ছোট বয়সে ‘বড়’ অপরাধে জড়াচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা
ছিনতাই, চুরি, খুনসহ পাড়া-মহল্লায় যে কোনো অপরাধ ঘটলেই এখন সবার আগে আসছে কিশোর গ্যাংয়ের নাম। পড়ার টেবিলে সময় দেওয়ার কথা যাদের তারাই জড়াচ্ছে ভয়ংকর সব অপরাধ কর্মকাণ্ডে। খোদ রাজধানীতেই ১১৮টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ রয়েছে বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এসব গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে শুরু করে এলাকাভিত্তিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গড়ে ওঠা কিছু কিশোর গ্যাং ঘুরেফিরে এখন আবির্ভূত হয়েছে নতুন নামে, নতুনভাবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা বদলেছে দল, কেউবা বদলেছে নেতা। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন গ্যাং। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। এ অবস্থায় কিশোরদের সঠিক পথে রাখতে পরিবার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। গত ১২ এপ্রিল রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এলেক্স গ্রুপের প্রধান ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। মূলত ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন নিয়ে এলেক্স গ্রুপের
ছিনতাই, চুরি, খুনসহ পাড়া-মহল্লায় যে কোনো অপরাধ ঘটলেই এখন সবার আগে আসছে কিশোর গ্যাংয়ের নাম। পড়ার টেবিলে সময় দেওয়ার কথা যাদের তারাই জড়াচ্ছে ভয়ংকর সব অপরাধ কর্মকাণ্ডে। খোদ রাজধানীতেই ১১৮টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ রয়েছে বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এসব গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে শুরু করে এলাকাভিত্তিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গড়ে ওঠা কিছু কিশোর গ্যাং ঘুরেফিরে এখন আবির্ভূত হয়েছে নতুন নামে, নতুনভাবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা বদলেছে দল, কেউবা বদলেছে নেতা। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন গ্যাং। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। এ অবস্থায় কিশোরদের সঠিক পথে রাখতে পরিবার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
গত ১২ এপ্রিল রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এলেক্স গ্রুপের প্রধান ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। মূলত ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন নিয়ে এলেক্স গ্রুপের সঙ্গে আরমান-শাহরুখ গ্রুপের দ্বন্দ্বে হত্যা করা হয় এলেক্স ইমনকে। একই দিন সকালে দুই দফায় তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। এ ঘটনায় আরমান-শাহরুখ গ্রুপের চার সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। নিহত এলেক্স ইমনের বিরুদ্ধে জোড়া খুনসহ ১৮টি মামলা ছিল।
আরেক ঘটনা শেরপুরের। গত ১০ মার্চ শেরপুরের নকলায় কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয় সজীব মিয়া (১৪)। জানা যায়, ১০ মার্চ রাতে সজীবকে আড্ডা দেওয়ার কথা বলে ডেকে নকলা বাইপাস ব্রিজের নিচে নিয়ে যায় একই গ্রামের মো. রিফাতসহ (১৮) আরও তিন-চারজন। পরে একটি মোবাইল ফোন হারানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে সজীবের শরীরে ছুরিকাঘাত করা হয়। এসময় চিৎকার শুনে তাকে উদ্ধার করে নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় এলাকাবাসী। অবস্থা গুরুতর দেখে চিকিৎসক তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে চারদিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকার পর সজীব মারা যায়।
সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে- তা জানা যেমন জরুরি, তেমনই সন্তানকে সময় দেওয়াটাও জরুরি। তার সঙ্গে গল্প করা, তার মনের অবস্থা বোঝা দরকার। অভিভাবকদের সঙ্গে সন্তানদের বন্ধন তৈরি খুবই জরুরি। এ বন্ধন যত শিথিল হয়, সন্তান তত বাইরের জগতে ছোটে।
এ দুই ঘটনাই হত্যাকাণ্ডের। শুধু হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনায় নয়, এমন কোনো অপরাধ নেই যাতে কিশোর গ্যাং সদস্যরা জড়িত নয়। আওয়ামী লীগ আমলের কিশোর গ্যাং সদস্যরা ঘুরেফিরে নতুন নামে নতুনভাবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এসব গ্যাং সদস্যরা বদলেছে দল, কেউবা বদলেছে তাদের লিডারকে। নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও অপরাধের কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং ক্রমেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বিষফোঁড়ার মতো হয়ে উঠছে তারা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে কিশোর গ্যাং বর্তমানে ২৩৭টি। এসব গ্যাংয়ের মোট সদস্য অন্তত ৫০ হাজার। নির্বাচনের পর কিশোর গ্যাংগুলো স্থানীয় রাজনীতিকদের আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টায় রয়েছে।
রাজধানীর ৫০ থানা এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ১১৮টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা। প্রতিটি গ্রুপে সাতজন থেকে শুরু করে ২০ জন পর্যন্ত সদস্য রয়েছে। তাদের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছর। তারা চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তারসহ নানান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। এমনকি খুনোখুনিতেও হাত পাকাচ্ছে, তাদের হাতে রয়েছে চাপাতি থেকে শুরু করে নানান ধরনের দেশীয় অস্ত্র। রয়েছে পিস্তল, রিভলবারসহ অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র। এসব গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে শুরু করে এলাকাভিত্তিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন সময় একাধিকবার গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে ফের গ্যাং কালচারে জড়িত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ সারাদেশে নানামুখী অপরাধে যুক্ত হচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। নিজেদের হিরোইজম জাহির করতে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার এমনকি খুনোখুনিতে লিপ্ত হচ্ছে এসব কিশোর-তরুণ। এতে আতঙ্কিত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর-পাড়া-মহল্লার বাসিন্দারা। সমাজের বিভিন্ন স্তরে মাদকের আগ্রাসন বেশি। এ আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে কিশোররা। এ কারণে তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতে দ্বিধা করছে না। কিশোর গ্যাং সদস্যদের গ্রেফতারের পাশাপাশি তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
আরও পড়ুন
আরও ভয়ংকর রূপে ‘কিশোর গ্যাং’
ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, ‘এলেক্স ইমন’কে কুপিয়ে হত্যা
কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে কলিজা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো কিশোরের
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে- তা জানা যেমন জরুরি, তেমনই সন্তানকে সময় দেওয়াটাও জরুরি। তার সঙ্গে গল্প করা, তার মনের অবস্থা বোঝা দরকার। অভিভাবকদের সঙ্গে সন্তানদের বন্ধন তৈরি খুবই জরুরি। এ বন্ধন যত শিথিল হয়, সন্তান তত বাইরের জগতে ছোটে। তখন তাকে ফেরানোর কোনো পথ থাকে না।
ঢাকায় ১১৮ কিশোর গ্যাং গ্রুপ
গত বছর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদর দপ্তর রাজধানী ঢাকায় সক্রিয় ১১৮টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের তালিকা তৈরি করে। এতে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং তালিকাভুক্ত হয়েছে মিরপুর বিভাগের সাত থানা এলাকায়। এই বিভাগে ৩২টি গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে পল্লবী থানা এলাকায় সর্বাধিক ১৪টি গ্রুপ সক্রিয়। মিরপুরের পরই তেজগাঁও বিভাগের ছয় থানা এলাকায় ২৬টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয়। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানা এলাকায়ই সর্বাধিক ১৬টি গ্রুপ সক্রিয়।
পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, ডিএমপির রমনা বিভাগে ছয়টি, লালবাগ বিভাগে ১০টি, ওয়ারী বিভাগে ১৩টি, মতিঝিল বিভাগে ১০টি, গুলশান বিভাগে ১১টি এবং উত্তরা বিভাগে ১০টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয়।
মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেশি কেন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোর তৎপরতা, নিয়মিত অভিযান ও হাজার হাজার গ্রেফতার- এরপরও কিছুতেই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি। বিশেষ করে গত দুই বছরে বেপরোয়া হয়ে ওঠা কিশোর গ্যাংগুলো এখনও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। গত এক বছরে এসব গ্যাংয়ের হাতে অন্তত তিনজন খুন এবং ১৫ জনের বেশি গুরুতর আহত হন।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে রাজধানীসহ সারাদেশে ১২৭টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর কয়েক দিন পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার সুযোগে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়ে হয় ২৩৭টি। কোনো কোনো সংস্থার মতে, বর্তমানে এই সংখ্যা তিন শতাধিক।
স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে পট পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তৎপর হয়ে ওঠে অপরাধীরা। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর হয়ে ওঠে সবচেয়ে ভয়ের জনপদ। দীর্ঘদিনেও সেখানকার ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি সামাল দিতে হিমশিম খায় পুলিশ। কিশোর গ্যাংয়ের নিজেদের সংঘাত, শক্তি প্রদর্শনের মহড়া বা প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনা জনমনে আতঙ্ক ছড়ায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয়। সেগুলোর মধ্যে বেশি আলোচনায় আসে কবজি কাটা গ্রুপ। তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে মানুষের কবজি বিচ্ছিন্ন করার ভিডিও দেখে মানুষ আঁতকে ওঠে। গ্রুপের প্রধান আনোয়ার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেফতারের পর তাদের তৎপরতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এলেক্স ইমন গ্রুপের কর্মকাণ্ড থেমে ছিল না। এই এলাকার কিশোর গ্যাংগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে- পাটালি গ্রুপ, বেলচা মনির, ডায়মন্ড, ধাক্কা দে, গ্রুপ টুয়েন্টি ফাইভ, মুরগি গ্রুপ, লাল গ্রুপ, টুন্ডা বাবু, লও ঠেলা, কালা রাসেল, ল্যাংড়া হাসান ইত্যাদি।
সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে এলেক্স ইমন গ্রুপের মূলহোতা ইমনকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ/ ছবি- সংগৃহীত
ভুক্তভোগীরা জানান, মোহাম্মদপুরে সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়, রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, চাঁদ উদ্যান, লাউতলা, নবীনগর হাউজিং, বসিলা চল্লিশ ফিট, কাঁটাসুর, তুরাগ হাউজিং, আক্কাস নগর, ঢাকা উদ্যান নদীর পাড়, চন্দ্রিমা হাউজিং, আদাবর, শেখেরটেক ও মনসুরাবাদ কিংবা রায়েরবাজার- সব জায়গায় একই চিত্র। সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়া অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ। উঠতি বয়সী কিশোরদের কয়েকটি গ্রুপ প্রকাশ্যেই দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে জড়াচ্ছে। দিনদুপুরেও পথরোধ, মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে সর্বশেষ গত ২১ ফেব্রুয়ারি আদাবর থানা ঘেরাও করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনতা। বসিলা, চাঁদ উদ্যান ও আদাবর এলাকায় চাঁদাবাজি এবং গণছিনতাই প্রতিরোধের দাবি তুলে তারা থানা ঘেরাওয়ের পাশাপাশি সড়ক অবরোধ করেন। চাঁদার দাবি কেন্দ্র করে স্থানীয় এক এমব্রয়ডারি কারখানায় চাঁদাবাজদের হামলা ও দুই শ্রমিককে কুপিয়ে আহত করার পর ব্যবসায়ী এবং স্থানীয়রা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক ভিত্তিতে চাঁদ উদ্যান, বসিলাসহ বিভিন্ন মার্কেটের দোকান ও কারখানা থেকে চাঁদা তুলছে।
ঢাকায় অপরাধে জড়িতদের ৪০ শতাংশই কিশোর
ডিএমপি সদর দপ্তর সূত্র বলছে, ডিএমপির প্রতিটি থানা এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্য রয়েছে। ঢাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ৪০ শতাংশই কিশোর। ঢাকায় অপরাধে জড়িত এমন কিশোরের সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি।
আরও পড়ুন
মোহাম্মদপুরে ছিনতাই-কিশোর গ্যাং, ওসির অপসারণে আলটিমেটাম
‘হিরোইজম’ প্রকাশে পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং
লেগুনার হেলপার হয়ে চালাতেন কিশোর গ্যাং, ছিলেন ভাড়াটে সন্ত্রাসীও
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেড়েছে কিশোর গ্যাং গ্রুপ
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে রাজধানীসহ সারাদেশে ১২৭টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ ছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর কয়েক দিন পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার সুযোগে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়ে হয় ২৩৭টি।
কোনো কোনো সংস্থার মতে, বর্তমানে এ সংখ্যা তিন শতাধিক। সারাদেশে এসব গ্যাংয়ের সক্রিয় সদস্য অন্তত ৫০ হাজার। রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরে তাদের অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে।
গুলি করতেও দ্বিধা করে না কিশোররা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, কিশোর বয়স, রক্ত গরম, বেশিরভাগ সদস্য মাদকাসক্ত। সহজেই এ আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে কিশোররা। এ কারণে তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতে দ্বিধা করছে না। সম্প্রতি অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। তাদের ছত্রছায়ায় থেকে তাণ্ডব চালাচ্ছে এসব গ্যাং।
কী বলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
ডিএমপির মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘মোহাম্মদপুরে আগের চেয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে আমরা আরও ভালো করার চেষ্টা করছি। প্রতিদিনই আসামিদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। গত এক বছরে বিভিন্ন অপরাধে অন্তত তিন হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেকে জামিনে বেরিয়ে আবারও জড়ায় অপরাধে।’
অপরাধীকে শুধু গ্রেফতার করাই সমাধান নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাকে সমাজে ফিরিয়ে আনতে পরিবার ও সামাজিকভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা জরুরি।
মোহাম্মদপুর এলাকাকে দীর্ঘদিনের অপরাধপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির সম্প্রতি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ১৯৮৬ সালে তিনি নিজেও সেখানে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছিলেন।
আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় মোহাম্মদপুর এলাকায় গিয়ে তিনি আরও বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে। কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও মাদকবিরোধী টহল অব্যাহত রয়েছে।
কিশোর অপরাধের লাগাম টানতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তাদের সমাজে পুনর্বাসন তথা কাজের সুযোগ করে দিতে হবে। তাদের অপরাধ যদিও কিশোর অপরাধ, কিন্তু অপরাধের ভয়াবহতা প্রাপ্তবয়স্কদের মতো। কিশোর অপরাধীদের যারা পৃষ্ঠপোষকতা করছে তাদেরও যথাযথ আইনের আওতায় আনতে হবে। - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক
সারাদেশে কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে পুলিশের পদক্ষেপ সম্পর্কে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, কিশোর গ্যাং সমস্যা সমাধানে শুধু পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ সমস্যা মোকাবিলায় পুলিশ এরই মধ্যে ইমাম, শিক্ষক ও এলাকার মুরুব্বিদের সম্পৃক্ত করে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পাশাপাশি কিশোরদের সঠিক পথে রাখতে পরিবার ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা প্রণয়ন ও তাদের শনাক্ত করতে র্যাবের সব ব্যাটালিয়ন কাজ করছে। পাশাপাশি এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করতেও প্রতিটি ব্যাটালিয়ন সমন্বিত কাজ করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, কিশোর অপরাধের লাগাম টানতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তাদের সমাজে পুনর্বাসন তথা কাজের সুযোগ করে দিতে হবে। তাদের অপরাধ যদিও কিশোর অপরাধ, কিন্তু অপরাধের ভয়াবহতা প্রাপ্তবয়স্কদের মতো। কিশোর অপরাধীদের যারা পৃষ্ঠপোষকতা করছে তাদেরও যথাযথ আইনের আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরে যে ব্যত্যয়গুলো রয়েছে সেগুলো সংশোধন করা প্রয়োজন। কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবস্থায় ঘাটতি আছে। কিশোর অপরাধীদের ক্ষেত্রে শাস্তির চেয়ে সংশোধনের বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
টিটি/কেএসআর/এমএফএ
What's Your Reaction?