো আর কোনো  ঢাল না।


বাংলা আর কতবার হবে স্মৃতিসৌধ আর যাদুঘর 

আর কতবার রাজপথ রঞ্জিত হবে রক্তে

সমগ্র স্বদেশের হৃদয় আর কতশতবার ফাঁড়বে 

ক্ষুধার্ত বাঘের হিংস্র নখের সব ভয়াল থাবা 

 


আর কত সহ্য করে যাবে তলোয়ারের আঘাত, 

গুলি-বন্দুক, কামান-বোমা আর গ্রেনেডের আঘাত

আর কত ট্রাঙ্ক-ড্রোন আর যুদ্ধবিমানের আঘাত?

আর কতবার বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে সোনার বাংলাদেশ, 

আর কতবার ফিরে ফিরে আসবে এই বাংলায়

একাত্তর থেকে চব্বিশের জুলাই অথবা অপ্রত্যাশিত কিছু!

 


আমাদের কোনো দেওয়াল দুর্গ বা প্রাচীর নেই,

নেই বর্ম হেলমেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, বাঙ্কার রাডার,

ঢাল কিংবা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম- আধুনিক প্রতিরক্ষা।

 


কিছুদিন আগে তোমাকে পেয়েছিলাম স্বাধীনতা, 

আরো কিছুদিন পরে হয়তো তোমাকে পেলাম হে মুক্তি

স্বাধীনতার জন্যে, মুক্তির জন্যে, খোয়ালাম রক্ত

রক্তের বিনিময়ে আর কি'বা পেলাম হে বাংলাদেশ!

হয়তো বাংলাদেশ পেয়েছি সব্যসাচীর আমার পরিচয়ে 

হয়তো বাংলাদেশ পেয়েছি আধুনিক কবির 

স্বাধীনতা'য়, তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা 

হয়তো বাংলাদেশ পেয়েছি কবিদের কবি'র কবিতায় 

স্বাধীনতা এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো?

হয়তো বাংলাদেশ পেয়েছি বিদ্রোহী কবির বিদ্রোহী কবিতায়।

যেন রক্তিম সূর্যের প্রশ্ন- রক্তাক্ত ইতিহাসের পুনর্জন্ম-

বাংলার বুকের বয়ে চলা শুধু অবিরাম ক্ষতচিহ্ন 

বাংলাদেশ: এযেন স্বাধীনতার অনন্ত অসীম আর্তনাদ!

বাংলাদেশ, আমাদের তাগের কোনো শেষ নেই

বাংলাদেশ,  যেন আমাদের রক্তের কোনো মূল্য নেই।

 


তিন.

ধূলিজলে কারা যেনো খেলেছিল 


কারা যেন একদিন দলবেঁধে নেমেছিল 

ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপালেরই মতো আর মনে নেই

ছোট্ট একটা ঘুমের মতো ছোট্ট এ জীবন

মৃত্যুর দুয়ারে ঘণ্টাহীন যেন সংকেত ছাড়াই পড়ি

 


খুব সহজেই বুঝতে না পারি, অচেনা বাড়ির টানে

ক্ষমা মহৎকর্ম ভুলি প্রতিশোধপরায়ণতার ক্যুবানে

সময় চলে গেলে পিছনে শুধু দুহাত বাড়িয়েই ডাকি

পথের কষ্ট আর কতটুকুই বোঝে পৃথিবীর পথিক 

 


কারা যেন একদিন শুধু দলবেঁধে নেমেছিল

পাহাড় সুউচ্চ হতে হতে নিঃসঙ্গ সারথি হয়েছিল 

আব্বার ছেলে আর ছেলের আব্বার মতন

আমার এখন চব্বিশের অভ্যুত্থানের কথা মনে পড়ে

 


এখন কেবল জলে স্থলে আর আকাশে বাতাসে 

ভাঙনের বেগে ভাঙে, জলজ স্থলজ এবং প্রাণজ 

কখনো ভাঙে না সমূহ পৃথিবীর সব আব্বারা

আমার আব্বা এই যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর মতো হলেও

টিকে আছে বিরুদ্ধ সময়ের বিরূপতা সহ্য করে

শত ঝড়-ঝঞ্ঝা, উসকানির তির্যকফাল বুকে নিয়ে 

গোপাল বিড়ির গন্ধ আমার প্রিয় পারফিউম হলে

বারান্দার মেঝের প্লেটের ওয়াক্তগুলো আনন্দে

 


কারা যেনো একদিন শুধু দলবেঁধে নেমেছিল

তারপরে চলে গেছে ঝাঁকবাঁধা ভিমরুল আল ফেলে

ধোড়া সাপের মতন আর বোবার মতন আমি

আব্বা বলে ধৈর্য সহ্যে শক্তি আসে বাকিটাতো সময়ের।

 

 


চার.

অপার্থিব ভালোবাসা


জন্ম দিতে হলে রক্ত লাগে, মন লাগে—

তাহলেই তো শিল্প সন্তানেরা আলোর মুখ দেখে;

যেমন একদিকে মা—অপরদিকে শিল্পীরা।

 


যা কিছু ভাবছি আমি, তা হয়তোবা সামান্য—

তুমি যা কিছুই কল্পনা মাখছো—এ তো অসামান্য:

জেগে আছে ভূমি বুকে নিয়ে ভালোবাসা।

 


আজ চিন্তায় যদি সুদিন হাতছানি দেয়;

আগামীকাল, পরশু—কী হবে তা কেউই জানে না,

নিজেকে জীবিত রাখলেই সাদা-কালো আহা।

 


এ চৈতী নিশিহাওয়া কখনো ফিরবে না,

এতটা রঙিন করো না; অতটা রাঙিয়ে তুলো না—

জীবন বোঝে না জীবনানন্দের এই হাঁটাচলা।

 


আব্বা তুমি বটগাছ—তুমি চৈত্রের তপ্ত দুপুর—

কেউ তো বোঝেনি, না বুঝেছি এই আমি;

আমি কিন্তু এ কথা কাউকে আদৌ বলিনি।

 


পৃথিবীর, সব বাতি তুমি জ্বেলে দিলে—

গোলাম আমি, এক ও অদ্বিতীয়, বালক তোমার

অন্ধকারের এ ভালোবাসা এতটা সুখদায়ক।

 


এ কথা কেউ তো জানে না, নাইবা জানুক—

তুমি সূর্য বা প্রার্থনা ও হারমোনিয়ামের যত সুর—

কী করে বইবো আমি এতসব এ-ই আয়োজন?

 


 

পাঁচ.

বেদনার দিনলিপি 


আমি চলমান কিছু-

আমার আসা-যাওয়া, আমার নিত্য যন্ত্রণা বাড়া-

তুমি-আমি, আমাদের, এ ভূগোল!

অতীতের অনেক অসহ্যে;

ঘানিটানা মুগ্ধতায় আমাদের রীতিনীতি-

বিচ্ছেদের নিগূঢ় সম্পর্ক বোঝে, অতীত যাপনের যাপিত জীবন ঠিক কেমন!

 


আমি চলমান কিছু- হাঁটি পিছুপিছু প্রতিক্ষণ-

সূর্যের প্রখরতায় নামি; আপনাদের কলিজা ভরে দিতে স্নিগ্ধ বরফের নিচে আগুন।

চাঁদ স্বীকার করে সূর্যকে- নীলচে-লাল এ আলোকিত রঙের ভরারাত আমার প্রাক্তন। 

এদিকে আঁধার নেমে আসে- 

ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি- 'রাত'

 


আমি চলমান কিছু- আমাকে প্রত্যাহার কর না।

আমি প্রতিদিন আছি; থাকব বোধহয় অনন্তকাল! 

 

 


ছয়.

বিপ্লব আর বিষাদ 

 

 

বিপ্লবী বছর! নবরূপে সেজেই এসেছি

হাজির হয়েছি! পুরান ছকে নব ফুলের মালাতে

গেঁথে নিয়েই যেন শুধু করেছি এ-ই  বরণ।

 


শূন্যতার এই সংসার সাজায়ে শব্দাবলীর ভাঙা দূর্গ-

শব্দবাড়ি নির্মিত হয়ে গেছে, খেয়ালি পাণ্ডুলিপি 

জানিত না কিছু, জানায়ে গেছে দুখিনী বর্ণমালা অন্ধ!

 


বিপ্লবী বছর! প্রকাশ্য প্রকাশে সামান্য বিলম্ব নমঃ-

প্রাগৈতিহাসিকের মতো উলঙ্গ কিছুটা বিস্মিত স্মিত 

ক্ষণিক আনন্দে নাচি দেখে সিয়ামের চাঁদ ওঠা। 

 


বিপ্লবী বছর! শুভ যাত্রা তোমার পরিলেখ থেকে 

সূর্যোদয়ে, ধীরে ধীরে আলোকিত হয়ে আঁধারে মোড়া

নন-ফিকশনে সরল বিশ্বাসে- তিয়াত্তর না পনেরো!

 


কী আতঙ্ক! গোধূলি কবিতার একি মগ্নতা, না যন্ত্রণা-

না দুর্নীতি, না ব্যর্থতা- মিসরুল- নিয়ম বিরল ব্যাধি 

বিচ্ছিন্ন জিহ্বা, মিথ্যামূর্তি হবে বিসর্জন জানি!

 


মিথ্যার জয় দেখিনি কখনো- কোনদিন কোনকালে 

বৃদ্ধের বয়স পারিনি কখনো নামাতে যৌবনকাল-

বেঁধে রাখতে পারিনি কোনো বন্ধন কোনো অরূপ!

 


যত বিপ্লবী বছর- তত বিদায় বিষাদ- আদ্যোপান্তে

কিঞ্চিৎ মধু কিঞ্চিৎ বিষ, কিছুটা উপযোগী অনুপযোগী 

বিপ্লবী বছর- বিরুদ্ধ সময়- এতটুকু মাঠে-ময়দানে। 

বিপ্লব আর বিষাদ আর লাল সবুজের বাংলাদেশ।

 

 

সাত.
আগুনের দেশ

 

 

কেউ আগুন ধরাল আর কেউ আগুনে পুড়াল

আগুনের দেশে আগুন আগুন খেলা যেন বন্ধ হবার না

এ আগুন বড়োই নির্দোষ! বিকৃত মগজেরা হাসলো!  

 


ক্ষোভের আগুন, হিংসার আগুন, ঘৃণার আগুন

প্রতিহিংসার আগুন, লোভের আগুন, পাপের আগুন

পরচর্চার আগুন আরো যেন পরনিন্দার আগুন 

আরো যেন ছাইচাপা আগুনের গনগনে উজ্জ্বল রণ

এই আগুনে আগুন আগুয়ান হচ্ছে যুবতী মেয়েটি

আর পাড়ার সমস্ত ছেলেগুলো যেন বন্যপ্রাণীর হরিণী

লালসার জিহ্বাটা কী সুন্দর বের করে

 লালসার রস ঝরাচ্ছে রতিক্রিয়ার ট্রান্স! 

কতটুকু পুলকিত হলে বস?

 

 


আগুনে আগুন খেলো, ফাগুনের লাল অভিশপ্ত হল

সুপ্ত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের স্রোতধারাও থেমে গেল

আগুনের গলায় রশি উঠলো- ক্ষমতার আগুন ফুসলো 

বাঙলার বুক চুষে চুষে শুধু ধ্বংসযজ্ঞের নিলামে তুলল

পুড়তে পুড়তে সকল ফুরিয়ে যায়, ফুরিয়ে যাচ্ছে আগুন

যোগ-বিয়োগের হিসেব বোঝে না- নেই আর অভিমান;

আগুনের দেশ লাল আগুন অপেক্ষা এখনো শিখিনি 

কৌশলী হতে! পোড়ানো ছাড়া আগুন কিছুই বোঝেনি! 

সবুজের দেশে মানুষ আগুন অপেক্ষা ভয়ঙ্কর আগুন!

 

 


আট.

বন্দি শিবিরে

কবিতার গায়ে আজ এ কেমন ফসকা পড়েছে

আলোপ্যাথি হোমিওপ্যাথির পথ্যে সারে না আর!

সারেনা কেমোথেরাপি কিংবা সার্জারীর অস্ত্রোপচারে

কবিতা কী জীবিত আছে নাকি শুধু-ই আজ মুমূর্ষুর! 

 


কবিতার সংসার থাকে শৃঙ্খলের সীমানার সীমাবদ্ধে

তোয়াক্কা করে না কারে বোগলে বাঁজায় খালি বাজি।

ঘোলাটে আলোর নীল অন্ধকারে চোখ ভেঙে পড়ে, 

উল্লাসে মাতোয়ারায় খেলে কানে বাজে আকাশবাণী!

 


ভেসে আসে প্রতিদিন নরকবাতাস এই ভূমিরাজ্যে-

দমবন্ধ হয়ে আসে মুগ্ধতায়; হিমেল জ্যোৎস্নার রাত্রি!

 


কবিতার বিরুদ্ধে কবিতা পউষের বিরুদ্ধে পউষ

তেলমাথায় কী জবজবে তেল; জটের মত জড়ান!

মাটির মত কবিতার অবস্থা শেষ নিঃশ্বাসের মত সুখী 

পুরো আকাশটা অবরুদ্ধ বন্দী শিবিরে আজ বাজি!

 

 


নয়.

প্রবোধ পাণ্ডুলিপি 

জনগণ দানব হলেই সরকার ভোঁতা হয়ে যায়,
সরকার দানব হলেই তো তবে জনগণ গোলাম হয়।
বসে আছে উষ্ঠা খেয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধ বারুদ-
যেন রক্তিম সূর্যের কোলে! তীব্র তাপের গাঢ় দুর্যোগ!

 


বাড়ন্ত বাঙলার চেহারা উজল হতে হতে 
দেখলাম, বহু হারামির বিপুলা রূপ আগুন!
দিনের আলোর মত আলোভূক গোগ্রাসে চিবায়
বসে আঁধারের পেটে, লুটে বিদ্যুৎ প্রবাহ বিদঘুটে। 

 


ফিরছে আকাশে মেঘ! ছেঁড়া ছেঁড়া নীলে এই বুঝি 
ভাসছে পেঁজা তুলার মতো এ পৃথিবী, 
ভাবনার কলকব্জাগুলি ধরে জংরং জনলয়ে,
করুণায় আবিষ্ট ইন্দ্রিয়ে জটিল চিহ্ন স্নায়ুর আতঙ্ক!

 


সর্বত্রেই বিমুক্ত প্রান্তের মতো খোলা ঘরে নিত্যকার
বহুরূপ ধরে! মগজ খুলির মধ্যে ঘসেটি বেগম লাইন
গিরগিটি বিফল লালন বুঝেশুনেই রয়েছি বসে;
তালুতে এখন তরতর করে বাড়ছে বিষাক্ত গাছ।

 


গাছের প্রসার বাড়ে সময় না-কি দখলের বাঁধ
আপন রক্তের সঙ্গে পুঁজিবাদী সুযোগসন্ধানী 
মুখে মুখে রাম রাম জপে! মালা আর তসবিহ কাঁদে!
ইস রক্তিম লাল হয়েছি! জনগণের পাদুকা।

 


আস্তেধীরে ভরে ওঠে গলা- নির্লজ্জ ইবলিশ প্রাণ
সময় সূর্যে প্রবোধ পাণ্ডুলিপি জুড়েই খামেনির মরণ!
ভালো আর হবে আমাদের মানুষের এই পৃথিবী;
মানুষের পৃথিবীতে বাণিজ্যের চেয়ে কিছু নাই দামি!


 


দশ.

বিশ্বাস

 

 

বিশ্বাস, বিষফোঁড়া আর এক পিতার আর্তনাদ

চৌত্রিশটি বছর কেবল এভাবে বিশ্বাস করেই গেলাম
পদে পদে শুধুমাত্র লাঞ্চিত হলাম বঞ্চিত হলাম
আরও হলাম ভাগ্যাহত;তিনি ভাগ্যনিয়ন্তা ভাগ্য বাঁচান।
তবে কপালের দোষ দিয়ে বলুনতো আর হবেডা কী!
এই কপাল আর কত আঙুলইবা হবে?
বড়জোর তিন/চার আঙুলেরই কপাল!
ক্ষমতার কি'বা বোঝে!
তাই বলে কী কপাল বৈষম্য বারুদের বারুদানলে পুড়বে?


তিন কূলে একমাত্র পুত্র ছাড়া কিছুই ছিল না তার;
ছিলনা বেঁচে থাকার কোনও নিবিষ্ট সাধনার বিশেষ কারণ
১৯৯১ আর ২০১১ কোনও ভাবেই ফেলে দেবার মতো না
বাকিটা ছলনা আর রঙঢঙ; বিশ্বাস ও বিষফোড়া।


একপিতার আর্তনাদে চোখের ভেতর দিয়েই ভাপ ওঠে
যেন গ্রামের সেদ্ধধানের পাত্রে ধোঁয়া ওঠার মতো
অথবা গ্রীষ্মের দুপুরের খা খা সীমান্তের চোখ রাঙানি
অথবা তীব্র কনকনে শীতের মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ার মতো।


একপিতার আর্তনাদেও সহনশীলতা ক্ষমাশীলতার ঢেউ
তারই ছায়ায় আশ্রয় আমার ভালো, থেকো প্রিয় আব্বা।


কবিতা হলো পৃথিবীর আয়নার মতন। যার মাধ্যমে পরিস্কারভাবে ফুটে ওঠে তামাম পৃথিবীর সবকিছু। যদি হৃদয়ের আয়না স্বচ্ছ আর পরিস্কার হয়; কবিতায় সমাজ-সংসারের চিত্রটা বেশি ঝকঝকে আর চকচকে দেখা যায়।আকর্ষিত হয়।কবিতা হলো ঘটে যাওয়া অথবা চলমান নানা ঘটন-অঘটনের সত্যতা, বাস্তবতার নিরূপণ, মিথ্যার অপনোদন, ধ্বংস বিনাশের অপতৎপরতা ও সৃষ্টির সুরক্ষা এবং আগামীর স্বপ্ন-কল্পনা-বাস্তবতার চিত্রায়ণের লক্ষ্যই অবিচল থাকে। যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সুন্দর জয়জয়কার করে সমন্বিত দৃষ্টিপাত; দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে ওঠে কবিতার রস।আস্বাদিত হয় যুগ-যুগান্তর ধরে।ইতিহাস-ঐতিহ্য, সমসাময়িক জীবন-মান, জীবন-জীবিকার মিথষ্ক্রিয়া, প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ-যাতনা, বিচ্ছেদের নির্মমতা, পরিবেশ-প্রতিবেশের ঔজ্বল্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিবাচক পরিবর্তন, বৈষম্য-অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার, সমতা-সাম্য আর তথ্য-যোগাযোগ-প্রযুক্তির ভালো-মন্দের বন্দোবস্ত থাকে। কবিতায় চলমান-চিত্র, দর্শন, শিল্প-সংগ্রহ, শিল্প-ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য, রাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও ভৌগোলিক পরিমণ্ডলের বিষয়াবলির সহনশীল সম্প্রীতি উঠে আসে।রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মকে হিংস্রধর্মে রূপান্তরিত না করা, আচার-অনুষ্ঠান, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, অপসংস্কৃতির ভয়াবহতা, হিংসা-লোভ, হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতিহিংসার ভয়াবহ বিপর্যয়ের করুণ পরিণতি নয় বরং উত্তরণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে কবিতা। জীবন-জীবিকার টানাপোড়েনের সমাচার, আচার-আচরণ-ব্যবহার, বৈশ্বিক সংকট-সমাধানের পথ, সহিংসতা নয় অহিংসার লালন পালন, যুদ্ধ নয় শান্তি, মানবিক বিপর্যয় নয় মানবিকতার জয়জয়কার এবং সমস্তই উত্তরণের নিরেট দলিল হলো কবিতা। কবিতা হলো মন ও মননের উৎকর্ষ সাধনের উপায়। ক্ষমতার নির্মহ শীতল জল। যে জলে গা ধুয়ে নিয়ে পারে একই অনুভবে সৃষ্টির প্রাণ- কবিতা এমনই বিশাল কিছু। স্রষ্টার ইশারার ভাষা। 

কবিতার অভিনবত্বের কারসাজি তো গান।কণ্ঠের যাদু।সুরের মায়া।গানের সুরের মত কবিতার আস্বাদিত রূপ চিরদিন চিরকাল পৃথিবীর আকাশে বাতাসে সুবিস্তীর্ণ প্রসারিত হয়।মুগ্ধতা ছড়ায়।একটা ভালো গান যেকোনো বয়সী শ্রোতার কাছে ভালো লাগে; অর্থ বুঝুক বা না বুঝুক- কবিতাও এমন পরিশীলিত হওয়া উচিত।মানুষ মাত্রই চিন্তাশীল, সৃষ্টিশীল, ভাবুক প্রকৃতির। কিন্তু ভাবুক মাত্রই যে কবি এমন নয়। কবিতা লেখার জন্য সুস্থ চিন্তাভাবনা অত্যাবশ্যক।এর সাথে বয়সের পরিপক্বতার চেয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিপক্বতার সজাগ হওয়া বাঞ্ছনীয়।সত্যকে শৈল্পিক কারুকার্যে সেলাই করাই বোধগম্যতাই কবিতার মানভূমি; পক্ষপাতদুষ্টতা  চরিত্রহীনতার মাপকাঠি।যা নির্বোধ ও নির্লজ্জতার শামিল। পৃথিবীর সকল স্থান-কাল-পাত্র-ব্যক্তির কথাগুলোকে কবিতায় রূপ দিতে, শিল্প সুষমামণ্ডিত ও সমৃদ্ধ করতে ভাব-ভাষা, ভাবনা, কাব্যকলা, শব্দ, ছন্দ ও অলঙ্কার ইত্যাদি অনুসঙ্গ দরকার হয়। এগুলোকে বাস্তবতা ও কল্পনার সংমিশ্রণে চিত্রকল্পময় একটি পৃথিবীর বিনির্মাণ করতে হয়। বৈচিত্র্যময় অলঙ্কার দিয়ে; যেমন- উপমা, উৎপ্রেক্ষা, সমাসোক্তি, ক্ষেপ্রোক্তি, রূপক, তির্যক, অনুকার, প্রতীক, চিত্রকল্প, দৃশ্যকল্প, অনুপ্রাসসহ বিবিধ অলঙ্কার প্রয়োজন। এসব বোঝাপড়ার কল্পনাশক্তিকে যত বেশি সম্প্রসারণ করা যায়, কবিত্বকলার শক্তি ততই প্রকটভাবে বিস্তরণ ঘটে। মোটকথা, সূত্র দিয়ে জীবন চলে না। কিন্তু জীবনের জন্য নিয়মকানুন অপরিহার্য। কবি ও কবিতার ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটলে জগাখিচুরি ঘটার প্রবল সম্ভাবনা। 

গোলাম রববানী, কবি,লেখক ও শিক্ষক। ১৯৯১ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোরের কেশবপুর উপজেলাধীন বাঁশবাড়ীয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মো.লিয়াকত আলী মোড়ল। মাতা খাদিজা খাতুন।তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে  স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ মেঘনার মেয়ে(২০২৫)। ২০২৬ সালে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ 'প্রবোধ পাণ্ডুলিপি' আসার কথা ছিল; অনিবার্য কারণবশত বইটি প্রকাশিত হয়নি। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই কবিতার সাথেই আছেন।দেশের জাতীয় দৈনিক, অনলাইন পোর্টাল ছাড়াও বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখির সাথে যুক্ত আছেন।কবিতা লেখা ছাড়াও প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও সাহিত্য আলোচনা সমালোচনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow