‘চা বেইচ্যা খাইতাছি, চা-ই বেচন লাগবো, ভোটের আলাপে লাভ নেই’

‘ভোট আইবো, ভোট যাইবো; কিছুই তো বদলাইবো না। চা বেইচ্যা খাইতাছি, চা-ই বেচন লাগবো। আমার লগে ভোট লইয়া আলাপ-সালাপ কইরা লাভ নাই মামা। ভোট আমাগো কিছুই দেবে না।’ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভাবনা জানতে চাইলে একনাগাড়ে কথাগুলো বলেন চা বিক্রেতা মো. রমজান আলী। রাজধানীর আগারগাঁও এলাকার ফুটপাতে ঘুরে ঘুরে চা-সিগারেট-পান বিক্রি করেন তিনি। থাকেন মিরপুর-১৩ নম্বরের শ্যামলপল্লী বস্তিতে। এক ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ষাটোর্ধ্ব রমজানের সংসার। দিনশেষে সংসার কীভাবে চলবে, তা নিয়েই যত চিন্তা তার। ভোটের গল্প বা আলাপ তার আগ্রহে নেই। তবে এবার ভোট দিতে চান তিনি। তার স্ত্রী রশিদা খাতুন ও বড় মেয়ে রাবেয়াও ভোটার। তিন ভোটারের এ পরিবার কাকে বা কোন প্রতীকে ভোট দেবেন, তা এখনো ঠিক করেননি। আরও পড়ুনগ্যাস সংকট, যানজট-জলাবদ্ধতা ও চুরি-ছিনতাই চান না ভোটাররাআজকের মধ্যে না পৌঁছালে বাতিল হতে পারে প্রবাসীদের ভোট: ইসি রমজানের ভাষ্য, ‘ফখরুদ্দীনের আমলে ভোট হইছিল, সেইবার ভোট দিছিলাম। মানিকগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে ছিলাম তখন। এখন ঢাকার ভোটার। আসন কোনডা তা জানি না। তবে এখানেই (ঢাকা-১৫) ভোট দিমু। কারে দিমু, তা ভোটের আগে ভেবে-চিন্তে দেখমু

‘চা বেইচ্যা খাইতাছি, চা-ই বেচন লাগবো, ভোটের আলাপে লাভ নেই’

‘ভোট আইবো, ভোট যাইবো; কিছুই তো বদলাইবো না। চা বেইচ্যা খাইতাছি, চা-ই বেচন লাগবো। আমার লগে ভোট লইয়া আলাপ-সালাপ কইরা লাভ নাই মামা। ভোট আমাগো কিছুই দেবে না।’

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভাবনা জানতে চাইলে একনাগাড়ে কথাগুলো বলেন চা বিক্রেতা মো. রমজান আলী। রাজধানীর আগারগাঁও এলাকার ফুটপাতে ঘুরে ঘুরে চা-সিগারেট-পান বিক্রি করেন তিনি। থাকেন মিরপুর-১৩ নম্বরের শ্যামলপল্লী বস্তিতে। এক ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ষাটোর্ধ্ব রমজানের সংসার।

দিনশেষে সংসার কীভাবে চলবে, তা নিয়েই যত চিন্তা তার। ভোটের গল্প বা আলাপ তার আগ্রহে নেই। তবে এবার ভোট দিতে চান তিনি। তার স্ত্রী রশিদা খাতুন ও বড় মেয়ে রাবেয়াও ভোটার। তিন ভোটারের এ পরিবার কাকে বা কোন প্রতীকে ভোট দেবেন, তা এখনো ঠিক করেননি।

আরও পড়ুন
গ্যাস সংকট, যানজট-জলাবদ্ধতা ও চুরি-ছিনতাই চান না ভোটাররা
আজকের মধ্যে না পৌঁছালে বাতিল হতে পারে প্রবাসীদের ভোট: ইসি

রমজানের ভাষ্য, ‘ফখরুদ্দীনের আমলে ভোট হইছিল, সেইবার ভোট দিছিলাম। মানিকগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে ছিলাম তখন। এখন ঢাকার ভোটার। আসন কোনডা তা জানি না। তবে এখানেই (ঢাকা-১৫) ভোট দিমু। কারে দিমু, তা ভোটের আগে ভেবে-চিন্তে দেখমু।’

এক সপ্তাহ পরই বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। চারদিকে ভোটের আলাপ। ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে ঢাকার অলিগলি। টিভি চালু করলেই নির্বাচনি খবর। খবরের পাতায়ও একই চিত্র। মিছিল-সমাবেশ ও প্রচার-প্রচারণায় মুখরিত রাজনৈতিক অঙ্গন। তারপরও রমজান আলীর মতো অনেক শ্রমজীবী মানুষেরই ভোটের চেয়ে রুটি-রুজি নিয়েই বেশি চিন্তা।

ভোটের আলাপে শ্রমজীবীদের মনে চাপা ভয়-ক্ষোভ
তবে ভোট নিয়ে যে শ্রমজীবী মানুষ ভাবছে না, তাও নয়। অনেকে চলতে-ফিরতে ভোট নিয়ে জম্পেশ আলাপে মেতেছে। সেই জম্পেশ আলাপেও রয়েছে চাপা ভয় ও ক্ষোভ।

রমজান আলীর সঙ্গে কথা বলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ভবনের পাশ ধরে কিছুটা এগোতেই সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। এর পাশেই ডাব বিক্রি করছেন আলতাফ হোসেন ও তার স্ত্রী। দিনভর স্বামী-স্ত্রী ভ্যানে করে এ এলাকায় ডাব বিক্রি করেন।

ডাবভর্তি ভ্যানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শোনা গেলো ভোটের আলাপ। স্বামী আলতাফের ভাষ্য, ‘এইবার ধানের শীষ আইবো। তয় জামায়াতেরও খুব আলোচনা।’ স্ত্রী আকলিমা কিছুটা কঠোর গলায় বলে ওঠেন, ‘যেই জেতে জিতুক, তোমার এত কথা কইতে হইবো না।’ নির্বাচন নিয়ে স্বামীর কথায় কিছুটা বিরক্ত আকলিমা।

জানতে চাইলে আকলিমা জাগো নিউজকে বলেন, ‘১১ বছর হইলো ঢাকায় আসছি। দুইটা ছেলেরে বহু কষ্টে মানুষ করছি। কোনো নেতা তো কিছুই দেয়নি। কারও কাছে হাতও পাতিনি। কে গদিতে বসলো, তা নিয়ে গরিব মানুষের ভাবার সময় নেই। দেখা গেলো একজনের পক্ষে কথা কইলাম, আরেকজনে এসে পিডাইলো। এ কারণে রনির বাপরে (স্বামী আলতাফ হোসেন) আমি কথা কইতো নিষেধ করি।’

ভোট দেবেন কি না, জানতে চাইলে আলতাফ হোসেন বলেন, ‘এবার ভোট দিমু। দুর্নীতি-চাঁদাবাজি যারা না করে, তাদেরই ভোট দিমু। এ রাস্তা সরকারি রাস্তায়। এইহানে দাঁড়িয়ে বেচাবিক্রি করি। তাও দিনে ১০০ টাকা দেওন লাগে। এটা যারা বন্ধ করতে পারবে, তাদের ভোট দিমু গা।’

‘যারেই ভোট দিই, হেই দেশডা খাইয়া ফালাই’
বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা নওশের আলী। ঢাকা-১১ আসনের ভোটার তিনি। নিজে ও স্ত্রী ভোটার হয়েছেন। একমাত্র ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। নওশের ভাড়ার রিকশা চালান। বাড্ডার ইবনে সিনা গলির মুখে রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নওশেরকে ভোটের আমেজ কেমন জানতে চাইলে বলেন, ‘আগের মতো আমেজ নেই। ছোটবেলায় গ্রামে যেমন আমেজ দেখতাম, শহরে তেমনডা না। মাঝে তো হাসিনার আমলে নিজেরা নিজেরা ভোট করছে। কিন্তু এখন তো দুইটা পার্টি। তাও তেমন আমেজ দেখছি না।’

ভোট কেমন প্রার্থীকে দেবেন এমন প্রশ্নে নওশেরের চোখেমুখে বিরক্তি ও হতাশার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বেশ ক্ষুব্ধ হয়েই তিনি বলেন, ‘ভোট দিমু কারে, যারেই দিই হেই ভেঙেচুরে দেশডা খাইয়া ফালাই। হাসিনারে ২০০৮ সালে ভোট দিছিলাম। এরপর হেই কি কি করলো দেখলাম। ছাত্রদের আন্দোলনেও ছিলাম। রিকশা চালানো বাদ দিয়ে মিছিল করেছি…এ বাড্ডার রোডেই। তারা সরকারে গিয়েও তো কম কামাইলো না। ক্ষমতা পাইলে সবাই লোভী হইয়া যায়। এবার ভোট দিমু, কারে দিমু তা তো বলা যাইবো না। তবে ভালো লোকরেই দিমু।’

‘ভোটটা সুষ্ঠু হওয়া খুব দরকার’
সচিবালয় ধরে শিক্ষা ভবন অভিমুখে আব্দুর গণি রোডের ডান পাশে ফুটপাতে চায়ের টং দোকান রফিকুল ইসলামের। ভোটের কারণে সচিবালয় ও শিক্ষাভবন এলাকায় লোক সমাগম কিছুদিন ধরে কম বলে জানালেন তিনি।

রফিকুল বলেন, ‘ভোটের কারণে অনেকে নিজ নিজ এলাকায় চলে গেছে। চাকরিজীবী ছাড়া তেমন মানুষের আনাগোনা নেই। আগে রাজনৈতিক নেতা, ঠিকাদারসহ অনেকে বিভিন্ন জেলা থেকে আসতো। দোকানে বেচা-বিক্রিও বেশি হতো। ভোটে গ্রামের দোকানে বেচাকেনা ভালো। আমাগো অবস্থা ভালো না।’

ভোট নিয়ে ভাবনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হাসিনার আমলে তো ভোট দেওয়া লাগতো না। এবার মনে হচ্ছে ভোট দেওয়া যাবে। আমি ঢাকা-৫ আসনের ভোটার। মনে হচ্ছে, ভালোই লড়াই হবে। দিনে দোকান চালাচ্ছি, রাতে ভোটের কাজ করছি। ভোটটা সুষ্ঠু হওয়া খুব দরকার।’

‘ভোট দিমু, তয় কারও কাছে কিছু চামু না’
ভোট দিয়ে কিছু চাওয়ার পক্ষে নন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রোজিনা। গুলশান-বাড্ডা লিংক রোডে বিকেলের দিকে ফুটপাতে চট বিছিয়ে কাপড়ের দোকান দেন তিনি। নির্বাচন নিয়ে প্রত্যাশা কী—প্রশ্নে রোজিনা বলেন, ‘ভোট তো দিমুই। তয় কারও কাছে কিছু চামু না। কারও কাছে হাত পেতে লাভ নেই। যারাই ক্ষমতায় আসুক, শুধু জিনিসপত্রের দামটা যদি কমাতো; তাইলেই খুশি। যা আয় করি, তা দিয়ে যাতে সংসারটা চলে যায়।’

‘দ্যাশের রাজনীতি বদলাইবো না, ভোট দিয়ে কী হইবো’
দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে ক্ষুব্ধ সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আশরাফ। তিনি বলেন, ‘আমাগো দ্যাশের রাজনীতি ভালা না। দ্যাশের এ রাজনীতি আর বদলাইবো না। একজন তো ছাত্রগো ঠেলায় ইন্ডিয়া চইল্যা গেছে, তা থেকে কেউ শিক্ষা কিন্তু নেয়নি। ইউনূস চালাইলো…কোনো কিছুই তো করতে পারলো না। এখন আবার আইছে ভোট, ভোট দিয়ে কী হইবো? দ্যাশের রাজনীতি আর বদলাইবো না।’

এএএইচ/এমএএইচ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow