ছোটগল্প: রবিন টুইস্ট
ছোট্ট রবিন। দেখলেই মায়া জন্মে এমন। বয়স কতই হবে, ছয় বা সাত বা সর্বোচ্চ আট। যে বয়সে তার লেখাপড়া করার কথা, সেই বয়সে সে কোনোদিন চিপস, কোনোদিন পানি, কোনোদিন পেয়ারা-আমড়ার ডালা ইত্যাদি নিয়ে ছোটাছুটি করে নরসিংদী রেল স্টেশনে। জেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা শাহ আলম সাহেব মেরাদিয়ায় পৈতৃক আলিশান বাড়ি থেকে আন্তঃজেলা অফিস করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তার যাত্রা শুরু হয় কমলাপুর থেকে। ঘরে অত্যন্ত আরামপ্রিয় ও শৌখিন স্ত্রী সাইমুন্নেছা মুন্নী, মেডিকেলে পড়ুয়া রাজকন্যা অর্থী, আর মা নিয়ে সুখের স্বচ্ছল সংসার। একমাত্র ছেলে অক্সফোর্ডে পড়ুয়া, থাকে ওয়েলিংটন স্কয়ারে। আলম সাহেব যেদিনই অফিসে যান; সেদিনই নরসিংদী স্টেশনে রবিনের সাথে দেখা হয়। অনিচ্ছাসত্ত্বেও আলম সাহেব কিছু কেনেন রবিনের কাছ থেকে। তাই উনার সাথে ভাব হয়ে গেছে রবিনের। যেই কম্পার্টমেন্টেই থাকুন না কেন, সে যথাসময়ে শাহ আলম সাহেবের সম্মুখে উপস্থিত হবে। কখনো এর ব্যত্যয় হয় না। এভাবেই সম্পর্কটা এগিয়ে চলছে। একদিন কোনো এক সমস্যার কারণে নরসিংদী দুই ঘণ্টা ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। সেদিন অনেক কথা হলো রবিনের সাথে। আরও পড়ুন অসমাপ্ত ভালোবাসা সেদিন আলম সাহেব
ছোট্ট রবিন। দেখলেই মায়া জন্মে এমন। বয়স কতই হবে, ছয় বা সাত বা সর্বোচ্চ আট। যে বয়সে তার লেখাপড়া করার কথা, সেই বয়সে সে কোনোদিন চিপস, কোনোদিন পানি, কোনোদিন পেয়ারা-আমড়ার ডালা ইত্যাদি নিয়ে ছোটাছুটি করে নরসিংদী রেল স্টেশনে।
জেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা শাহ আলম সাহেব মেরাদিয়ায় পৈতৃক আলিশান বাড়ি থেকে আন্তঃজেলা অফিস করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তার যাত্রা শুরু হয় কমলাপুর থেকে। ঘরে অত্যন্ত আরামপ্রিয় ও শৌখিন স্ত্রী সাইমুন্নেছা মুন্নী, মেডিকেলে পড়ুয়া রাজকন্যা অর্থী, আর মা নিয়ে সুখের স্বচ্ছল সংসার। একমাত্র ছেলে অক্সফোর্ডে পড়ুয়া, থাকে ওয়েলিংটন স্কয়ারে।
আলম সাহেব যেদিনই অফিসে যান; সেদিনই নরসিংদী স্টেশনে রবিনের সাথে দেখা হয়। অনিচ্ছাসত্ত্বেও আলম সাহেব কিছু কেনেন রবিনের কাছ থেকে। তাই উনার সাথে ভাব হয়ে গেছে রবিনের। যেই কম্পার্টমেন্টেই থাকুন না কেন, সে যথাসময়ে শাহ আলম সাহেবের সম্মুখে উপস্থিত হবে। কখনো এর ব্যত্যয় হয় না। এভাবেই সম্পর্কটা এগিয়ে চলছে। একদিন কোনো এক সমস্যার কারণে নরসিংদী দুই ঘণ্টা ট্রেন দাঁড়িয়ে ছিল। সেদিন অনেক কথা হলো রবিনের সাথে।

অসমাপ্ত ভালোবাসা
সেদিন আলম সাহেব আদর করে রবিনকে বলেন, ‘রবিন টুইস্ট...’। ‘রবিন টুইস্ট’ বলাতে রবিন মহা বিস্ময়ে পাল্টা প্রশ্ন করেছিল, ‘রবিন টুইস্ট মানে কী?’
‘অলিভার টুইস্ট একটি কাল্পনিক অনাথ শিশু। যে তোমার মতো চরম দারিদ্র্য, শিশুশ্রম এবং নানা অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার প্রতীক। তুমিও তেমনই প্রতীক। তাই তার নামের শেষ অংশ তোমার নামের শেষে জুড়ে দিলাম। তুমি খুশি না বেজার হলে?’
‘আপনারা শিক্ষিত মানুষ, আপনারা যা বলবেন তার ওপর তো কথা নাই। আমি মোটামুটি খুশি।’
‘তোমাকে এমন কথা কে শিখিয়েছেন?’
‘আমার মা। আমার মা ডিগ্রি পাস দেওয়া মেয়ে।’
‘তুমি লেখাপড়া করোনি?’
‘আমি ওয়ান পাস। টুতে ওঠার পর আমার মা মারা যায়। বাবা আবার বিয়ে করে। সৎ মা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। আমি এই রেলস্টেশনেই থাকি।’
কথাটা শুনে ব্যথায় আলমের মনটা কুঁকড়ে ওঠে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিভাবে মারা গেলেন তিনি?’
‘বাচ্চা হবার সময়। বাচ্চাও মরছে, মা-ও মরছে।’
‘কোথায় মারা গেছেন? হাসপাতালে?’
‘না, আমাদের ঘরেই। হাসপাতালে তো বড়লোকদের বাচ্চা হয়।’
‘তোমার বাবা কিছু বলে না?’
‘আমার বাবা তো বিক্রি হয়ে গেছে। এর চেয়ে হে মরে গেলে ভালো হতো।’
আলম সেদিন রবিন টুইস্টের হাতে ঈদ করার জন্য এক হাজার টাকা দিতে চাইলে সে নিলোই না। সে বলল, ‘মা বলেছেন কাজ করে খাবি, তবু কারো দান নিবি না।’
আলম সাহেব ওর মেধা ও মনন দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। ট্রেন ছাড়ার পর ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়ে রবিন বলল, ‘আমারে নিয়া একটা গল্প লিখেন।’
‘আমি তো লেখক না। আমার পরিচিত এক লেখক আছেন। উনাকে অনুরোধ করলে ফেলতে পারবেন না।’
ঈদের লম্বা ছুটি আর থাইল্যান্ড ভ্রমণ শেষে ষোলো দিন পর আলম সাহেব আবার চেনা রুটিনে ফিরলেন। কিন্তু রেল নরসিংদী স্টেশনে রবিনকে আর দেখা যাচ্ছে না। প্রথমদিন ভাবলেন হয়তো দেরি হয়েছে, দ্বিতীয় দিন ভাবলেন হয়তো অসুস্থ। কিন্তু এক সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পর আলম সাহেবের মনে খটকা লাগলো।

ফাত্তাহ তানভীর রানার গল্প: তস্কর
নরসিংদী স্টেশনে নেমে তিনি খোঁজ নিতে শুরু করলেন। অবশেষে স্টেশনের এক পুরোনো চা বিক্রেতার কাছে খবর পেলেন। চা বিক্রেতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘স্যার, সেই গোলগাল সুন্দর ছোড পোলাডারে খুঁজতাছেন? ও তো আর নাই!’
আলম সাহেবের বুকটা ধক করে উঠল। তিনি অজানা আশঙ্কা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘নাই মানে? কোথায় গেছে?’
‘ঈদের আগের দিন স্টেশনের ওপারে একটা মালবাহী ট্রাকের নিচে পইড়া গেছিল। হাতে ছিল এক ব্যাগ পেয়ারা। শুনছি শেষ পর্যন্ত হাত থিকা পেয়ারার ব্যাগ ছাড়ে নাই। হাসপাতালেও নেওয়া গেছিল, কিন্তু ওই যে... ওর কপালে তো আর বড়লোকের চিকিৎসা জোটে নাই।’
আলম সাহেব ট্রেনের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বসে রইলেন। চারপাশের চেনা পৃথিবীটা হঠাৎ ঝাপসা হয়ে এলো। চোখের কোণে জমে ওঠা অশ্রুবিন্দুটা ট্রেনের বাতাসের তোড়ে মিলিয়ে গেল। যেমনই মিলিয়ে যায় লাখো পথশিশু মহাকালের অতল গহ্বরে।
তিনি পকেট থেকে ফোনটা বের করলেন। কন্টাক্ট লিস্ট থেকে খুঁজে বের করলেন পরিচিত লেখকের নম্বর। ফোনটা রিসিভ হতেই আলম সাহেব ধরা গলায় বললেন, ‘ভাইজান, সেই যে ঈদের দিন বলেছিলাম। ছেলেটাকে নিয়ে গল্পটা কিন্তু লিখতেই হবে। আমার রবিন টুইস্ট আর নেই!’ কথাগুলো বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন আলম সাহেব। সহযাত্রীদের মাঝে নেমে এলো এক মিনিটে নীরবতা।

গল্প / আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি
এরপর প্রতি কর্ম দিবসে যখন ট্রেনটি শাঁ শাঁ করে নরসিংদী স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছিল; তখন আলম সাহেবের বুকটা দুমড়ে মুচড়ে যেত। একদিন এক পত্রিকায় সাহিত্যপাতায় ‘রবিন টুইস্ট’ গল্পটি দেখে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ লেখককে কল দিলেন। ওপাশ থেকে লেখক বললেন, ‘নিজের সন্তানকে তো পশুও ভালোবাসে। পরের সন্তানকে যে ভালোবাসে; সে হলো আসল মানুষ।’
এসইউ
What's Your Reaction?