জিয়াউদ্দিন লিটনের ছোটগল্প: অদেখা বৈশাখ

কোনো কারণ ছাড়াই—হয়তো নিছক কৌতূহলেই—একদিন তাকে একটি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম। অচেনা। সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষ। তবু মনে হয়েছিল—এই অচেনার ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে কোনো গল্প। কয়েকদিন পর। একটি নীরব বিকেল। ফোনের স্ক্রিনে হঠাৎ একটি শব্দ জ্বলে উঠল—‘আসসালামু আলাইকুম...।’ শব্দটা যেন খুব আস্তে এসে আমার দরজায় কড়া নাড়ল। আমি একটু থেমে লিখলাম—‘ওয়ালাইকুম আসসালাম... আপনি?’ ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর—‘আমি... মনি।’ কথা শুরু হলো—ধীরে... সতর্কভাবে...‘আপনি আমাকে চেনেন?’‘না, তবে মনে হলো চিনতে পারি।’ওপাশে হয়তো হালকা এক হাসি ছিল—আমি দেখতে পাইনি কিন্তু অনুভব করেছিলাম। দিন কেটে গেল। একদিন সে বলল—‘আমি একটা চাকরি করি... দুটো ছেলে... ওরা দেশের বাইরে।’আমি চুপ করে শুনছিলাম।‘আপনি একা থাকেন?’‘...হ্যাঁ। একদম একা।’এই ‘একা’ শব্দটার পর ওপাশে একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে এসেছিল। আমি কিছু বলিনি। কারণ বুঝেছিলাম—কিছু নীরবতা ভাঙতে নেই। ধীরে ধীরে আমাদের কথাগুলো বদলে গেল—পরিচয় থেকে বিশ্বাসে, আর বিশ্বাস থেকে এক অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতায়। একদিন হঠাৎ—‘একটা কথা বলব?’‘বলুন...’‘আমরা কি দেখা করতে পারি?’আমি থমকে গেলাম।‘এত সহজ?’‘সব পরিচয় কি চো

জিয়াউদ্দিন লিটনের ছোটগল্প: অদেখা বৈশাখ

কোনো কারণ ছাড়াই—হয়তো নিছক কৌতূহলেই—একদিন তাকে একটি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম। অচেনা। সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষ। তবু মনে হয়েছিল—এই অচেনার ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে কোনো গল্প।

কয়েকদিন পর। একটি নীরব বিকেল। ফোনের স্ক্রিনে হঠাৎ একটি শব্দ জ্বলে উঠল—‘আসসালামু আলাইকুম...।’ শব্দটা যেন খুব আস্তে এসে আমার দরজায় কড়া নাড়ল। আমি একটু থেমে লিখলাম—‘ওয়ালাইকুম আসসালাম... আপনি?’

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর—‘আমি... মনি।’ কথা শুরু হলো—ধীরে... সতর্কভাবে...
‘আপনি আমাকে চেনেন?’
‘না, তবে মনে হলো চিনতে পারি।’
ওপাশে হয়তো হালকা এক হাসি ছিল—আমি দেখতে পাইনি কিন্তু অনুভব করেছিলাম।

দিন কেটে গেল। একদিন সে বলল—
‘আমি একটা চাকরি করি... দুটো ছেলে... ওরা দেশের বাইরে।’
আমি চুপ করে শুনছিলাম।
‘আপনি একা থাকেন?’
‘...হ্যাঁ। একদম একা।’
এই ‘একা’ শব্দটার পর ওপাশে একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে এসেছিল। আমি কিছু বলিনি। কারণ বুঝেছিলাম—কিছু নীরবতা ভাঙতে নেই।

ধীরে ধীরে আমাদের কথাগুলো বদলে গেল—পরিচয় থেকে বিশ্বাসে, আর বিশ্বাস থেকে এক অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতায়। একদিন হঠাৎ—
‘একটা কথা বলব?’
‘বলুন...’
‘আমরা কি দেখা করতে পারি?’
আমি থমকে গেলাম।
‘এত সহজ?’
‘সব পরিচয় কি চোখে দেখেই হয়?’
প্রশ্নটা যেন আমার ভেতরে ঢেউ তুলল। তারপর ঠিক হলো—পহেলা বৈশাখ। আমি আগেই সব বলেছিলাম—
‘আমার বয়স, পরিবার... আমার সীমাবদ্ধতা... আমার দরিদ্রতা...’
ওপাশে খুব শান্ত কণ্ঠে উত্তর এসেছিল—‘এসব জেনে কী করব। আমার প্রয়োজন কথা বলার জন্য একজন ভালো মানুষ, আমি সেটি পেয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, সম্মানজনক চেয়ারে বসা মানুষ কখনো কারো ক্ষতি করে না।’
সেদিন প্রথম মনে হয়েছিল—কেউ আমাকে আমার চেয়েও বেশি বিশ্বাস করে।

অবশেষে এলো সেই দিন। সকাল। বাইরে উৎসব—লাল-সাদা, ঢাকের শব্দ, মানুষের ভিড়। আর আমি? বিছানায় শুয়ে আছি। শরীর ভেঙে পড়ছে। উচ্চ রক্তচাপ, দুর্বলতা। ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। সময় এগিয়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত লিখলাম—‘আমি আসতে পারব না।’
শব্দগুলো ছোট ছিল কিন্তু ভেতরে ছিল এক বিশাল ভাঙন। ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। তারপর—‘ঠিক আছে।’
কোনো অভিযোগ নেই। কোনো প্রশ্ন নেই। এই ‘ঠিক আছে’র ভেতরেই একটা বিকেল ভেঙে পড়ল। বিকেলটা কেটে গেল—
দুজন মানুষ, দুটি আলাদা ঘরে। সে হয়তো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল—হালকা সাজে, অপেক্ষা নিয়ে। আর আমি—অসহায় শরীর আর অপরাধবোধ নিয়ে শুয়ে ছিলাম।

রাত। ফোনে আলো জ্বলে উঠল।
‘আপনি বিশ্রাম নিন।’
মাত্র এইটুকুই। কিন্তু বুঝেছিলাম—সে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিল। আমি লিখলাম—‘আরেকদিন দেখা হবে?’
ওপাশে একটু দেরি। তারপর—‘এই শহর যদি আমাদের জন্য কোনো বিকেল না রাখে।’
‘তবে হয়তো অন্য কোনো জীবনে।’
‘আমাদের দেখা হয়ে যাবে।’
আমি স্থির হয়ে গেলাম। স্ক্রিনের আলোয় নিজের অসহায়তাকে দেখতে পেলাম। শেষবার—একটি অনুভূতি ভেসে এলো—‘না-দেখাটাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে সত্যি দেখা।’
ফোনের আলো নিভে গেল।

ঘর অন্ধকার। বাইরে বৈশাখ শেষ। কিন্তু আমার ভেতরে—একটি অসমাপ্ত বিকেল, একটি না-হওয়া দেখা, একটি নীরব সম্পর্ক। আজও জ্বলছে। এক অদেখা বৈশাখের মতো—যেখানে দেখা না হয়েও দুটি মানুষ একবার নিঃশব্দে খুব গভীরভাবে একে অপরকে ছুঁয়ে যায়।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow