চট্টগ্রামে বর্ষা যেন মৃত্যুফাঁদ

বর্ষা এলেই চট্টগ্রামে আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে পাহাড়ধস, খোলা খাল ও নালা। জুলাই মাসের কয়েক দিনের টানা বর্ষণেই নগরের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা এবং নিচু অঞ্চল পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। প্রতিবছরই পাহাড়ধস ও খাল-নালায় পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের পুনর্বাসন, পাহাড় কাটা বন্ধ এবং খোলা নালাগুলো নিরাপদ করার বিষয়ে বছরের পর বছর আলোচনা হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সীমিত। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে শুধু চট্টগ্রাম নগরীতেই পাহাড়ধস ও খাল-নালায় পড়ে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে পাহাড়ধসে প্রাণ হারান প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন। অন্যদিকে খোলা খাল ও নালায় পড়ে মারা যান আরও অনেকে, যাদের উল্লেখযোগ্য অংশই শিশু। অথচ এত প্রাণহানির পরও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস বন্ধ কিংবা খোলা নালাগুলো নিরাপদ করার কার্যকর উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ১৭ বছরে পাহাড়ধসে ২৪৮ জনের মৃত্যু জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের এলাকায় পাহাড়ধসে মোট ২৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয

চট্টগ্রামে বর্ষা যেন মৃত্যুফাঁদ

বর্ষা এলেই চট্টগ্রামে আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে পাহাড়ধস, খোলা খাল ও নালা। জুলাই মাসের কয়েক দিনের টানা বর্ষণেই নগরের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা এবং নিচু অঞ্চল পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে। প্রতিবছরই পাহাড়ধস ও খাল-নালায় পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের পুনর্বাসন, পাহাড় কাটা বন্ধ এবং খোলা নালাগুলো নিরাপদ করার বিষয়ে বছরের পর বছর আলোচনা হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সীমিত।

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে শুধু চট্টগ্রাম নগরীতেই পাহাড়ধস ও খাল-নালায় পড়ে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে পাহাড়ধসে প্রাণ হারান প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন। অন্যদিকে খোলা খাল ও নালায় পড়ে মারা যান আরও অনেকে, যাদের উল্লেখযোগ্য অংশই শিশু। অথচ এত প্রাণহানির পরও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস বন্ধ কিংবা খোলা নালাগুলো নিরাপদ করার কার্যকর উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

১৭ বছরে পাহাড়ধসে ২৪৮ জনের মৃত্যু

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের এলাকায় পাহাড়ধসে মোট ২৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০০৭ সালের ১১ জুন। ওই দিন টানা ভারী বৃষ্টির পর একাধিক স্থানে পাহাড়ধসে ১২৭ জনের প্রাণহানি হয়। এছাড়া প্রায় প্রতিবছর বিচ্ছিন্নভাবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। 

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে ১২ জন, ২০১১ সালে ১৭ জন, ২০১২ সালে ২৪ জন, ২০১৩ সালে ২ জন, ২০১৫ সালে ৫ জন, ২০২২ সালে ৪ জন এবং ২০২৩ সালে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গত ৮ জুলাই টানা ভারী বৃষ্টির মধ্যে চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার এলাকায় পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে ১২ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। একই দিনে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড় ধসে পড়লে ১০ মাস বয়সী শিশুর মৃত্যু হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে গত কয়েক দশকে চট্টগ্রামের প্রায় ৮০ থেকে ৯০টি পাহাড় কেটে বসতি গড়ে উঠেছে। ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। বর্ষাকালে অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে ধসের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। প্রতিবছর একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের স্থায়ী পুনর্বাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরের ২৬টি পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাস করছে ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবার। এসব পাহাড়ের মধ্যে ১৬টি সরকারি সংস্থার এবং ১০টি ব্যক্তিমালিকানাধীন। বর্ষা মৌসুমে জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও পাহাড় কাটা, দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পুনর্বাসনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি।

পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় একই সমস্যা বছরের পর বছর চলতে থাকছে। পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমিকরা গ্রেপ্তার হন, আর মূল হোতারা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।

নগরবাসীর অভিযোগও একই রকম। স্থানীয় বাসিন্দা ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, বছরের পর বছর বৈঠক হলেও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের স্থায়ীভাবে সরানো হয় না। বরং অবৈধ বসতিগুলোতে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ বহাল থাকায় মানুষ সেখানেই থেকে যাচ্ছে। আকবর শাহ এলাকার এক বাসিন্দা জানান, আর্থিক সামর্থ্য কম হওয়ায় ঝুঁকি জেনেও পাহাড়ে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। কারণ তুলনামূলক কম ভাড়ায় অন্য কোথাও বাসা পাওয়া সম্ভব হয় না।

অন্যদিকে বর্ষায় আরেকটি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে খোলা খাল ও নালা। চট্টগ্রাম মহানগরে প্রধান খাল ও ছোট-বড় নালা মিলিয়ে প্রায় ২৯১ কিলোমিটার জলপথ রয়েছে। এছাড়া রাস্তা ও আবাসিক এলাকার পাশে রয়েছে আরও প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার নালা। এসব নালার বড় অংশেই নেই নিরাপত্তাবেষ্টনী, রেলিং বা কংক্রিটের ঢাকনা। ফলে সামান্য অসাবধানতাই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

নগরের চান্দগাঁও, মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, শেখ মুজিব রোড, আগ্রাবাদ, খুলশী, বহদ্দারহাট ও বাকলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো অসংখ্য খোলা নালা রয়েছে। বৃষ্টির সময় এসব নালা উপচে রাস্তার সঙ্গে মিশে যাওয়ায় পথচারীদের জন্য তা চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

সরেজমিনে চান্দগাঁও থানার সামনে দেখা গেছে, রাস্তার দুই পাশে ভাঙাচোরা উন্মুক্ত নালা। বৃষ্টির কারণে সেখানে শ্যাওলা জমে আরও পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে। সামান্য অসাবধান হলেই যে কেউ নালায় পড়ে যেতে পারেন। অথচ সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা বলতে কিছুই নেই।

স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদুল করিম বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও বড় দখলদার বা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে পাহাড় কাটা যেমন বন্ধ হচ্ছে না, তেমনি ঝুঁকিও কমছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকাল এলেই অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের বাসিন্দাদের স্থায়ী পুনর্বাসন, পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, খোলা নালায় নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণ এবং সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে প্রতিবছরের মতো এবারও বর্ষা চট্টগ্রামের মানুষের জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়েই থাকবে।

চট্টগ্রামে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ৩১তম সভায় সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, ৩০তম সভার পরবর্তী সময় হতে জেলা প্রশাসন চট্টগ্রাম মহানগর এবং চট্টগ্রামের উপজেলায় পাহাড়সমূহে ২৬টি অভিযান পরিচালনা করে ১৬টি মামলা এবং ১৩টি অবৈধ বসবাসকারী পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসন অভিযানের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, খালপাড়ে পর্যায়ক্রমে নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি খাল ও নালায় পড়ে প্রাণহানি রোধে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow