বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চাঁদপুর জেলার নাম উচ্চারিত হয় এক বিশেষ গর্ব ও মর্যাদায়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই জেলা দলটির অন্যতম প্রধান ঘাঁটি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শ ও তার স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে চাঁদপুরের মানুষ যুগের পর যুগ ধরে নিরলসভাবে কাজ করে আসছেন। বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদপুরের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি কেবল ভোটের রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি আদর্শভিত্তিক গণআন্দোলনের প্রতীক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলামের মতে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোর মধ্যে চাঁদপুর সবচেয়ে সংগঠিত জাতীয়তাবাদী ভিত্তি ধারণ করে, যা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্য এক অপরিহার্য রাজনৈতিক সম্পদ।
বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে চাঁদপুর জেলা দেশের উন্নয়নধারায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার দুই মেয়াদে (১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬) চাঁদপুর জেলায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং নদীবন্দর সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময়ে চাঁদপুর জেলার মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষি ও মৎস্য খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল জাতীয় গড়ের তুলনায় ১৫% বেশি। মেঘনা ও পদ্মার অববাহিকায় অবস্থিত এই জেলার মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির সাথে বিএনপির উন্নয়ন দর্শনের একটি গভীর সংযোগ রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. আহমেদ মুশতাক রাজা চৌধুরী।
তবে চাঁদপুরের জাতীয়তাবাদী পরিবারের ইতিহাস কেবল উন্নয়নের গল্প নয়, এটি রক্ত ও আত্মত্যাগের এক মর্মস্পর্শী আখ্যান। ২০০৮ সালে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের আমলে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সাজানো মিথ্যা মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে চাঁদপুরে যে প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণের এক অনন্য নিদর্শন। পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে শহীদ হন চাঁদপুর জাতীয়তাবাদী পরিবারের দুই বীর সন্তান; যাদের রক্ত এই মাটিকে করেছে আরও পবিত্র, আরও অঙ্গীকারবদ্ধ। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে চাঁদপুর জেলায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের কমপক্ষে ৪৩০ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৭৮ জন দীর্ঘমেয়াদী কারাভোগ করেছেন। সারা দেশে এ সংখ্যা বহুগুণ।
তৎকালীন হাসিনা সরকারের নির্যাতন কতটা বর্বর ও বীভৎস ছিল, তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক আবদুস সাত্তার পাটোয়ারীর উপর সংঘটিত নির্যাতনের ঘটনায়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি হয়ে তাকে এমন অমানবিক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল যে তার হাত ভেঙে দেওয়া হয় নির্মমভাবে; এবং সেই ভগ্ন, ক্ষতবিক্ষত দেহেও ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে অন্তত তিনবার হাসপাতালে আনা নেওয়া করা হয়েছিল, এমন নির্মম বর্বরতার শিকার হন দেশ ব্যাপী এ দলের অসংখ্য নেতাকর্মী, মানবাধিকারের এই নৃশংস লঙ্ঘন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল। জেনেভাভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা CIVICUS’র ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বন্দীদের উপর এ ধরনের অমানবিক আচরণকে ‘গভীর উদ্বেগজনক’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ এই পাশবিক নির্যাতনও আবদুস সাত্তার পাটোয়ারীদের মতো লাখো নেতা কর্মীদের সংকল্প ও মনোবলকে ভাঙতে পারেনি; বরং রাজধানীর রাজপথে জাতীয়তাবাদের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা অব্যাহত রেখেছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে তারা অবদান রেখে গেছেন।
নির্বাচনী পরিসংখ্যানও চাঁদপুরের জাতীয়তাবাদী শক্তির কথা সুস্পষ্টভাবে বলে। ১৯৯১, ২০০১ এবং ২০০৮ ও ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৃহত্তর চাঁদপুর জেলার প্রতিটি আসনে বিএনপি ও তার জোটভুক্ত প্রার্থীরা ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, ২০০১ সালের নির্বাচনে চাঁদপুর জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি চারটিতে জয়ী হয়েছিল, যা ছিল সারা দেশে বিএনপির সাফল্যের অন্যতম উজ্জ্বল নজির।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের জেলাগুলো যেখানে কৃষি ও নদী-নির্ভর অর্থনীতি প্রভাবশালী, সেখানে রাজনৈতিক আনুগত্য গভীরভাবে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের সাথে সংযুক্ত থাকে; চাঁদপুর তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
এই সুদীর্ঘ আত্মত্যাগ ও অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে আজ শনিবার (১৬ মে) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চাঁদপুর সফর শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি একটি আবেগের পুনর্মিলন, একটি ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন। দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে আসা পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর চাঁদপুরের লাখো মানুষের হৃদয়ে নতুন আশার সঞ্চার করবে। এবং চাঁদপুরের মতো ঐতিহাসিকভাবে জাতীয়তাবাদী ঘাঁটি থেকে এই যাত্রার সূচনা হওয়াটা প্রতীকীভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তারেক রহমান এই সফরে চাঁদপুর জেলার বহুমুখী সমস্যাগুলোও সরাসরি প্রত্যক্ষ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। মেঘনার ভাঙন সমস্যা এ জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অন্যতম কারণ। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, গত এক দশকে চাঁদপুর সদর ও হাইমচর উপজেলায় মোট ২৩০০ হেক্টরেরও বেশি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এছাড়া মৎস্যজীবীদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত না হওয়া, সেচ অবকাঠামোর অবনতি এবং স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা; এসব সমস্যা বছরের পর বছর ধরে অমীমাংসিত।
চাঁদপুর জেলার জনগণ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা আজ যে প্রত্যাশা নিয়ে তারেক রহমানকে বরণ করতে প্রস্তুত তা কেবল একটি দলীয় অনুষ্ঠানের উত্তেজনা নয়। এটি হলো দীর্ঘ সংগ্রামের পর বিজয়ের আনন্দ, দীর্ঘ অপেক্ষার পর পুনর্মিলনের আবেগ। ইতিহাস সাক্ষী, চাঁদপুরের মানুষ কোনোদিন তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুত হননি। রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে, কারাযন্ত্রণা সহ্য করে এই জেলার মানুষ বারবার প্রমাণ করেছেন যে তারা জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রকৃত ধারক ও বাহক।
একটি নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের আলোকে বলা যায়, চাঁদপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের যে গভীর বন্ধন গড়ে উঠেছে তা কেবল নির্বাচনী স্বার্থের সম্পর্ক নয়; এটি আদর্শ, ত্যাগ ও বিশ্বাসের এক অটুট সেতু। সেই ঐতিহাসিক বন্ধনের শক্তিতেই চাঁদপুরের মানুষ আগামী দিনেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে সার্বক্ষণিক মায়া, ভালোবাসা ও নিরাপত্তায় আগলে রাখবেন বলে প্রত্যাশা করা যায়; এই জেলা হয়ে উঠবে দলটির জন্য এক অভয় আশ্রম, এক চিরন্তন শক্তির আধার।
আর ১৬ মে তারিখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চাঁদপুর সফর। চাঁদপুরের মানুষ বিশ্বাস করে, গণতন্ত্র কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের নাম নয়; এটি নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা চাঁদপুরের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি সেই বিশ্বাসকেই ধারণ করে এসেছে। এই জেলার মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে, তারা রাজনৈতিক প্রতিকূলতাকে ভয় পায় না; বরং আদর্শ ও বিশ্বাসের প্রশ্নে সংগ্রামকে বেছে নিতে প্রস্তুত থাকে।
আজ যখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, তখন চাঁদপুর আবারও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে প্রস্তুত। এই জেলার নেতাকর্মীরা মনে করেন, বিএনপির সঙ্গে চাঁদপুরের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি আস্থা, মায়া, দায়বদ্ধতা ও ঐতিহ্যের সম্পর্ক। আগামী দিনের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্নে চাঁদপুরের মানুষ আবারও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে এমন প্রত্যাশাই এখন সর্বত্র উচ্চারিত হচ্ছে। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ইতিহাসে চাঁদপুরের অবদান নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, আর সেই ইতিহাস ভবিষ্যতেও দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী; গবেষক ও পর্যবেক্ষক
গণতন্ত্র (সীমান্ত হীন); প্যারিস, ফ্রান্স