জিলহজ মাসের ১০ আমল

হিজরি বর্ষপুঞ্জির সর্বশেষ মাস ‘জিলহজ’। বছর ঘুরে এ-মাস এলে মুমিন হৃদয়ে বয়ে যায় খুশির জোয়ার। হজ ও কোরবানি—একইসঙ্গে দুটি ইবাদত ও দুটি উৎসবের মেলবন্ধন ঘিরে যেন মহান রবের রাশি-রাশি রহমত নেমে আসে ধরার বুকে। রমজান শেষ হতে না হতেই মহাসমারোহ শুরু হয় এ মাসের। মুমিন মাত্রই আঙ্গুলের গিরায় গিরায় গুণতে থাকে, দিন-সপ্তাহ-মাস। চলতে থাকে ইবাদতের পূর্ব প্রস্তুতি ও আয়োজন। কারণ, এ মাসের যে ফজিলত অবহেলা করা বা এড়িয়ে যাওয়া; নিজের প্রতিই অবহেলা বা এড়িয়ে যাওয়ার নামান্তর। পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ যে চার মাস সম্মানিত বলেছেন, ‘জিলহজ’ সেগুলোর অন্যতম। জাহেলি আরবেও এ-মাসকে অতি ‘সম্মানিত’ মনে করা হতো। সেসময়ের মুশরিকরা এ মাসে বিরত থাকতো অন্যায়-অনাচার ও অপরাধমূলক কাজ থেকে। এ-মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো প্রথম দশক। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এই দশদিনের কসম করে বলেছেন,  ‘শপথ ভোরবেলার, ও দশ রাত্রির।’ (সুরা ফাজর: ১-২) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসুল ((সা.)) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই দশ হচ্ছে কোরবানির মাসের দশদিন, বেজোড় হচ্ছে আরাফার দিন আর জোড় হচ্ছে কোরবানির দিন।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৩/৩২৭)  এ-মাসের গুরুত্ব ও

জিলহজ মাসের ১০ আমল

হিজরি বর্ষপুঞ্জির সর্বশেষ মাস ‘জিলহজ’। বছর ঘুরে এ-মাস এলে মুমিন হৃদয়ে বয়ে যায় খুশির জোয়ার। হজ ও কোরবানি—একইসঙ্গে দুটি ইবাদত ও দুটি উৎসবের মেলবন্ধন ঘিরে যেন মহান রবের রাশি-রাশি রহমত নেমে আসে ধরার বুকে। রমজান শেষ হতে না হতেই মহাসমারোহ শুরু হয় এ মাসের। মুমিন মাত্রই আঙ্গুলের গিরায় গিরায় গুণতে থাকে, দিন-সপ্তাহ-মাস। চলতে থাকে ইবাদতের পূর্ব প্রস্তুতি ও আয়োজন। কারণ, এ মাসের যে ফজিলত অবহেলা করা বা এড়িয়ে যাওয়া; নিজের প্রতিই অবহেলা বা এড়িয়ে যাওয়ার নামান্তর।

পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ যে চার মাস সম্মানিত বলেছেন, ‘জিলহজ’ সেগুলোর অন্যতম। জাহেলি আরবেও এ-মাসকে অতি ‘সম্মানিত’ মনে করা হতো। সেসময়ের মুশরিকরা এ মাসে বিরত থাকতো অন্যায়-অনাচার ও অপরাধমূলক কাজ থেকে।

এ-মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো প্রথম দশক। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এই দশদিনের কসম করে বলেছেন,  ‘শপথ ভোরবেলার, ও দশ রাত্রির।’ (সুরা ফাজর: ১-২)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসুল ((সা.)) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই দশ হচ্ছে কোরবানির মাসের দশদিন, বেজোড় হচ্ছে আরাফার দিন আর জোড় হচ্ছে কোরবানির দিন।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৩/৩২৭) 

এ-মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণনা করতে রাসুল (সা.) অন্য হাদিসে বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে জিলহজের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো দিনের আমল নেই’। (সুনানে আবু দাউদ: ২৪৩৮, সহিহ বোখারি: ৯৬৯) 

রাসুলের মজলিসে তার পবিত্র মুখনিঃসৃত এই বাণীর পর থেকে সাহাবিদের ভেতর শুরু হয় আমলের প্রতিযোগিতা। তারা বুঝেছিলেন, এ-মাসে ইবাদতই হওয়া উচিত মুমিন জীবনের প্রধান ও অন্যতম কাজ। 

এখানে কোরআন ও হাদিসের আলোকে জিলহজ মাসের কিছু আমল তুলে ধরা হলো—

হজ ও কোরবানি

জিলহজ মাসের শীর্ষ দুই ইবাদত  হজ ও কোরবানি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা হজের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘কাবাঘর পর্যন্ত পৌঁছানোর সামর্থ্য আছে যার, তার জন্য ‘হজ’ অবশ্য কর্তব্য (ফরজ)। (সুরা আলে-ইমরান: ৯৭)

কোরবানির নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেছেন, ‘অতএব আপনি আপনার রবের উদ্দেশে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন।’ (সুরা কাউসার: ০২)

বেশ কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে ইবাদত দুটো মুসলমানের ওপর আবশ্যক হয়। হজ ফরজ হওয়ার শর্ত ৫ টি। যেমন: মুসলমান হওয়া, জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া, বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, স্বাধীন হওয়া এবং যাতায়াত ও শারীরিক শক্তিতে সামর্থ্যবান হওয়া। কোরবানি আবশ্যক হওয়ারও ক্ষেত্রে উপরিউক্ত শর্তগুলোর সাথে ‍যুক্ত হবে স্থায়ী সম্পদের মালিক হওয়া।

অধিক পরিমাণে তাওবা ও ইস্তিগফার

‘তাওবা ও ইস্তেগফার’ মুমিন জীবনের প্রতি মুহূর্তের ইবাদত ও কর্তব্য। বলা তো যায় না, কখন দুয়ারে এসে হাজির হয় ‘মৃত্যুদূত’। মৃত্যুর জন্য সদা প্রস্তুত থাকাই মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে তাওবা ও ইস্তেগফারের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন, ‘আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা নিসা: ১০৬)

জিলহজের প্রথম দশক যেহেতু দোয়া কবুলের সময় তাই এ সময় তাওবা ও ইস্তেগফারের প্রতি গুরুত্বরূপ করা মুমিন-মুসলমানের কর্তব্য।

নফল রোজা

জিলহজের মাসের রোজা আল্লাহর কাছে বিশেষ প্রিয়। রাসুল (সা.) এ মাস শুরু হতেই রোজা রাখতেন। সাহাবিদের নির্দেশ দিতেন। হজরত হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) প্রতিবছরই প্রথম জিলহজের প্রথম নয়দিন রোজা রাখতেন। (সুনানে নাসায়ি: ২৪১৬)

রাসুল (সা.) বলেছেন, এই দিনগুলোর প্রতিটা দিনের রোজা, এক বছরের রোজার সমতুল্য। আর প্রতিটা রাতের নামাজ শবে কদরের নামাজের সমতুল্য। (সুনানে তিরমিজি: ৭৫৮)

তাকবির ও তালবিয়া পাঠ

অধিক পরিমাণে তাকবির ও তালবিয়া পাঠ এ-মাসের বিশেষ আমলগুলোর একটি। জিলহজ শুরু হতেই রাসুল (সা.) এ আমলে খুব গুরুত্ব দিতেন। সাহাবিদের নির্দেশ দিতেন। তাই এ-মাসে বেশি-বেশি তালবিয়া পাঠ সুন্নত। বিশেষ করে ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর ন্যূনতম একবার এটি পাঠ করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের ওপর ওয়াজিব। তালবিয়া পাঠের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসুল (সা.) বলেন, কোনো ব্যক্তি যখন তালবিয়া পাঠ করে তখন তার ডানে ও বামে পৃথিবীর শেষপ্রান্ত পর্যন্ত যা কিছু আছে যেমন: গাছপালা, মাটি, পাথর ইত্যাদি তার সাথে তালবিয়া পাঠ করতে থাকে। (সুনানে তিরমিজি: ৮২৮, ইবনে মাজাহ: ২৯২১)

রাতের নামাজ বা তাহাজ্জুদ

রাতের নামাজ তথা তাহাজ্জুদের ফজিলত নতুন করে বলার নয়। এ নামাজের সওয়াব ও গুরুত্ব সম্পর্কে সবারই জানা কমবেশি। তবে জিলহজ মাসে তাহাজ্জুদের ফজিলত যেন একটু বেশিই। হাদিসে আছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘এই দিনগুলোর প্রতিটা দিনের রোজা, একবছরের রোজার সমতুল্য। আর প্রতিটা রাতের নামাজ শবে কদরের নামাজের সমতুল্য।’ (সুনানে তিরমিজি: ৭৫৮)

অধিক পরিমাণে জিকির

জিলহজ তো বটেই, বছরের সবকটা মাস কিংবা প্রতিটা দিনেই ‘জিকির’ মুসলমানের ইবাদত। এর মাধ্যমে বান্দা দ্রুত আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে সক্ষম হয়। ফলে অন্তর হয় পরিষ্কার ও পবিত্র। মানসিক হতাশা-ব্যাকুলতা আর জাগতিক অস্থিরতা থেকে মন থাকে নিরাপদ দূরত্বে, সতেজ ও প্রফুল্ল। কেননা, জিকির হলো আল্লাহর স্মরণ। আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব।’ (সুরা বাকারাহ: ১৫২) 

রাসুল (সা.) জিকিরের গুরুত্ব বোঝাতে বলেছেন, ‘যে আল্লাহর জিকির করে আর যে করে না, তাদের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃত।’ (সহিহ বোখারি: ৬৪০৭)

কোরআন তেলাওয়াত

এটি এমন এক ইবাদত যার প্রতিটি হরফে বান্দার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকে অন্তত ১০টি করে নেকি। আল্লাহকে স্মরণ করার সর্বোত্তম মাধ্যম তেলাওয়াত। প্রকৃত মুমিনের আলামত বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহতাআলা কোরআন তেলাওয়াতের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘মুমিন তো তারাই, (যাদের সামনে) আল্লাহকে স্মরণ করা হলে হৃদয় হয় ভীত, যখন তাদের সামনে তার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হয়, তা তখন তাদের ইমানের উন্নতি সাধন করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে।’ (সুরা আনফাল: ০২)

জিলহজ যেহেতু আমলের মাস। এ-মাসের আমলের বিশেষ গুরুত্ব যেহেতু রয়েছে, তাই বেশি-বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা যেতে পারে।

দরুদ পাঠ

একজন মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত ভালো মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ না তার অন্তর রাসুলের ভালোবাসায় বিগলিত হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি গুণের অধিকারী ব্যক্তি ইমানের স্বাদ আস্বাদন করবে। তন্মধ্যে প্রথম হলো, যার কাছে আল্লাহ ও তার রাসুল সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয় হবে। (সহিহ মুসলিম: ৬৭)

মোটকথা, অন্তরে রাসুলের লালন প্রতিটা মুমিনের ইমানেরই অংশ। আর এই ভালোবাসা জাগাতে বেশি পরিমাণে দরুদপাঠের বিকল্প নেই।

জিলহজ এলে বিত্তবান মুসলমানগণ হজে যান, এতে করে সাধারণ মুসলমান যাদের সামর্থ্য নেই তাদের মন ব্যাথায় ভরে ওঠে। তাই বেশি বেশি দরুদ পাঠ করুন। হতে পারে এই ওসিলায় আল্লাহ তাআলা সশরীরে রাসুলের রওজায় দাঁড়িয়ে রাসুলকে সালাম দেওয়ার তাওফিক দিতে পারেন।

দোয়া ও মোনাজাত

পবিত্র কোরআনের সুরা আল-মুমিনের ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ দোয়া ও মোনাজাতের নির্দেশ করে বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’। হাদিসে রাসুল (সা.) ‘দোয়া’কে ইবাদত বলে আখ্যা দিয়েছেন (সুনানে তিরমিজি: ২৯৬৯, ৩২৪৭, ৩৩৭২)

দোয়া হলো, বান্দার অন্তরের চাহিদা আল্লাহর কাছে ব্যক্ত করা। মিনতি জানিয়ে তার থেকে আদায় করে নেওয়া। জিলহজ মাসে আল্লাহ তাআলা বান্দার দোয়া কবুল করেন। বিশেষ করে প্রথম দশক ও আইয়ামে তাশরিকের দিনগুলো। এ সময়ে হাজিগণ হজের কার্যাবলি আদায় করে থাকেন। হজের প্রতিটা স্থানে আল্লাহর দোয়া কবুলের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে যাদের হজ পালনের সামর্থ্য নেই তাদেরও নিরাশ করেননি তিনি। এ দিনগুলোর ওসিলায় তিনি তার সমস্ত বান্দার দোয়া ও চাহিদা পূরণ করেন।

অধিক পরিমাণে সদকা

দান-সদকা যে কোনো সময়ে করা যেতে পারে। তবে জিলহজ মাসের যেহেতু বিশেষ ফজিলত রয়েছে এবং হাদিসে এসেছে ‘আল্লাহর কাছে জিলহজের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো দিনের আমল নেই’, তাই এ-মাসে বেশি-বেশি দান করে অধিক সওয়াবের অধিকারী হওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে ঈদের দিন কোরবানির গোশত থেকে একটা অংশ গরিবদেরে মাঝে সদকা করে দিন। এতে করে ঈদুল আজহার আনন্দ ভাগাভাগি হবে তাদের মাঝেও।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান করো তবে তা উত্তম, আর যদি তোমরা গোপনে দান করো এবং তা অভাবগ্রস্তদের করে থাকো, তবে তাও তোমাদের জন্য আরও উত্তম, অধিকন্তু তিনি তোমাদের কিছু গুনাহ মোচন করে দেবেন, বস্তুত, যা কিছু তোমরা করছো, আল্লাহ তার খবর রাখেন। (সুরা বাকারাহ: ২৭১)

উল্লিখিত আমলগুলো ছাড়াও যত নেক আমল আছে, সবই করা যেতে পারে বরকতময় এ-মাসে। তবে সমস্ত আমল হওয়া চাই সুন্নাহের পদ্ধতিতে। সাহাবিগণ যেভাবে আমল করতেন, সেদিকে লক্ষ্য করে রাসুলের অনুসরণ প্রকৃত মুমিনের কর্তব্য। আবেগ কিংবা অবহেলায় সুন্নাতের পথ থেকে বিদআতে নিমজ্জিত হওয়া গোমরাহি।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow