চট্টগ্রামে পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ

টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অধিকাংশ মাটির ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। অসংখ্য পাকা ও আধাপাকা বাড়িতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমেছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাথারিয়া, খানখানাবাদ, গুনাগরী, বাহারছড়া, পূর্ব ইলশা, মোশাররফ আলী হাট, ডুমুরিয়া, গণ্ডামারা, জলদি, শেখেরখীল ও ছনুয়াসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল এখনো পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। এসব এলাকার অনেক বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় পরিবারগুলো আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যার পানিতে কৃষিজমি, মাছের প্রকল্প ও বসতভিটা তলিয়ে যাওয়ায় শতকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রায় ৬০ ঘণ্টা ধরে পুরো উপজেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় সুপেয় পানি, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। তবে উপজেলা সদরের সঙ্গে সংযোগকারী প্রধান চট্টগ্রাম-বাঁশখালী সড়কে পানি না থাকায় যান চলাচল স্বাভাব

চট্টগ্রামে পানিবন্দি লক্ষাধিক মানুষ

টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অধিকাংশ মাটির ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। অসংখ্য পাকা ও আধাপাকা বাড়িতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমেছে।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাথারিয়া, খানখানাবাদ, গুনাগরী, বাহারছড়া, পূর্ব ইলশা, মোশাররফ আলী হাট, ডুমুরিয়া, গণ্ডামারা, জলদি, শেখেরখীল ও ছনুয়াসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল এখনো পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। এসব এলাকার অনেক বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় পরিবারগুলো আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।

বন্যার পানিতে কৃষিজমি, মাছের প্রকল্প ও বসতভিটা তলিয়ে যাওয়ায় শতকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রায় ৬০ ঘণ্টা ধরে পুরো উপজেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় সুপেয় পানি, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে।

তবে উপজেলা সদরের সঙ্গে সংযোগকারী প্রধান চট্টগ্রাম-বাঁশখালী সড়কে পানি না থাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। যদিও ইউনিয়ন পর্যায়ের অধিকাংশ গ্রামীণ সড়কে হাঁটুসমান পানি থাকায় স্থানীয়দের চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈলছড়ি এলাকায় প্রধান সড়ক তলিয়ে যাওয়ার যে তথ্য ছড়িয়ে পড়ে, সেটিকে গুজব বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দারা।

বন্যার মধ্যে বৈলছড়ি ইউনিয়নের চেচুরিয়া এলাকায় পানিবন্দি একটি পরিবার ও ৮ মাস বয়সী শিশুকে উদ্ধারের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা শিশুটিকে বড় একটি পাতিলে বসিয়ে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। উদ্ধারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

২১ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, গলাসমান পানির মধ্যে টানানো রশি ধরে এগিয়ে যাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য। এক হাতে রশি ও অন্য হাতে রয়েছে পাতিল। ওই পাতিলের ভেতরে রাখা ছিল ৮ মাস বয়সী শিশুটি। পাশে থাকা আরেক সদস্য শিশুটির মাথার ওপর ছাতা ধরে হাঁটছেন, যাতে বৃষ্টির পানি শিশুটির গায়ে না পড়ে।

বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে কয়েকজন পানিবন্দি থাকার খবর পেয়ে আট সদস্যের একটি উদ্ধারকারী দল বৈলছড়ি ইউনিয়নের চেচুরিয়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় যায়। সেখানে আটকে পড়া পাঁচ শিশু ও আট নারীসহ কয়েকজনকে উদ্ধার করে স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।

বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘পানিবন্দি থাকার খবর পেয়ে সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। আট মাস বয়সী শিশুটিকে নিরাপদে স্থানান্তরের জন্য বড় পাতিল ব্যবহার করা হয়। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’

স্থানীয়রা জানান, বন্যার পানিতে আমন ধানের জমি, সবজিক্ষেত ও মাছের ঘের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে প্রায় ২০০টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে।

বাঁশখালী উপজেলা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রোকসানা আক্তার বলেন, ‘আমার গ্রামেই প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি। আমিও পানিবন্দি অবস্থায় আছি। নৌকায় করে দুর্গত এলাকায় যেতে হচ্ছে। স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে কোথাও কোথাও বেড়িবাঁধ কেটে পানি নামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’

এদিকে বন্যার পাশাপাশি বাঁশখালীর ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। উপজেলায় থাকা ১২১টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র।

জানা গেছে, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বাঁশখালীতে অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। পরে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় ১৪ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ১২১টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়।

উপকূলীয় ছনুয়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, খানখানাবাদ, সাধনপুর, বাহারছড়া, সরল, কাথারিয়া ও পুঁইছড়ি এলাকায় ২৮টি আশ্রয়কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় অনেক আশ্রয়কেন্দ্র এখন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়নের মান্নানপাড়ার বাসিন্দা ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মুফিজুর রহমান আশিক কালবেলাকে বলেন, ‘১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অন্যতম ছিল বাঁশখালী। কিন্তু সেই ভয়াবহ দুর্যোগের ৩৫ বছর পরও উপকূলীয় আটটি ইউনিয়নে প্রায় তিন লাখ মানুষের বসবাসের তুলনায় পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়নি। উপকূলীয় মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার জন্য জরুরি ভিত্তিতে আরও ৩০ থেকে ৩৫টি আধুনিক সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ প্রয়োজন।’

মুফিজুর রহমান আশিক আরও বলেন, ‘টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের কারণে ছনুয়াসহ বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসাসেবা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘কিছু অসাধু মাছ ব্যবসায়ী মাছের ঘেরের খালে বাঁধ দিয়ে এবং স্লুইস গেটে জাল বসিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করেছেন। এছাড়া অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে অনেক বেড়িবাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে পুঁজি করে মানুষের জীবন ও সম্পদ ঝুঁকিতে ফেলার সুযোগ দেওয়া যাবে না। এসব অনিয়ম বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।’

তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, জেলে, দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ পুনর্বাসন সহায়তা এবং কৃষিঋণ ও ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি সাময়িক স্থগিতের দাবি জানান।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমীন জানান, ‘সরকারি ত্রাণসামগ্রী পাওয়া মাত্রই দ্রুত দুর্গত মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে মাইকিংসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে গেলেও পানি পুরোপুরি না নামা পর্যন্ত দুর্ভোগ কাটছে না। পানি নেমে যাওয়ার পরই বাঁশখালীর কৃষি, মৎস্য ও অবকাঠামোর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow