জাতীয়তাবাদের উত্থান: প্রেক্ষিত পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও ব্রিটেন
পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও ব্রিটেন—তিনটি ভিন্ন ভূগোল, ভিন্ন ইতিহাস ও ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা। তবু সাম্প্রতিক সময়ের রাজনীতিতে একটি অদ্ভুত মিল যেন পরিলক্ষিত হচ্ছে। মূলধারার রাজনীতির প্রতি হতাশা বাড়লে তার ফাঁক গলে ধর্মীয় বা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যে উন্মেষ ঘটে তা যেন পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে তিনটি দেশের ভিন্ন রাজনীতির প্রেক্ষিতে। এই প্রবণতা কেবল নির্বাচনী ফলাফলের হিসাব নয়; এটি সমাজের কিংবা ব্যক্তি-মানসিকতার পরিবর্তনের একটি গভীর ইঙ্গিত। পশ্চিমবঙ্গ: বিকল্পের অভাব ও ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ঘুরপাক খেয়েছে বামপন্থী শাসন, কংগ্রেস এবং পরে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসকে ঘিরে। বাম শাসনের দীর্ঘ যুগ শেষে মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল; সেই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠে আসেন মমতা ব্যানার্জি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ক্ষমতার প্রতি স্বাভাবিক ক্ষয়, দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক ক্লান্তি—সব মিলিয়ে মানুষের একটা বিরাট অংশের মধ্যে অসন্তোষ জন্ম নেয়। সমস্যা হলো, বিকল্প শক্তি হিসেবে ঐতিহ্যগত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কিংবা বামপন্থিদের প্রধান দল সিপিআইএম শক্তভাবে দাঁড়াতে পারেনি। এই শূন
পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও ব্রিটেন—তিনটি ভিন্ন ভূগোল, ভিন্ন ইতিহাস ও ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা। তবু সাম্প্রতিক সময়ের রাজনীতিতে একটি অদ্ভুত মিল যেন পরিলক্ষিত হচ্ছে। মূলধারার রাজনীতির প্রতি হতাশা বাড়লে তার ফাঁক গলে ধর্মীয় বা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যে উন্মেষ ঘটে তা যেন পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে তিনটি দেশের ভিন্ন রাজনীতির প্রেক্ষিতে। এই প্রবণতা কেবল নির্বাচনী ফলাফলের হিসাব নয়; এটি সমাজের কিংবা ব্যক্তি-মানসিকতার পরিবর্তনের একটি গভীর ইঙ্গিত।
পশ্চিমবঙ্গ: বিকল্পের অভাব ও ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান
দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ঘুরপাক খেয়েছে বামপন্থী শাসন, কংগ্রেস এবং পরে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসকে ঘিরে। বাম শাসনের দীর্ঘ যুগ শেষে মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল; সেই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠে আসেন মমতা ব্যানার্জি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ক্ষমতার প্রতি স্বাভাবিক ক্ষয়, দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক ক্লান্তি—সব মিলিয়ে মানুষের একটা বিরাট অংশের মধ্যে অসন্তোষ জন্ম নেয়।
সমস্যা হলো, বিকল্প শক্তি হিসেবে ঐতিহ্যগত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কিংবা বামপন্থিদের প্রধান দল সিপিআইএম শক্তভাবে দাঁড়াতে পারেনি। এই শূন্যতার সুযোগ নেয় ভারতীয় জনতা পার্টি। ধর্মীয় পরিচয় ও জাতীয়তাবাদের ভাষা ব্যবহার করে তারা নিজেদের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। এবং দেশটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিয়ে নেয় অর্থাৎ দীর্ঘদিন থেকে তারাই ক্ষমতায়।
একটা দেশের সব মানুষ রাজনীতির কর্মী না, তারা কাউকে না কাউকে সমর্থন করে নির্বাচনের সময়। আর সেকারণেই এখানে গুরুত্বপূর্ণ সামনে আসে—মানুষ সবসময় আদর্শিক কারণে ডানপন্থার দিকে যায় না; অনেক সময় তারা যায় হতাশা থেকে, “বিকল্প নেই” এই মনোভাব থেকে।
বাংলাদেশ: গণঅভ্যুত্থান ও মৌলবাদের ছায়া
একই রকম অভিজ্ঞতা দেখা গেছে বাংলাদেশে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি জনঅসন্তোষের পর যখন গণআন্দোলন বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখন অনেকেই ভেবেছিল গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবতা দেখিয়েছে—ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে সেখানে দ্রুতই জায়গা করে নেয় ধর্মীয় বা কট্টর রাজনৈতিক শক্তি, মব-সন্ত্রাস।
এই অভিজ্ঞতা তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে নতুন নয়। দুর্বল বিরোধী দল, দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনৈতিক চাপ—এই তিনটি মিললে সমাজ সহজেই পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
ব্রিটেন: মূলধারার ব্যর্থতা ও জাতীয়তাবাদের উত্থান
এই প্রেক্ষাপটে নজর দিলে ব্রিটেনের সাম্প্রতিক রাজনীতিতেও নতুন আভাস দেখা যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) পর ব্রিটেনের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ অস্থিরতা চলছে। অভিবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা সংকট—এসব ইস্যু সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব চাপ তৈরি করেছে।
রাজনীতির ইতিহাস দেখায়—শূন্যতা কখনো দীর্ঘদিন থাকে না। যেখানে কার্যকর বিকল্প নেই, সেখানে আবেগভিত্তিক রাজনীতি জায়গা করে নেয়। পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও ব্রিটেন—এই তিন উদাহরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; এটি কার্যকর প্রতিনিধিত্বের একটি অবিরাম প্রক্রিয়া।
এই অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে দ্রুত উত্থান ঘটছে “রিফোর্ম ইউকে” নামের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির। তারা অভিবাসন ইস্যুকে সামনে এনে “সিস্টেমের বিরুদ্ধে” একটি বিকল্প হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছে। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে দলটির উল্লেখযোগ্য সাফল্য ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়েছে।
লেবার পার্টির সংকট
ব্রিটেনের প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টি দীর্ঘদিন ধরে কনজারভেটিভদের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক নির্বাচনি ফলাফল তাদের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। দলটি সারা ব্রিটেনে হারিয়েছে সহস্রাধিক স্থানীয় প্রশাসনিক আসন, এমনকি দলের নেতৃত্বে পরিচালিত কাউন্সিলও তারা হারিয়েছে। এই সুযোগে রিফর্ম ইউকে বিজয়ী হয়েছে ১৪০০'র বেশী আসনে। অন্তত ১২টি স্থানীয় কাউন্সিল এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে লেবার হারিয়েছে প্রায় ১৫০০ আসন। আর তাই লেবার দলের ভেতরে নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং দলের অভ্যন্তরে সরকারের এমপি-মন্ত্রীরা বর্তমান নেতা স্যার কিয়ার স্টারমারের কৌশল নিয়ে সমালোচনা করছেন, তাঁর পদত্যাগ চাইছেন। যদিও তিনি দল থেকে পদত্যাগের ব্যাপারটা উড়িয়ে দিয়েছেন।
স্টারমারের অবস্থান জটিল। একদিকে তিনি দলকে মধ্যপন্থায় নিয়ে গিয়ে ক্ষমতার যোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করতে চান; অন্যদিকে দলের তৃণমূলের একটি অংশ মনে করে এতে দল তার ঐতিহ্যগত আদর্শ হারাচ্ছে। এই দ্বন্দ্ব লেবার পার্টিকে দুর্বল করে তুলছে—যা জাতীয়তাবাদী শক্তির জন্য সুযোগ তৈরি করছে।
কেন জাতীয়তাবাদ বাড়ছে?
পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ কিংবা ব্রিটেন—এই তিন অঞ্চলের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে কিছু সাধারণ কারণ পাওয়া যায়—
১. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং মধ্যবিত্তের সংকট মানুষকে দ্রুত পরিবর্তন চাওয়ার দিকে ঠেলে দেয়।
২. রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকটের কারণে মানুষ যখন মনে করে মূলধারার দলগুলো তাদের সমস্যার সমাধান দিতে ব্যর্থ, তখন তারা নতুন বা প্রান্তিক শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
৩. পরিচয়ের রাজনীতি—ধর্ম, জাতি বা জাতীয় পরিচয় তথা একটা মোহ কিংবা আত্মপরিচয়ের রাজনীতিই সংকটের সময়ে দ্রুত জনসমর্থন পায়, কারণ এগুলো আবেগকে স্পর্শ করে।
৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবের কারণে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম জাতীয়তাবাদী বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করছে।
ব্রিটেন কি একই পথে যাচ্ছে?
প্রশ্নটি এখানেই—পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি কি ব্রিটেনেও তৈরি হচ্ছে? পুরোপুরি একই পরিস্থিতি বলা যাবে না। কারণ ব্রিটেনে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন এবং গণমাধ্যম সক্রিয়। তবে সতর্কবার্তা রয়েছে। যদি মূলধারার দলগুলো জনগণের বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে যৌক্তিক পদক্ষেপ না নেয়, অর্থাৎ সফলতার বিশ্বাসযোগ্য কোনো আশ্বাস দিতে না পারে, তাহলে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
রাজনীতির ইতিহাস দেখায়—শূন্যতা কখনো দীর্ঘদিন থাকে না। যেখানে কার্যকর বিকল্প নেই, সেখানে আবেগভিত্তিক রাজনীতি জায়গা করে নেয়। পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও ব্রিটেন—এই তিন উদাহরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; এটি কার্যকর প্রতিনিধিত্বের একটি অবিরাম প্রক্রিয়া।
মূলধারার রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন না হলে জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান অব্যাহত থাকবে—ভূগোল ভেদে ভিন্ন রূপে, কিন্তু একই মূল কারণ নিয়ে।
লেখক : ব্রিটেনপ্রবাসী কলামিস্ট।
এইচআর/জেআইএম
What's Your Reaction?