চুল পড়া ঠেকাতে পেঁয়াজ, মেথি বা কালো জিরার তেল কি সত্যি কার্যকরী?

চুল মানুষের সৌন্দর্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারও পছন্দ দীঘল কালো চুল, তো কারও পছন্দ ঘন বব কাট। কিন্তু নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবারই সাধারণ দুশ্চিন্তার জায়গা হলো চুল পড়া। সম্প্রতি বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আমাদের দেশের মানুষের এই চিরচেনা উদ্বেগের চিত্র এবং তার সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠা চটকদার প্রচারণার আদ্যোপান্ত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক খুললেই এখন দেখা যায় নানা ধরনের বিজ্ঞাপন, যেখানে মেথি, কালো জিরা, পেঁয়াজের রস বা কারিপাতার মতো প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি ‘অর্গানিক’ তেল বা হেয়ার প্যাকের মাধ্যমে শতভাগ চুল পড়া বন্ধ ও নতুন চুল গজানোর গ্যারান্টি দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে সুপ্রভা নীলি নামে একজন শিক্ষার্থীর কথা বলা যায়, যিনি বংশগতভাবে পাতলা চুল নিয়ে চরম হতাশায় ভুগছিলেন এবং প্রতিকার চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। এমন হাজারো মানুষ যখন ডিপ্রেশনে ভুগে এসব ‘ম্যাজিক’ সমাধানের দিকে হাত বাড়াচ্ছেন, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—এসব উপাদানের কি আদৌ কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে? নাকি এগুলো নিছকই বাণিজ্যিক প্রচারণা? চুল রক্ষায় যুগে যুগে নানা ঘরোয়া টোটকা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জবা ফুল, পেঁয়াজের রস, মেথি, কালো

চুল পড়া ঠেকাতে পেঁয়াজ, মেথি বা কালো জিরার তেল কি সত্যি কার্যকরী?

চুল মানুষের সৌন্দর্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কারও পছন্দ দীঘল কালো চুল, তো কারও পছন্দ ঘন বব কাট। কিন্তু নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবারই সাধারণ দুশ্চিন্তার জায়গা হলো চুল পড়া। সম্প্রতি বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আমাদের দেশের মানুষের এই চিরচেনা উদ্বেগের চিত্র এবং তার সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠা চটকদার প্রচারণার আদ্যোপান্ত।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক খুললেই এখন দেখা যায় নানা ধরনের বিজ্ঞাপন, যেখানে মেথি, কালো জিরা, পেঁয়াজের রস বা কারিপাতার মতো প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি ‘অর্গানিক’ তেল বা হেয়ার প্যাকের মাধ্যমে শতভাগ চুল পড়া বন্ধ ও নতুন চুল গজানোর গ্যারান্টি দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে সুপ্রভা নীলি নামে একজন শিক্ষার্থীর কথা বলা যায়, যিনি বংশগতভাবে পাতলা চুল নিয়ে চরম হতাশায় ভুগছিলেন এবং প্রতিকার চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। এমন হাজারো মানুষ যখন ডিপ্রেশনে ভুগে এসব ‘ম্যাজিক’ সমাধানের দিকে হাত বাড়াচ্ছেন, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—এসব উপাদানের কি আদৌ কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে? নাকি এগুলো নিছকই বাণিজ্যিক প্রচারণা?

চুল রক্ষায় যুগে যুগে নানা ঘরোয়া টোটকা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জবা ফুল, পেঁয়াজের রস, মেথি, কালো জিরা, বা আমলকীর মতো উপাদানগুলোতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটোরি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান থাকে, যা মাথার ত্বকের বা স্কাল্পের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উপাদান সরাসরি ব্যবহার করলেই যে চুল পড়া বন্ধ হবে বা নতুন চুল গজাবে, তার কোনো স্ট্রং সায়েন্টিফিক এভিডেন্স বা শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

নর্দার্ন ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডার্মাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাসনীম খাঁন জানান, ল্যাবরেটরিতে পশুপাখির ওপর এসব উপাদান প্রয়োগ করে কিছুটা ফলাফল পাওয়া গেলেও মানুষের ওপর এর কার্যকরিতার তেমন কোনো শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তিনি উল্লেখ করেন, কেবলমাত্র রোজমেরি তেল ব্যবহারে কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল দেখা গেছে।

চুল পড়া কি স্বাভাবিক?

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ১০০টি চুল ঝরে যাওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। চুল পড়া সাধারণত সাময়িক হয় এবং এর পেছনে স্ট্রেস, হরমোনের পরিবর্তন, পুষ্টির অভাব বা স্কাল্পে সংক্রমণের মতো কারণ থাকতে পারে। তবে পুরুষ বা মহিলাদের প্যাটার্ন বল্ডনেস বা বংশগত টাক পড়া একটি স্থায়ী প্রক্রিয়া এবং এক্ষেত্রে এসব হারবাল টোটকা খুব একটা কাজে আসে না।

মাথায় মাখবেন নাকি খাবেন?

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রাকৃতিক উপাদানগুলো মাথায় মাখার চেয়ে গ্রহণ করা বা খাওয়া বেশি উপকারী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন এবং ডার্মাটোলজিস্ট ডা. আসিফ ইমরান সিদ্দিকীর মতে, অ্যালোভেরা, আমলকী বা পেঁয়াজে থাকা ভিটামিন এ, সি, বি-১২, জিংক ও প্রোটিন চুলের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু সেগুলো মাথায় মাখলে ত্বকের ভেতরে ঠিকমতো প্রবেশ করতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, মাথায় ডিম মাখলে তা চুলের পুষ্টি বাড়ায় না, বরং ডিম খেলে তা ভেতর থেকে কাজ করে।

সতর্কতা ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

অনলাইনে চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে যথাযথ রেসিপি বা সংরক্ষণের মেয়াদ না জেনে কোনো হেয়ার প্যাক বা তেল কেনা ঠিক নয়। ডা. আসিফ ইমরান সিদ্দিকী জানান, যাদের মাথা আগে থেকেই তৈলাক্ত, তারা অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করলে চুল আরও বেশি ঝরতে পারে এবং খুশকির সমস্যা বাড়তে পারে। অতিরিক্ত শুষ্ক বা কোঁকড়া চুলের জন্য তেল কন্ডিশনার হিসেবে কাজ করলেও সবার জন্য তা বাধ্যতামূলক নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মাথায় হেয়ার ফলিকলের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট থাকে এবং একবার ফলিকল নষ্ট হয়ে গেলে তা আর প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় না। তাই চটকদার বিজ্ঞাপনের পেছনে সময় নষ্ট না করে চুল পড়া শুরু হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, যাতে মেডিকেশনের মাধ্যমে ড্যামেজ রোধ করা সম্ভব হয়।

পরিশেষে বলা যায়, ঘরোয়া উপাদানগুলো স্কাল্পে ম্যাসাজ করার ফলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে যা কিছুটা সহায়ক হতে পারে, কিন্তু একে ‘জাদুকরী সমাধান’ ভাবা ভুল। সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণই চুল রক্ষার আসল চাবিকাঠি।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow