বইয়ের দোকানগুলোতে গেলে মন নেচে ওঠে, বিস্ময়ের ঘোর লাগে। তবে পকেটে যদি টাকা থাকে, নতুন বই কিনে তার গন্ধ শুঁকে অপার আনন্দ পাওয়া যায়। নতুন বই কিনে ঘরে আনলেই কি সঙ্গে সঙ্গে পড়া হয়, হয়তো কিছুটা হয়, বাকিটা ধীরে ধীরে পড়া হয়। আবার এমনও হতে পারে কোনও কোনও বই পড়াই হয়ে ওঠে না। বেশ কয়েক বছর আগে শাহবাগের জনান্তিক থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যনাটকগুলো একসঙ্গে কিনে ছিলাম। আজও তা পড়ে শেষ করা হয়নি।
অকাল প্রয়াত ৮০ দশকের কবি সমরেশ দেবনাথ একটা কথা বলতেন, বই তুমি সংগ্রহে রাখো। এখন হয়তো পড়লে না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই বই তোমাকে কাছে টেনে নেবে। আর যদি বই সংগ্রহে না থাকে, তাহলে পড়বে কীভাবে? সমরেশ দার এ কথা বলার পরবর্তী সময়ে বারবার তার কথার প্রমাণ পেয়েছি।
নতুন বই কিনতে টাকা লাগে- এই সত্যটাও বার বার ভীষণ সত্য হিসেবে সামনে দাঁড়িয়ে গেছে। চোখের সামনে দেখছি একটি বই, জ্বলজ্বল করছে চোখের সামনে। নেড়েচেড়ে দেখছি। গন্ধ শুঁকছি। পাতা উল্টে দেখছি। দু-এক পাতা পড়েও ফেললাম। বইটা তো ঘরে নিতে হবে। পকেটের কি অবস্থা? পকেট তো ফাঁকা। উপায়, কোনো উপায় নেই। বইটা রেখে দিতে অনুরোধ করা যেতে পারে। বলা যেতে পারে- দুই/একদিন পরে এসে ঠিক নিয়ে যাবো। অনুরোধে রাখলো কিন্তু আমি কথা ঠিক রাখলাম না। দুই/একদিন পর এসে বইটি আর নিয়ে গেলাম না। আমার ওপর আস্থা নষ্ট হয়ে গেল।
জীবন ধারণের যে ব্যয় বেড়েছে, কয়টা বই কেনা যায়। বেতনের টাকায় সংসার চালাতেই অধিকাংশ মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। সেখানে বই কেনা অনেকের কাছে স্রেফ বিলাসিতাই মনে হবে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যিনি একটু লেখালেখি করেন, তার তো নতুন বই না কিনলে চলে না। হয়তো নানা কষ্টের মধ্যে দিয়েও একটা-দুটো বই কেনার চেষ্টা করেন। যাদের মোটা বেতনের চাকরি, পকেটভর্তি টাকা- তাদের কথা আলাদা। তাদের বইপত্র কিনতে অসুবিধা হওয়া কথা নয়। ক্ষুন্নিবৃত্তি করে যারা চলেন, তাদেরই সমস্য বই কেনায়।
এ ক্ষেত্রে যদি মহল্লা মহল্লায় গ্রন্থাগার থাকতো, তাহলে অনেক সুবিধে হতো ক্ষুন্নিবৃত্তি করে চলা মানুষদের। তারা এখান থেকে বই নিয়ে অনায়াসে পড়তে পারতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো রাজধানী ঢাকায় এই সুযোগ নেই বললেই চলে। রাজধানীর শ্যাওড়াপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ বছরের অধিক সময় ধরে আছি। আমি জানিনা-এখানে কোনও গ্রন্থাগার আছে কিনা, যেখানে সাহিত্যের নানা বই পাওয়া যাবে। খোদ রাজধানীর মহল্লায় মহল্লায় গ্রন্থাগার গড়ে না ওঠাটাকে দৈন্যতা বলেই আমার মনে হয়।
২. বিদেশি বই আমদানির ক্ষেত্রে একটা সময় ট্যাক্সের হার বেশ কম ছিল। এ কারণে ৯০ দশকেও দেখা গেছে কলকাতার বই কিনতে খুব বেগ পেতে হতো না। বর্তমানে কলকাতার একটি বইয়ের গায়ের দামের প্রায় ডবল দামে কিনতে হয়। কলকাতার বইয়ের দাম প্রায় ডবল হয়ে যাওয়ায় ঢাকার কবি-লেখকদের অনেকেরই বেশ সমস্যায় পড়েছেন বলে আমরা ধারণা। কলকাতার বইয়ের ওপরে ট্যাক্স কমানো যায় কিনা তা সরকারের সংশ্লিষ্টরা বিবেচনা করতে পারেন।
৩.
একটি বইয়ের দোকান কত বিস্ময় নিয়ে উঁকিঝুঁকি দেয়, সেটা আমরা সবাই বুঝি। প্রতিটি বই অজস্র আলোর ফুলকি নিয়ে বসে থাকে। ফলে একটি বইয়ের দোকানের প্রতি আমাদের ঋণ সারা জীবনের। আমি নিজের শহরে থাকতে পাবলিক ও সরকারি দুটো গ্রন্থাগার থেকে বই আনতাম। কলেজ জীবনে ওই দুটি গ্রন্থাগার ছিল আমার আরাধ্যস্থান। পাবলিক ও সরকারি গ্রন্থাগারে প্রচুর বই থাকে। সব ধরণের বই থাকে। সরকার, সরকারি গ্রন্থাগারের জন্য নিয়মিত নানান ধরনের বই সরবরাহ করে থাকে। পাবলিক গ্রন্থাগারের বই কেনার জন্য অনুদান দিয়ে থাকে সরকার। এটা সন্দেহাতীতভাবে ভালো উদ্যোগ। এসব গ্রন্থাগারে নিজের পছন্দের বই খুঁজে পাওয়া যায়। আমার সেই কলেজ জীবনে পাঠের যে স্পৃহা ছিল তা দুটি গ্রন্থাগার থেকে বই এনে মেটাতাম। পাবলিক গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিকের দায়িত্বে ছিল আমার বন্ধু বুলবুল। বন্ধুত্বের সুবাদে সে আমাকে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বেশি বই দিতো। ওই দুটি গ্রন্থাগার আমার সেই সময়ের পাঠ স্পৃহা মেটালেও বিকল্প আর একটি পথ আমরা সামনে খুলে যায়। আমাদের শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি ছোট্ট পরিসরের বই ও পত্রপত্রিকার দোকান ছিল। প্রায়শই আমি ওই দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম।
দোকানটির মালিক মন্টু ভাই খুবই সদয় ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ঢাকা থেকে ফরমায়েশ অনুযায়ী আমাকে বই এনে দিতেন। সাহিত্য পত্রিকায় বইয়ের বিজ্ঞাপন দেখে পছন্দের বই দেগে দিলে ঢাকা থেকে তিনি নিয়ে আসতেন। এভাবে তখন টিউশনের টাকায় বেশ কিছু বই কেনা হয়। নিজের শহর ছেড়ে যখন ঢাকায় এলাম, বাড়ির পুরনো আলমারি থেকে ওই বইগুলো গুছিয়ে নিয়ে আসি। রাজধানীর মেসে মেসে যতদিন থেকেছি-বইগুলো আগলে রাখার ভীষণ চেষ্টা ছিল। কমলাপুর রেলস্টশনের কাছ থেকে লোহার একটি রেক কিনলে তাতে শোভা পেত বইগুলো। বইগুলোর মধ্যে ক-টির কথা মনে পড়ছে, শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা, আহমদ ছফার অনুবাদ গ্রন্থ গ্যোয়েটের ফাউস্ট, আল মাহমুদের আত্মজৈবনিক যেভাবে বেড়ে উঠি।
একটু বলা দরকার, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ ও আহমদ ছফাকে কি আমি চাক্ষুস দেখিছি, আনন্দের কথা তিনজনকেই সামনা সামনি দেখিছি। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় মারা গেলে- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে একটি শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাতে শামসুর রাহমান, বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদসহ প্রতিথযশা কবি-সাহিত্যক উপস্থিত ছিলেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে প্রত্যেকে স্মৃতিচারণ করেছিলেন। দর্শকসারিতে বসে চর্মচক্ষে শামসুর রাহমানকে দেখা এবং তার বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল।
আল মাহমুদকে প্রথম দেখি দৈনিক বাংলার মোড়ে। দেখলাম তিনি রিকশা থেকে নামছেন। উনার ফ্ল্যাটেও দুবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। তখন তিনি মুখে মুখে নতুন কবিতা লাইন বলে যেতেন, তা শুনে কাগজে লিখে নিতে হতো। এর একটি কপি রেখে আসতে হতো পরিবারের সদস্যদের কাছে।
শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় একটি রুমে আহমদ ছফা বসতেন। বলা যায়- এটিই ছিল তার অফিস। তরুণ কবিরা তার সঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ পেতেন। আমিও এই সুযোগ হাত ছাড়া করিনি।
৪. সম্প্রতি নিজের শহরে ৭ দিন কাটানোর সুযোগ হয়েছিল। প্রতিদিন বিকেলে বাসা থেকে বের হয়ে ঘনিষ্টজনদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকলেও তারা নিজেরা ব্যস্ত থাকায় একসঙ্গে বসে সময় কাটানো সম্ভব হয়নি। তবে ছোটবেলার বন্ধু তাপস অনেকটা সময় নির্ধারণ করে রেখেছিল আমার জন্য। ঢাকা থেকে বাড়িতে যাওয়া বন্ধু টুটুলও যথেষ্ট সময় দিয়েছে আড্ডায়। তাপস স্থানীয় একটি কলেজে ইতিহাসের শিক্ষক। টুটুল প্রকৌশলী। ঢাকায় নিজস্ব ফার্ম প্রতিষ্ঠা করে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।
একদিন রাত ৯টার দিকে মন্টু ভাইয়ের দোকানের সামনে দিয়ে আসছিলাম। আমার নিজের শহরের প্রাণকেন্দ্রের ত্রিমাথায় এই দোকানটি। নানান বইপত্র বিক্রি হয় এখানে। মন্টু ভাই মারা যাওয়ার পর তার ছেলেই দোকানটিতে বসেন। সেদিন তার সঙ্গে কথা বলে বেশ ভালো লাগলো।