চরে অসুস্থতা মানেই অনিশ্চয়তা, চিকিৎসা মানেই যুদ্ধ

চিকিৎসা না পেয়ে গর্ভেই ঝরে জীবন হাসপাতাল-চিকিৎসকের অভাবে অসহায় চরবাসী নদী পাড়ি দিতে গিয়েই শেষ হয়ে যায় রোগীর জীবন ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও সেবা নেই ঝাড়ফুঁক আর অপ্রশিক্ষিত চিকিৎসকেই ভরসা স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরে এসেও চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে মানুষ, সময়মতো চিকিৎসা ও চিকিৎসক না মেলায় গর্ভেই মারা যাচ্ছে অনাগত সন্তান। ওষুধের অভাবে সামান্য জ্বর ও ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে দিনের পর দিন ভুগছে মানুষ। এমন চিত্র পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ও চরতারাপুর ইউনিয়নের পদ্মার মধ্যচরের গ্রামগুলোতে। দুর্গম চরে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় সরকারি সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত গ্রামগুলোর প্রায় ৫ হাজার বাসিন্দা। এমনকি স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত তারা। শুষ্ক মৌসুমে বালু আর বর্ষায় পানি-কাদা মাড়িয়ে দূরের চিকিৎসা সেবা নিতে চাওয়া তাদের কাছে যেন এক মহাযুদ্ধ। অসুস্থতা বা রোগ বালাইয়ে এক অনিশ্চিত জীবন তাদের। দীর্ঘ কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও কেউই তাদের দিকে মুখ তুলে তাকায়নি। গড়ে ওঠেনি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। এতে উপেক্ষিতই রয়ে গেছে স্বাস্থ্যসেবা। ‘আমার দুইড্যি নাতনি হওয়ার সময় কি যে বিপদ বাঁ

চরে অসুস্থতা মানেই অনিশ্চয়তা, চিকিৎসা মানেই যুদ্ধ
  • চিকিৎসা না পেয়ে গর্ভেই ঝরে জীবন
  • হাসপাতাল-চিকিৎসকের অভাবে অসহায় চরবাসী
  • নদী পাড়ি দিতে গিয়েই শেষ হয়ে যায় রোগীর জীবন
  • ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও সেবা নেই
  • ঝাড়ফুঁক আর অপ্রশিক্ষিত চিকিৎসকেই ভরসা

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরে এসেও চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছে মানুষ, সময়মতো চিকিৎসা ও চিকিৎসক না মেলায় গর্ভেই মারা যাচ্ছে অনাগত সন্তান। ওষুধের অভাবে সামান্য জ্বর ও ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে দিনের পর দিন ভুগছে মানুষ।

এমন চিত্র পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ও চরতারাপুর ইউনিয়নের পদ্মার মধ্যচরের গ্রামগুলোতে। দুর্গম চরে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় সরকারি সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত গ্রামগুলোর প্রায় ৫ হাজার বাসিন্দা। এমনকি স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত তারা।

শুষ্ক মৌসুমে বালু আর বর্ষায় পানি-কাদা মাড়িয়ে দূরের চিকিৎসা সেবা নিতে চাওয়া তাদের কাছে যেন এক মহাযুদ্ধ। অসুস্থতা বা রোগ বালাইয়ে এক অনিশ্চিত জীবন তাদের। দীর্ঘ কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও কেউই তাদের দিকে মুখ তুলে তাকায়নি। গড়ে ওঠেনি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। এতে উপেক্ষিতই রয়ে গেছে স্বাস্থ্যসেবা।

‘আমার দুইড্যি নাতনি হওয়ার সময় কি যে বিপদ বাঁধছিলি ব্যাটা। রাত্তিরি ব্যথা উঠলি। এদিকে ওই অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার মত উপায় নেই। নিরুপায় হয়ে সবটা আল্লাহর ওপর ছাইড়্যি দিছিলাম। হেনে যারা বাস করে তারা আল্লাহর ওপরেই ছাইড়্যি দেয়।’

পাবনার আলোচিত ইউনিয়ন ভাঁড়ারা। এই ইউনিয়নের অন্তর্গত দড়িভাউডাঙ্গা ও পীরপুর ঘেঁষা পদ্মা নদীর মাঝে জেগে থাকা চরে বড় বা মূল গ্রাম রয়েছে ৫টির মতো। চর মধুপুর, জোতকাকুরিয়া ও খাস চর বলরামপুরসহ কয়েকটি গ্রামে কয়েক দশক ধরে মোট আড়াই হাজারের মতো মানুষের বসবাস। একই পরিমাণ লোক বাস করে পার্শ্ববর্তী চরতারাপুর ইউনিয়নের আড়িয়া গোহাইলবাড়ি ও ভাদুরীডাঙ্গীসহ কয়েকটি গ্রামে।

চরে অসুস্থতা মানেই অনিশ্চয়তা, চিকিৎসা মানেই যুদ্ধ

এখানকার জমিতে নিরেট সোনা ফলে। এজন্য অর্থকড়ি বা আহারের চিন্তা নেই তাদের। তাদের একটিমাত্র চিন্তা হলো- সুস্থ থাকা। কারণ কোনোভাবে অসুস্থ হলে এসব গ্রামে চিকিৎসা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চিকিৎসা নিতে গেলে হেঁটে বালু ঠেলে অথবা ঘোড়ার গাড়িতে করে কয়েক কিলোমিটার দূরে নদীর পাড়ে যেতে হবে। এরপর নদী পার হয়ে কিছুদূর গেলে মিলবে ভ্যান বা অটোবাইক। জরুরি রোগী সাধারণত এতটা সময় পায় না। আর প্রসূতি রোগীর জন্য এ রাস্তা পাড়ি দেওয়া অবাস্তব কল্পনা। সময়মতো হাসপাতালে না নিতে পারা ও অতি ঝাকুনির কারণে এসব গ্রামের অসংখ্য প্রসূতির বাচ্চা গর্ভেই মারা যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে অনেক।

এমনই একজন জোতকাকুরিয়া গ্রামের সুজন বিশ্বাস। ভেজা কণ্ঠে অনাগত সন্তান হারানোর বর্ণনায় তিনি জানান, গত বছর তার স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠলে দিশাহারা হয়ে পড়েন তারা। পরে সবরকম চেষ্টা করেও সময়মতো হাসপাতালে নিতে ব্যর্থ হন। ফলে বাচ্চাটি মারা যায়। তবে এবার আর তিনি সেই বোকামি করেননি। এই মাসের শেষের দিকে তার স্ত্রীর প্রসবের ডেট রয়েছে। গতবার সন্তান হারিয়ে তার শিক্ষা হয়েছে। একারণে এবার আগেই স্ত্রীকে নদীর ওপার শ্বশুরবাড়িতে রেখে এসেছেন।

‘গত বছর তার স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠলে দিশাহারা হয়ে পড়েন তারা। পরে সবরকম চেষ্টা করেও সময়মতো হাসপাতালে নিতে ব্যর্থ হন। ফলে বাচ্চাটি মারা যায়।’

একই ধরনের বর্ণনা দিতে গিয়ে ওই এলাকার সোবহান বিশ্বাস বলেন, ‘আমার দুইড্যি নাতনি হওয়ার সময় কি যে বিপদ বাঁধছিলি ব্যাটা। রাত্তিরি ব্যথা উঠলি। এদিকে ওই অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার মত উপায় নেই। নিরুপায় হয়ে সবটা আল্লাহর ওপর ছাইড়্যি দিছিলাম। হেনে যারা বাস করে তারা আল্লাহর ওপরেই ছাইড়্যি দেয়।’

আরেক ঘটনা বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘আমার এক ভাইয়ের বউয়ের ডেলিভারির ব্যথা উঠলি। তহন কী হরবো? উপায় না পায়া ঘরের কপাট খুলল্যাম। এরপর দুই মুইরি রশি ও বাঁশ বাইদ্যি কাঁধে নিলাম। আর রোগীক দরজার তক্তায় শোয়া দিল্যাম। ঘণ্টা দুয়েক কত কষ্টে যে নদীর পার হরল্যাম। পরে আল্লাহ সুস্থ গ্যাদাই দিছিলি।’

চরে অসুস্থতা মানেই অনিশ্চয়তা, চিকিৎসা মানেই যুদ্ধ

চর মধুপুরের বৃদ্ধ আফতাব বলেন, সঠিক সময়ে হাসপাতালে না নিতে পারার জন্য আমার দেখা ডেলিভারি হতে গিয়ে অন্তত ৮-১০টি বাচ্চা মারা গেছে।

ভাঁড়ারা ইউপি চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ খান বলেন, চরের এই মানুষদের আলাদা মানচিত্রের করে রাখা হয়েছে। তাদের দেশের মানুষ ভাবা হয় কি না সেটি একটি প্রশ্ন। আমরা ইউনিয়ন পর্যায় থেকে তাদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া তুলে ধরলেও সেগুলোতে কেউই কান দেন না। বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ ছাড়া কোনো উপায় দেখি না।

‘দুর্গম চর বা বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে সপ্তাহে অন্তত দুদিন ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এক্ষত্রে সরকারের সহযোগিতা পেলে আমরা এটি বাস্তবায়ন করতে পারবো।’

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, এখানকার প্রধান বাহন ঘোড়ার গাড়ি। প্রায় অধিকাংশ বাড়িতেই ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। তবে বেশি অসুস্থ রোগীকে ঘোড়ার গাড়িতে নেওয়া সম্ভব হয় না। ধুলোমাখা এলাকায় হাঁটার সময় হঠাৎই চোখে পড়ে অবাক করা সেই পুরোনো যুগের দৃশ্য। জোতকাকুরিয়া এলাকার বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী আক্কাজ বিশ্বাস। হার্টের রোগসহ নানা অসুস্থতায় নুইয়ে পড়েছে তার শরীর। চরের বালু ঠেলে হাসপাতালে যাওয়ার সক্ষমতা নেই। তাই ঘরের দরজা খুলে তক্তার দুইপাশে রশি ও বাঁশ বেঁধে চারজন কাঁধে নিয়েছেন এবং ওই তক্তায় তাকে বসিয়ে পাবনা শহরে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন স্বজনরা।

এদিকে একই ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন পাবনার সুজানগর, বেড়া উপজেলার চরনাগদহ, চরপেঁচাকোলা চরসাফুল্লা, পূর্বশ্রীকণ্ঠদিয়া, আগবাগসোয়ারচর চরকল্যানপুর, পেংগুয়ারচর, বক্তারপুর ও ঢালারচর সহ চরের ২৫টি গ্রামের প্রায় এক লাখ বাসিন্দা। এদের জন্য নেই কোনো আলাদা হাসপাতাল। লাখো মানুষের জন্য পাঁচটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে দুইটি। ২০১৩ সালে এ অঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসা সেবায় সরকার একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স বা ওয়ান বেড ক্লিনিক বোট সরবরাহ করলেও বাস্তবে এটি চালু না হওয়ায় চরাঞ্চলের অসুস্থ মানুষের কোনো কাজেই আসেনি। ফলে অনেক সময় বিনা চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।

অসুস্থ হলে নদী পেরোনোর আগেই যায় জীবন। অসুখ-বিসুখে সাধারণ মানুষ ঝাড়ফুঁক কিংবা অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন চরাঞ্চলের মানুষেরা। তাদের এই স্বাস্থ্যঝুঁকির পেছনে সরকারের অবহেলাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে অবেহলার অবসান ঘটিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের দাবি ভুক্তভোগীদের।

এ ব্যাপারে পাবনা সিভিল সার্জন মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, দুর্গম চর বা বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে সপ্তাহে অন্তত দুদিন ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ক্ষত্রে সরকারের সহযোগিতা পেলে আমরা এটি বাস্তবায়ন করতে পারবো।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জান চৌধুরী বলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজের পরিধি বাড়ছে। মোট জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয়ের কথা ভাবছে সরকার। এর আওতায় বিচ্ছিন্ন এলাকার বা চিকিৎসা সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের উদ্যোগও নেওয়া হবে।

এফএ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow