জাকাতের নেসাব : স্বর্ণ, রুপা ও আধুনিক মুদ্রার মানদণ্ড

সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য শুধু মালিক হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং সেই সম্পদ শরিয়ত নির্ধারিত একটি ন্যূনতম সীমায় পৌঁছাতে হয়। এই সীমাকেই বলা হয় ‘নেসাব’। জাকাত কোনো সাধারণ দান নয়, এটি ইবাদত, এটি সম্পদের পবিত্রতা এবং দরিদ্রের নির্ধারিত অধিকার আদায়ের ব্যবস্থা। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বর্ণ ও রুপা-উভয়ের জন্য পৃথক নেসাব নির্ধারণ করে দিয়েছেন। রুপার ক্ষেত্রে ২০০ দিরহাম এবং স্বর্ণের ক্ষেত্রে ২০ দিনার। সময়ের পরিবর্তনে মুদ্রা ব্যবস্থা বদলালেও এই মৌলিক বিধান অপরিবর্তিত রয়েছে। অতএব, জাকাতের নেসাব বুঝতে হলে আমাদের হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের আমল ও ফিকহি ব্যাখ্যার আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করতে হবে। নিচে নেসাবের প্রকারভেদ ও স্বর্ণ-রুপা এবং নগদ অর্থের নেসাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো। জাকাতের নেসাব  বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ৫ ধরনের সম্পদের ওপর জাকাত আবশ্যক হয়-  ১. স্বর্ণ ২. রুপা ৩. নগদ ক্যাশ ৪. ব্যবসায়িক পণ্য ৫. গবাদি পশু নেসাবের প্রকারভেদ নেসাবের প্রকারভেদ প্রসঙ্গে ‘হাশিয়াতুত তাহতাবি আলা মারাকিল ফালাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে,  إِعْلَمْ أَنَّ النَّصْبَ ثَلَ

জাকাতের নেসাব : স্বর্ণ, রুপা ও আধুনিক মুদ্রার মানদণ্ড

সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য শুধু মালিক হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং সেই সম্পদ শরিয়ত নির্ধারিত একটি ন্যূনতম সীমায় পৌঁছাতে হয়। এই সীমাকেই বলা হয় ‘নেসাব’। জাকাত কোনো সাধারণ দান নয়, এটি ইবাদত, এটি সম্পদের পবিত্রতা এবং দরিদ্রের নির্ধারিত অধিকার আদায়ের ব্যবস্থা।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বর্ণ ও রুপা-উভয়ের জন্য পৃথক নেসাব নির্ধারণ করে দিয়েছেন। রুপার ক্ষেত্রে ২০০ দিরহাম এবং স্বর্ণের ক্ষেত্রে ২০ দিনার। সময়ের পরিবর্তনে মুদ্রা ব্যবস্থা বদলালেও এই মৌলিক বিধান অপরিবর্তিত রয়েছে।

অতএব, জাকাতের নেসাব বুঝতে হলে আমাদের হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের আমল ও ফিকহি ব্যাখ্যার আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করতে হবে। নিচে নেসাবের প্রকারভেদ ও স্বর্ণ-রুপা এবং নগদ অর্থের নেসাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো।

জাকাতের নেসাব 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ৫ ধরনের সম্পদের ওপর জাকাত আবশ্যক হয়- 

১. স্বর্ণ

২. রুপা

৩. নগদ ক্যাশ

৪. ব্যবসায়িক পণ্য

৫. গবাদি পশু


নেসাবের প্রকারভেদ

নেসাবের প্রকারভেদ প্রসঙ্গে ‘হাশিয়াতুত তাহতাবি আলা মারাকিল ফালাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, 

إِعْلَمْ أَنَّ النَّصْبَ ثَلَاثَةٌ: نِصَابٌ يُشْتَرَطُ فِيهِ النَّمَاءُ، وَتَتَعَلَّقُ بِهِ الزَّكَاةُ، وَسَائِرُ الأَحْكَامِ الْمُتَعَلِّقَةِ بِالْمَالِ النَّامِي .وَنِصَابٌ تَجِبُ بِهِ أَحْكَامٌ أَرْبَعَةٌ: حُرْمَةُ الصَّدَقَةِ، وَوُجُوبُ الأُضْحِيَةِ، وَصَدَقَةُ الْفِطْرِ، وَنَفَقَةُ الأَقَارِبِ .وَلَا يُشْتَرَطُ فِيهِ النَّمَاءُ بِالتِّجَارَةِ وَلَا حَوَلَانُ الْحَوْلِ  .وَنِصَابٌ تَثْبُتُ بِهِ حُرْمَةُ السُّؤَالِ، وَهُوَ مَا إِذَا كَانَ عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ عِنْدَ بَعْضٍ، وَقَالَ بَعْضُهُمْ: هُوَ أَنْ يَمْلِكَ خَمْسِينَ دِرْهَمًا.

অর্থাৎ, নেসাব তিন প্রকার-

১. এমন নেসাব যাতে বর্ধনশীলতা (النماء) শর্ত। বস্তুত উক্ত নেসাবের সাথেই জাকাত এবং বর্ধনশীল সম্পদ সম্পর্কীয় যাবতীয় বিধিবিধান সম্পৃক্ত। 

২. এমন নেসাব যাতে চার ধরনের বিধান ওয়াজিব হয়। তথা যে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে সাদাকা গ্রহণ করা হারাম হয়, কোরবানি ওয়াজিব হয়, সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয় এবং পরিবারভুক্ত লোকজন ও নির্দিষ্ট  আত্মীয়-স্বজনদের ভরণ-পোষণ ওয়াজিব হয়। এই নেসাবের ক্ষেত্রে সম্পদ বর্ধনশীল হওয়া এবং বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। 

৩. এমন নেসাব যা থাকলে অন্যের কাছে ভিক্ষা করা অবৈধ সাব্যস্ত হয়। কারো কারো মতে এই নেসাবের পরিমাণ হলো, একদিনের চলার মতো আহার্য থাকা। আবার কেউ বলেন, এর পরিমাণ হলো পঞ্চাশ দিরহাম (যা তোলা হিসেবে ১৩ তোলা ১ মাশা ৪ দিরহাম হয়)।  (হাশিয়াতুত তাহতাবি, পৃ. ৭২৩)

রুপার নেসাব (نِصَابُ الْفِضَّةِ)

জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে শুধু জাকাতযোগ্য সম্পদ থাকা যথেষ্ট নয়; বরং সেই সম্পদ নির্দিষ্ট একটি ন্যূনতম পরিমাণে পৌঁছানো আবশ্যক। জাকাতযোগ্য সম্পদের এই ন্যূনতম সীমাকেই শরিয়াহর পরিভাষায় ‘নেসাব’ (نِصَاب) বলা হয়।

১. রুপার নেসাব নির্ধারণ

শরিয়াহর দৃষ্টিতে রুপার নেসাব হলো পাঁচ উকিয়া। উকিয়া (أوقية) প্রাচীন আরবের এক ধরনের ওজন বা পরিমাপ একক, যা দিয়ে ধাতু বা দ্রব্যের পরিমাণ নির্ধারণ করা হতো। এক ‘উকিয়া’ সমান ৪০ দিরহাম। সুতরাং পাঁচ উকিয়া = ২০০ দিরহাম। অতএব রুপার নেসাব দাঁড়ায় ২০০ দিরহাম রুপা।

২. ‘দিরহাম’ কী ?

দিরহাম (دِرْهَم) প্রাচীন যুগের রৌপ্যমুদ্রার একক, যাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ খাঁটি রুপা থাকত। এই শব্দটির উৎস হলো, ইউনানি শব্দ ‘দ্রাখমা’ (উৎধপযসধ)। পরবর্তীতে এটি আরবিতে রুপান্তরিত হয়ে ‘দিরহাম’ নামে প্রচলিত হয়।

৩. বর্তমান মাপে রুপার নেসাবের হিসাব

উপমহাদেশের বিজ্ঞ আলেমদের হিসাব অনুযায়ী ১ দিরহাম সমান ২৫.২০ রত্তি রুপা।  তাহলে ২০০ দিরহাম × ২৫.২০ রত্তি = ৫, ০৪০ রত্তি রুপা। অন্যদিকে, এক ভরি (বা তোলা) সমান ৯৬ রত্তি। এই হিসেবে - ৫,০৪০÷৯৬ = ৫২.৫ ভরি রুপা। অতএব, শরিয়াহর হিসেবে রুপার নেসাব হলো সাড়ে বায়ান্ন ভরি (৫২.৫ ভরি) খাঁটি রুপা।

সুতরাং কোনো ব্যক্তির মালিকানায় যদি পূর্ণ এক বছর যাবৎ উল্লিখিত পরিমাণ রুপা বা রুপার সমমূল্যের সম্পদ থাকে এবং সম্পদটি ঋণমুক্ত ও বৃদ্ধিযোগ্য (نامي) হয়, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ হবে।

এবার কয়েকটি দলিল লক্ষ্য করুন। রুপার নেসাবের বিষয়ে সহিহ বোখারি গ্রন্থে একটি হাদিস উল্লেখ রয়েছে , 

أَخْبَرَنَا الأَوْزَاعِيُّ أَخْبَرَنِي يَحْيَى بْنُ أَبِي كَثِيرٍ أَنَّ عَمْرَو بْنَ يَحْيَى بْنِ عُمَارَةَ أَخْبَرَهُ عَنْ أَبِيهِ يَحْيَى بْنِ عُمَارَةَ بْنِ أَبِي الْحَسَنِ أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا سَعِيدٍ يَقُولُ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ أَوَاقٍ صَدَقَةٌ وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ ذَوْدٍ صَدَقَةٌ وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ أَوْسُقٍ صَدَقَةٌ.

অর্থা : হজরত আবু সাঈদ (রাজি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পাঁচ উকিয়ার কম সম্পদের ওপর জাকাত (ফরজ) নেই এবং পাঁচটি উটের কমের ওপর জাকাত নেই। পাঁচ ওয়াসাক  এর কম উৎপন্ন দ্রব্যের ওপর জাকাত নেই।  (বোখারি : ১৪০৫)

‘সুনানে দারাকুতনি’ গ্রন্থে এই বিষয়ে একটি হাদিস উল্লেখ রয়েছে। হাদিসের মূল পাঠ হলো,

عَنْ جَابِرٍ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يَقُولُ: لَا زَكَاةَ فِي شَيْءٍ مِنَ الحَرْثِ حَتَّى يَبْلُغَ خَمْسَةَ أَوْسَاقٍ، فَإِذَا بَلَغَ خَمْسَةَ أَوْسَاقٍ فَفِيهِ الزَّكَاةُ، وَالوَسْقُ سِتُّونَ صَاعًا، وَلَا زَكَاةَ فِي شَيْءٍ مِنَ الفِضَّةِ حَتَّى يَبْلُغَ خَمْسَ أَوَاقٍ، وَالوُقْيَةُ أَرْبَعُونَ دِرْهَمًا.

অর্থ : হজরত জাবির (রাজি.) বর্ণনা করেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কোনো ক্ষেতের (কৃষিজ উৎপাদনের) ওপর ততক্ষণ পর্যন্ত জাকাত ফরজ নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত তা পাঁচ উসুক পরিমাণ না হয়।  আর যখন তা পাঁচ উসুক পরিমাণে পৌঁছে যাবে, তখন তাতে জাকাত আদায় করা ফরজ হবে। এক উসুক ৬০ সা-এর সমান। একইভাবে, রুপা যতক্ষণ পর্যন্ত ৫ উকিয়া না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তাতেও জাকাত ফরজ নয়। আর ১ উকিয়া  ৪০ দিরহামের সমান। (দারাকুতনি : ১৯২২)

বাদায়িউস সানায়ে’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, 

أَمَّا قَدْرُ النِّصَابِ فِيهِمَا فَالْأَمْرُ لَا يَخْلُو إِمَّا أَنْ يَكُونَ لَهُ فِضَّةٌ مُفْرَدَةٌ أَوْ ذَهَبٌ مُفْرَدٌ أَوِ اجْتَمَعَ لَهُ الصِّنْفَانِ جَمِيعًا، فَإِنْ كَانَ لَهُ فِضَّةٌ مُفْرَدَةٌ فَلَا زَكَاةَ فِيهَا حَتَّى تَبْلُغَ مِائَتَيْ دِرْهَمٍ وَزْنًا وَزْنَ سَبْعَةٍ، فَإِذَا بَلَغَتْ فَفِيهَا خَمْسَةُ دَرَاهِمَ، لِمَا رُوِيَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ لَمَّا كَتَبَ كِتَابَ الصَّدَقَاتِ لِعَمْرِو بْنِ حَزْمٍ، ذَكَرَ فِيهِ: الفِضَّةُ لَيْسَ فِيهَا صَدَقَةٌ حَتَّى تَبْلُغَ مِائَتَيْ دِرْهَمٍ، فَإِذَا بَلَغَتْ مِائَتَيْنِ فَفِيهَا خَمْسَةُ دَرَاهِمَ. وَرُوِيَ عَنْهُ ﷺ أَنَّهُ قَالَ لِمُعَاذٍ لَمَّا بَعَثَهُ إِلَى الْيَمَنِ: لَيْسَ فِيمَا دُونَ مِائَتَيْنِ مِنَ الْوَرِقِ شَيْءٌ، وَفِي مِائَتَيْنِ خَمْسَةٌ.
بدائع الصنائع في ترتيب الشرائع، كتاب الزكاة، فصل: وأما الأثمان المطلقة، ٢: ١٦، ط. دار الكتب العلمية، بيروت.

অর্থাৎ, যে পরিমাণে সোনা ও রুপায় নেসাব নির্ধারিত হয়েছে, সে পরিমাণ বিবেচনায়  তিন অবস্থা হতে পারে।

১. হয়তো শুধু রুপা আছে

২. অথবা শুধু সোনা আছে

৩. অথবা উভয় প্রকারই একসঙ্গে রয়েছে

যদি শুধু রুপা থাকে, তাহলে তাতে জাকাত ফরজ হবে না, যতক্ষণ না তা দুইশত (২০০) দিরহাম ওজনের সমপরিমাণ হবে। ... যখন তা দুইশত দিরহামে পৌঁছাবে (বা ২০০ দিরহামের সমপরিমাণ হবে), তখন তাতে পাঁচ দিরহাম জাকাত আদায় করতে হবে।

কারণ বর্ণিত আছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমর ইবনু হাজম (রাজি.)-কে জাকাত সম্পর্কিত নীতিপত্র লিখে পাঠালেন, তাতে উল্লেখ ছিল, ‘রুপার ওপর কোনো জাকাত নেই যতক্ষণ না তা দুইশত দিরহামে পৌঁছায়; আর যখন দুইশত দিরহামে পৌঁছবে, তখন তাতে পাঁচ দিরহাম জাকাত রয়েছে।’

আরও বর্ণিত আছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মুআজ (রাজি.)- কে ইয়ামানে প্রেরণ করেন, তখন তাঁকে বলেছিলেন, ‘দুইশত দিরহামের কম রুপায় কোনো জাকাত নেই। দুইশত দিরহাম রুপা হলে পাঁচ দিরহাম জাকাত দিতে হবে।’ (বাদায়িউস সানায়ে : ২/১৬)

স্বর্ণের নেসাব ( نصاب الذهب)

হাদিসের আলোকে সালাফে সালেহিন ও ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ আলেমগণ বলেছেন, স্বর্ণের নেসাব হলো বিশ (২০) দিনার । ইসলামি অর্থনৈতিক পরিভাষায় ‘দিনার’ বলতে বোঝানো হয় স্বর্ণের একটি নির্ধারিত পরিমাণ, যা দ্বারা স্বর্ণের মূল্যমান ও জাকাতের ন্যূনতম সীমা নিরূপণ করা হয়।

‘মিসকাল’ ও ‘দিনার’- উভয় শব্দই প্রাচীন ইসলামি যুগে প্রায় সমার্থকভাবে ব্যবহৃত হতো। তবে এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। 

পার্থক্য হলো

মিসকাল হলো, ওজন নির্ধারণের একটি একক বা একটি পরিমাপক; এর মাধ্যমে স্বর্ণ মাপা হয়। আর দিনার হলো, নির্ধারিত ওজনে তৈরি স্বর্ণমুদ্রা, যা ক্রয়-বিক্রয় ও সম্পদের হিসাবের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়। 

অতএব বলা যায়, মিসকাল দ্বারা স্বর্ণ মাপা হতো, আর দিনার ছিল সেই মাপ অনুযায়ী তৈরি স্বর্ণমুদ্রা।

উপমহাদেশীয় পরিমাপে নেসাবের হিসাব

ভারত উপমহাদেশের আলিম ও গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ১ দিনার = ৩৬ রত্তি স্বর্ণ। অতএব, ২০ দিনার × ৩৬ রত্তি = ৭২০ রত্তি স্বর্ণ।

আমরা জানি, ১ ভরি (বা ১ তোলা) = ৯৬ রত্তি। সুতরাং, ৭২০ ÷ ৯৬ = ৭.৫ ভরি স্বর্ণ। অতএব, শরিয়তের দৃষ্টিতে স্বর্ণের নেসাব হলো সাড়ে সাত ভরি (৭.৫ ভরি) স্বর্ণ।

আধুনিক ওজনের হিসাবে

বর্তমান আন্তর্জাতিক মাপ অনুযায়ী, ১ ভরি = ১১.৬৬৪ গ্রাম। সুতরাং, ৭.৫ ভরি × ১১.৬৬৪ গ্রাম = ৮৭.৪৮ গ্রাম। অতএব, স্বর্ণের নেসাব আধুনিক ওজন ব্যবস্থায় ৮৭.৪৮ গ্রাম স্বর্ণের সমান। মোটকথা, ইসলামি শরিয়তে স্বর্ণের নেসাব ২০ দিনার, অর্থাৎ প্রায় ৭.৫ ভরি (৮৭.৪৮ গ্রাম) স্বর্ণ।

দলিল : স্বর্ণের নেসাবের বিষয়ে সুনানে ইবনে মাজাহ গ্রন্থের একটি হাদিস লক্ষ্য করুন,

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ وَاقِدٍ عَنْ ابْنِ عُمَرَ وَعَائِشَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَأْخُذُ مِنْ كُلِّ عِشْرِينَ دِينَارًا فَصَاعِدًا نِصْفَ دِينَارٍ وَمِنْ الْأَرْبَعِينَ دِينَارًا دِينَارًا.

অর্থ : হজরত ইবনু উমর ও হজরত আয়শা (রাজি.) থেকে বর্ণিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বিশ দিনার বা তারচেয়ে কিছু বেশি হলে অর্ধ দিনার এবং চল্লিশ দিনারে এক দিনার (জাকাত) গ্রহণ করতেন। (ইবনে মাজাহ : ১৭৯১) 

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বর্ণের নিসাব ২০ দিনার নির্ধারণ করেছেন। বর্তমান ওজন অনুযায়ী তা সাড়ে সাত তোলা হয়, যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। 

‘সুনানে আবু দাউদ’ গ্রন্থে স্বর্ণ ও রুপার নেসাবের বিষয়ে একটি হাদিস উল্লেখ রয়েছে। হাদিসের মূল পাঠ হলো,

عَنْ عَلِيٍّ، - رضى الله عنه - عَنِ النَّبِيِّ صلي الله عليه وسلم بِبَعْضِ أَوَّلِ هَذَا الْحَدِيثِ قَالَ ‏: فَإِذَا كَانَتْ لَكَ مِائَتَا دِرْهَمٍ وَحَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ فَفِيهَا خَمْسَةُ دَرَاهِمَ وَلَيْسَ عَلَيْكَ شَىْءٌ - يَعْنِي فِي الذَّهَبِ - حَتَّى يَكُونَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا فَإِذَا كَانَ لَكَ عِشْرُونَ دِينَارًا وَحَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ فَفِيهَا نِصْفُ دِينَارٍ فَمَا زَادَ فَبِحِسَابِ ذَلِكَ. ‏

অর্থ : হজরত আলি (রাজি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এ হাদিসের প্রথম দিকের কিছু অংশ বর্ণনার পর বলেন, তিনি বলেছেন, তোমার কাছে দুইশো দিরহাম থাকলে এবং তা পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে পাঁচ দিরহাম (জাকাত) দিবে। স্বর্ণের ক্ষেত্রে বিশ দিনারের কমে জাকাত নেই। ২০ দিনারে পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হলে অর্ধ দিনার জাকাত দিতে হবে। এরপর যা বাড়বে তাতে উপর্যুক্ত হিসেবে জাকাত দিতে হবে। (আবু দাউদ : ১৫৭৩, মুসনাদে আহমদ : ১২৬৪)

জাকাতের মূল নেসাব সোনা নাকি রুপা ?

জাকাতের নেসাবে সোনা ও রুপা- উভয়ই মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারিত। কারণ উভয়ই ‘মূল্যবান মুদ্রা’ হিসেবে গণ্য এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে সোনা ও রুপা-দুটোর জন্যই পৃথক পৃথক নেসাব নির্ধারিত ছিল (যেমন ইতোপূর্বে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে)।

অতএব, যার কাছে সাড়ে বাহান্ন তোলা (৫২.৫ তোলা) রুপা আছে, সে শরিয়তের দৃষ্টিতে জাকাতের ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তির মতোই ধনী গণ্য হবে, যার কাছে সাড়ে সাত তোলা (৭.৫ তোলা) সোনা আছে। বর্তমান সময়ে সোনা ও রুপার দামের তারতম্যের কারণে জাকাতের নিসাবে কোনো পরিবর্তন আসবে না। চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে দ্রব্যের মূল্যবৈষম্য স্বাভাবিক বিষয়।

যে ব্যক্তি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, সে শরিয়তের দৃষ্টিতে ধনী। যদিও অন্য সম্পদের তুলনায় তার সম্পদের আর্থিক মূল্য কম হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি ৫২.৫ তোলা রুপার মালিক, তার ওপর জাকাত ফরজ হবে। 

সর্বোপরি, সোনা ও রুপা-উভয়ের জাকাতের পৃথক পৃথক নেসাব শরিয়তের প্রামাণ্য দলিল দ্বারা নির্ধারিত। আর শরিয়তের নির্ধারিত বিধানসমূহ (شرع منزل) সময়, সমাজ বা পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তিত হয় না। 

ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাদিসসমূহে স্বর্ণের নেসাবের উল্লেখ তুলনামূলকভাবে খুবই কম পাওয়া যায়; বরং অধিকাংশ বর্ণনাতেই রুপার নেসাবের কথাই এসেছে। নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে যে নেসাবের ঘোষণা একাধিকবার দিয়েছেন, তা মূলত রুপার নেসাব সংক্রান্ত ছিল, স্বর্ণের নয়। যদিও সাহাবা ও তাবেয়িন থেকে স্বর্ণের নেসাবও প্রমাণিত এবং দু-একটি হাদিসেও এর বর্ণনা এসেছে। তবুও বাস্তবে অধিকাংশ সময়ই রুপার নেসাব অনুযায়ী আমল প্রচলিত ছিল।

এ প্রসঙ্গে মুফতি রফি উসমানি (রাহি) লিখেছেন, ‘মোটকথা, স্বর্ণের নেসাব সম্পর্কে স্পষ্ট বক্তব্য যদিও হাদিসে উল্লেখ রয়েছে  এবং সাহাবায়ে কেরামের আমলও তারই অনুরূপ ছিল, কিন্তু স্বর্ণের প্রচলন কম থাকার কারণে এই হাদিসগুলো ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করতে পারেনি। এই নতিদীর্ঘ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাকাতের যে নেসাব নির্ধারণ করেছিলেন এবং বারবার যার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটি মূলত রুপার নেসাবই ছিল। পরে যদিও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বর্ণের জন্য পৃথক একটি নেসাব নির্ধারণ করেছিলেন।’

‘কিন্তু পরিস্থিতি এমন মোটেও ছিল না যে, নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে স্বর্ণের নেসাব নির্ধারণ করেছিলেন এবং পরে স্বর্ণের অনুগামী করে স্বর্ণের সমমূল্যের রুপাকে আলাদা নেসাব স্থির করেছিলেন। বরং প্রথমেই যে নেসাব নির্ধারিত হয়েছিল এবং যার ওপর নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে আমল করিয়েছিলেন, তা ছিল রুপার নেসাবই। আর রুপার নেসাব নির্ধারণের সময় মোটেও এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়নি যে, ওই পরিমাণ রুপা কতটুকু স্বর্ণের সমমূল্য হয়।’

‘অতএব এখন আমাদের জন্য কোনোভাবেই এটি বৈধ নয় যে, আমরা স্বর্ণের নেসাবকে মূল নেসাব ধরে নিয়ে তার সমমূল্যের এই পরিমাণ রুপাকে নেসাব হিসেবে নির্ধারণ করি, যা নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত রুপার নেসাবের চেয়ে বেশি হয়। 

‘বরং হাদিস ও আসারের (সালাফের বর্ণনা) আলোকে কিছু ফকিহের কাছে এ বিষয়টি চিন্তাযোগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, রুপার নেসাবকে মূল ধরে তার সমমূল্যের স্বর্ণকে স্বর্ণের নেসাব হিসেবে নির্ধারণ করা যায় কি না। কিন্তু এর বিপরীতÑঅর্থাৎ স্বর্ণকে মূল ধরে রুপার নেসাব নির্ধারণ করাÑহাদিসের আলোকে কোনোভাবেই কল্পনাযোগ্য নয়।’

‘যেহেতু বাস্তব অবস্থা এমনই, তাই স্বর্ণ বা রুপার নেসাবে ইজতিহাদের মাধ্যমে কোনো পরিবর্তন বা সংশোধনের অধিকার কারো নেই। কারণ ইজতিহাদ কেবল সেই বিষয়গুলোতেই করা যায়, যেগুলো সম্পর্কে কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমাÑএই তিন উৎস নীরব রয়েছে। আর যে বিষয়গুলোর বিধান কুরআন, সুন্নাহ বা ইজমা দ্বারা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়ে আছে, সেসব বিষয়ে ইজতিহাদ করার কোনো সুযোগই নেই। কেননা ইজতিহাদ সহিহ হওয়ার সর্বপ্রথম শর্ত হলো, তা যেন ফিকহের এই তিনটি মৌলিক উৎসের (কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা) কোনো একটির বিরোধী না হয়।’ (নাওয়াদিরুল ফিকহ : ১/৩৫৩-৩৫৪)

সারকথা, স্বর্ণ ও রুপার নেসাব দুইটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র নেসাব। রুপার নেসাব স্বর্ণের নেসাবের অনুগামী করে নির্ধারণ করা হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে সালাফগণ স্বর্ণের নেসাব নির্ধারণে রুপার নেসাবকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছেন। (যেমন : কারো কাছে নেসাবের কম স্বর্ণ আছে এবং অন্যান্য জাকাতযোগ্য সম্পদও আছে, এমতাবস্থায় সালাফগণ রুপার নেসাবকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে জাকাত আদায়ের কথা বলেছেন।) কিন্তু কখনোই এর বিপরীত ঘটেনি। তাই যারা বর্তমানে স্বর্ণের নেসাবকে একমাত্র মূল মানদণ্ড সাব্যস্ত করতে চান, তাদের এই বক্তব্য সঠিক নয়।

উল্লেখ্য, সোনা ও রুপার মূল্যমানের বর্তমান তফাৎ নতুন কিছু নয়। নববি যুগ এবং সালাফের যুগেও তফাৎ ছিল। যেমন, নববি যুগে স্বর্ণ ও রুপার অনুপাত ছিল ১/১০। অর্থাৎ একটি স্বর্ণমুদ্রা দশটি রৌপ্যমুদ্রার সমান । এরপর বনু উমাইয়ার শেষার্ধে এটি বেড়ে ১/১২ হয়, আব্বাসি আমলে ১/১৫ এবং ফাতেমি আমলে ১/৩৫ পর্যন্ত পৌঁছায়। এত বড় তফাৎ থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন ফকিহগণ স্বর্ণের নেসাবকে মূল ধরে রুপার নেসাবকে তার অনুগামী করেননি। কারণ রুপার নেসাবটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ঘোষিত ও প্রতিষ্ঠিত এবং এর ওপর মুসলিম উম্মাহর ইজমা রয়েছে। ফলে এতে কোনো রূপ রদ-বদলের  সুযোগ নেই।

অন্যদিকে, যদি কারও কাছে মিশ্র নিসাব থাকে-অর্থাৎ কিছু সোনা, কিছু রুপা, কিছু নগদ অর্থ বা বাণিজ্যিক পণ্য, তাহলে প্রশ্ন আসে- এই ক্ষেত্রে নিসাবের মানদণ্ড কী সোনা ধরা হবে, না রুপা?

এ বিষয়ে ফকিহগণের মতভেদ রয়েছে। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং ফতওয়াযোগ্য মত হলো, এই ক্ষেত্রে রুপার নিসাবকেই মানদণ্ড ধরা হবে। এর কারণ হলো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে রুপার নেসাবের সর্বাধিক প্রয়োগ ছিল। ফলে প্রয়োগিক দিক বিবেচনায় ধরে নেওয়া যায়, নেসাবের মূল ভিত্তি রুপা। তাছাড়া কোনো কোনো ফকিহের মতে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে সোনাকে রুপার অনুগামী (تابع) করা হয়েছিল- এক দিনারকে দশ দিরহামের সমমূল্য নির্ধারণ করে। তাছাড়া, বর্তমান সময়ে মিশ্র নিসাবে রুপাকে মানদণ্ড ধরলে গরিব ও অভাবগ্রস্তদের জন্য উপকারও বেশি হয়।

এ বিষয়ে ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, 

وَالذَّهَبُ مَحْمُولٌ عَلَى الفِضَّةِ، وَكَانَ فِي ذَلِكَ الزَّمَانِ صَرْفُ دِينَارٍ بِعَشَرَةِ دَرَاهِمَ، فَصَارَ نِصَابُهُ عِشْرِينَ مِثْقَالًا۔
حجة الله البالغة، الزَّكَاةِ، بَابُ مَقَادِيرِ الزَّكَاةِ، ٢: ٦٧ ،  ط: دَارُ الجَبَل.

‘স্বর্ণকে রুপার অনুগামী ধরা হয়েছে। ঐ সময়ে তথা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ১ দিনারের বিনিময় হার ছিল ১০ দিরহাম। ফলে স্বর্ণের নেসাব নির্ধারিত হলো ২০ মিসকাল।’ (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা : ২/৬৭)

সোনা ও রুপা মিলিয়ে নেসাব নির্ধারণ

জাকাতের নেসাব নির্ধারণের ক্ষেত্রে সোনা ও রুপা সম্পর্কিত তিনটি অবস্থা শরিয়তে বিবেচিত হয়েছে। প্রতিটি অবস্থার বিধান নিচে উপস্থাপন করা হলো-

প্রথম অবস্থা : সোনা ও রুপা-দুটোই রয়েছে এবং প্রত্যেকটি নেসাব পরিমাণ রয়েছে। এই ক্ষেত্রে উভয়টি স্বতন্ত্র সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ সোনার জন্য সোনার নেসাব ধরা হবে (২০ মিসকাল বা ৭.৫ তোলা)। আর রুপার জন্য রুপার নেসাব ধরা হবে (২০০ দিরহাম বা ৫২.৫ তোলা)।

মোটকথা, সোনা ও রুপা- দুটোই যদি নিজ নিজ নেসাবে পৌঁছে যায়, তাহলে প্রত্যেকটির ওপর পৃথকভাবে জাকাত ফরজ হবে। একটির জাকাত আদায়ে অন্যটিকে মিলানো হবে না।

দ্বিতীয় অবস্থা : শুধু নেসাব পরিমাণ সোনা আছে অথবা শুধু নেসাব পরিমাণ রুপা আছে। তথা যেকোনো একটি আছে। এই অবস্থায় যেটি থাকবে, সেটির স্বতন্ত্র নেসাব অনুসারেই জাকাতের বিধান প্রযোজ্য হবে।

উদাহরণ : কারো কাছে যদি শুধু সোনা থাকে, তাহলে সেটি ৭.৫ তোলা পূর্ণ হলে জাকাত ফরজ হবে। কারো কাছে যদি শুধু রুপা থাকে, তাহলে সেটি ৫২.৫ তোলা পূর্ণ হলে জাকাত ফরজ হবে। অতএব, একটির অনুপস্থিতিতে অন্যটির নেসাব মানদণ্ড হিসেবে নেওয়া হবে না।

তৃতীয় অবস্থা : সোনা ও রুপা- দুটোই আছে, কিন্তু কোনোটিই নিজস্ব নেসাবে পৌঁছেনি। এ ক্ষেত্রে শরিয়তের নির্দেশনা হলো, যদি সোনা ও রুপার মূল্য একত্রে মিলিয়ে হিসাব করলে সোনা ও রুপা- দুটোর সম্মিলিত মূল্য ৫২.৫ তোলা রুপার মূল্যের সমান বা তারচেয়ে বেশি হয়, তাহলে জাকাত ফরজ হবে। 

উদাহরণ : ধরা যাক কোনো ব্যক্তির কাছে ৩ তোলা সোনা (যা নেসাবের কম) এবং ২৫ তোলা রুপা (যা নেসাবের কম) আছে।

এখন ৩ তোলা সোনার বাজারমূল্য ও ২৫ তোলা রুপার বাজারমূল্য যোগ করলে যদি ৫২.৫ তোলা রুপার সমমূল্য হয় বা তারচেয়ে বেশি হয়, তাহলে এই সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ হবে। অর্থাৎ, সম্মিলিতভাবে রুপার নেসাব পূর্ণ হওয়ায় জাকাত আদায় করতে হবে।

এবার দেখুন শরিয়াহর দলিল। ‘মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে,

حَدَّثَنَا إسْمَاعِيلُ بْنُ عَيَّاشٍ ، عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنُ عُبَيْدٍ ، قَالَ : قُلْتُ لِمَكْحُولٍ : يَا أَبَا عَبْدِ اللهِ ، إنَّ لِي سَيْفًا فِيهِ خَمْسُونَ وَمِئَةُ دِرْهَمٍ ، فَهَلْ عَلَيَّ فِيهِ زَكَاةٌ ، قَالَ : أَضِفْ إلَيْهِ مَا كَانَ لَكَ مِنْ ذَهَبٍ وَفِضَّةٍ ، فَإِذَا بَلَغَ مِئَتَيْ دِرْهَمٍ ذَهَبٍ وَفِضَّةٍ ، فَعَلَيْك فِيهِ الزَّكَاةُ.

অর্থ : হজরত ইসমাঈল ইবনু আইয়াশ (রাহি) উবাইদুল্লাহ ইবনু উবাইদ ((রাহি)) হতে বর্ণনা করেন, হজরত উবাইদুল্লাহ ইবনু উবাইদ (রাহি) বলেন, আমি মাকহুল (রাহি)-কে বললাম, ‘হে আবু আবদুল্লাহ! আমার একটি তলোয়ার আছে, যার মধ্যে (রুপার মূল্য হিসাবে) ১৫০ দিরহাম রুপা রয়েছে। এতে কি আমার জাকাত আদায় করতে হবে ?’

উত্তরে হজরত মাকহুল (রাহি) বললেন, ‘তোমার কাছে যত সোনা ও রুপা আছে, সব একত্র করো। যদি একত্র করার পর সেগুলোর মোট মূল্য ২০০ দিরহাম সমান হয়, তাহলে তোমার ওপর জাকাত ফরজ হবে। (অর্থাৎ সোনা ও রুপা মিলিয়ে রুপার নেসাব পূর্ণ হলে জাকাত আদায় করতে হবে।)’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, বর্ণণা ৯৯৭৯,১০৬৪৯; রদ্দুল মুহতার : ২/৩০৩) 

মোটকথা : যদি সোনা ও রুপা একত্রে রুপার নেসাবের সমমূল্যে পৌঁছে যায়, তাহলে সোনা ও রুপাÑউভয়ের জাকাত দিতে হবে। শরিয়াহ দরিদ্র শ্রেণির উপকার ও সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যে নেসাব নির্ধারণে সর্বনিম্ন মানদণ্ড রুপাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

টাকা বা কাগুজে মুদ্রার নেসাব

ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে মুদ্রা হিসেবে মূলত দুটি ধাতব মুদ্রা প্রচলিত ছিল- দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) ও দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা)। এ দুটোই ছিল সেই সময়ের মানদণ্ড মুদ্রা, যার ভিত্তিতে লেনদেন, সম্পদের হিসাব এবং জাকাত নির্ধারিত হতো। পাশাপাশি কমমূল্যের কিছু ধাতব মুদ্রাও ব্যবহৃত হতো, যেগুলোকে ‘ফুলুস’ বলা হতো। তবে অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তি ছিল স্বর্ণ ও রুপা। তখনকার সমাজে প্রায় সবার কাছেই স্বর্ণ ও রুপা উভয় প্রকার মুদ্রা থাকত। ফলে ‘সোনা-রুপা মিলিয়ে নেসাব পূর্ণ হওয়া’ ইত্যাদি মাসআলা আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিত।

কিন্তু আধুনিক যুগে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন সোনা বা রুপা কোনো দেশের মুদ্রা থাকেনি; বরং সর্বত্র প্রচলিত মুদ্রা হলো কাগুজে মুদ্রা (চধঢ়বৎ ঈঁৎৎবহপু) বা নগদ টাকা, যা রাষ্ট্রীয় ঘোষণার ভিত্তিতে লেনদেনে গ্রহণযোগ্য। এর মূল্য ধাতব উপাদানের ওপর নির্ভরশীল নয়।

এই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন জাগে, বর্তমান কাগুজে মুদ্রায় জাকাত আবশ্যক হওয়ার মানদণ্ড বা নেসাব কী হবে এবং কাগুজে মুদ্রার ক্ষেত্রে সোনা ও রুপা মিলানোর মাসআলা কীভাবে প্রযোজ্য হবে?

সমাধান : কাগুজে মুদ্রা যে জাকাতযোগ্য সম্পদের অন্তর্ভুক্ত- এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। 

তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই মুদ্রার নেসাব কোন ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে? কারণ হাদিস শরিফে জাকাতের নেসাব শুধু সোনা ও রুপার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে, কাগুজে মুদ্রার নয়। কেননা সে যুগে কাগুজে মুদ্রার কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

এ কারণে সমকালীন ফকিহগণ এ বিষয়টি নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন এবং কাগুজে মুদ্রার নেসাব নির্ধারণে তিনটি মত পেশ করেছেন, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো। 

কাগুজে মুদ্রার নেসাব বিষয়ে ৩ টি মত

১. সোনার নেসাব প্রযোজ্য হবে

কিছু ফকিহের মতে, কাগুজে মুদ্রার মান সোনার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়া উচিত। কারণ সোনা অধিক স্থিতিশীল ও মূল্যবান সম্পদ। ফলে সোনার নেসাব (২০ মিসকাল = ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ) অনুযায়ী জাকাত নির্ধারণই উত্তম।

২. রুপার নেসাব প্রযোজ্য হবে

অন্য একদল ফকিহ বলেন, জাকাতের উদ্দেশ্য হলো ধনীদের সম্পদ থেকে দরিদ্রদের অধিকার আদায় করা এবং সমাজে আর্থিক ভারসাম্য সৃষ্টি করা। তাই যেখানে একাধিক মানদণ্ডের সম্ভাবনা থাকে, সেখানে দরিদ্রদের পক্ষে যেটি উপকারী, সেটিই গ্রহণ করা হবে। আর রুপার নেসাব (২০০ দিরহাম =  ৫২.৫ তোলা রুপা) তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এটি অধিক সংখ্যক ধনীর ওপর জাকাত ওয়াজিব করে এবং দরিদ্রদের জন্য অধিক কল্যাণ বয়ে আনে। অতএব কাগুজে মুদ্রায় রুপার নেসাব প্রযোজ্য হবে।

৩. সোনা ও রুপার মধ্যে যেটিতে আগে নেসাব পূর্ণ হবে

অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির সম্পদ যদি সোনার নেসাবে পৌঁছে না, কিন্তু রুপার নেসাবে পৌঁছে যায়, তাহলে রুপার ভিত্তিতে জাকাত ফরজ হবে। 

সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত

উপরের তিনটি মতের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য মত হলো- কাগুজে মুদ্রায় রুপার নেসাব প্রযোজ্য হবে। কারণ, জাকাতের মূল লক্ষ্য হলো, সমাজে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন ও দরিদ্রদের সহায়তা। অপরদিকে  রুপার নেসাবের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় এটি সমাজে কল্যাণ বৃদ্ধি করে এবং জাকাতের ব্যাপক প্রয়োগ নিশ্চিত করে। বহু সাহাবি, তাবেঈন ও পরবর্তী যুগের ফকিহ দরিদ্রপক্ষের স্বার্থে রুপার নেসাবকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

অতএব, বর্তমান বাস্তবতায় প্রচলিত টাকা বা কাগুজে মুদ্রার জাকাতের নেসাব নির্ধারণে রুপার নেসাবই অধিক গ্রহণযোগ্য ও শরিয়াহ সম্মত।

মোটকথা, বর্তমান যুগে প্রচলিত কাগুজে মুদ্রা জাকাতযোগ্য সম্পদ। এর নেসাব নির্ধারণে রুপার নেসাবকে মানদণ্ড ধরা হবে। অর্থাৎ, কারও কাছে ৫২.৫ তোলা রুপার বর্তমান বাজারমূল্যের সমপরিমাণ টাকা থাকলে জাকাত আদায় করা ফরজ হবে।

লেখক : মুফতি আবদুর রহমান হোসাইনী

সিনিয়র মুফতি ও মুশরিফ, ফতওয়া বিভাগ, জামিয়া ইসলামিয়া বায়তুস সালাম ঢাকা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow