জিয়া হকের কবিতা: প্রতীকের গভীরতা
সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পরিমণ্ডলে কবি জিয়া হক ব্যতিক্রমী ও বিস্ময়কর উপস্থিতি। তিনি এমন একসময়ে আবির্ভুত হয়েছেন, যখন বারবার উচ্চারিত হচ্ছে যে কবিতা তার সামাজিক কার্যকারিতা হারিয়েছে এবং কবিতা আর গণমানুষের ভাষা নয়। অথচ এই তথাকথিত কবিতাহীন সময়েই জিয়া হকের কবিতা ও গান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। তা এই ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়েছে। ‘হাদির জিন্দাবাদ’, ‘গুলি-টুলি হাদিদের চুলটাও ছেঁড়ে না’, ‘হাদি তুই ফিরে আয়’—এই কবিতা ও সংগীত অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই কোটি কোটি মানুষের আবেগ, ক্ষোভ ও প্রত্যাশার ভাষা হয়ে উঠেছে। শত মিলিয়ন ভিউ এখানে কেবল ডিজিটাল সাফল্যের কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি প্রমাণ করে যে, কবিতা আজও মানুষের জীবনের বাস্তবতা ও সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে সবচেয়ে শক্তিশালী গণভাষায় রূপ নিতে পারে। জিয়া হকের কবিতার প্রধান শক্তি তার কাব্যভাষা ও প্রতীকের গভীরতায়। তিনি ইতিহাস, ধর্ম, সভ্যতা ও সমকালকে এক সুতোয় গেঁথে এমন এক ভাষা নির্মাণ করেছেন, যা একই সঙ্গে আবেগময় ও গভীরভাবে চিন্তাশীল। ‘হাদি সাহারার ঊষর বালুতে আবে জমজম পানি’, ‘হাদি ইতিহাস পাখি আবাবিল মুসার হাতের লাঠি’ কি
সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পরিমণ্ডলে কবি জিয়া হক ব্যতিক্রমী ও বিস্ময়কর উপস্থিতি। তিনি এমন একসময়ে আবির্ভুত হয়েছেন, যখন বারবার উচ্চারিত হচ্ছে যে কবিতা তার সামাজিক কার্যকারিতা হারিয়েছে এবং কবিতা আর গণমানুষের ভাষা নয়। অথচ এই তথাকথিত কবিতাহীন সময়েই জিয়া হকের কবিতা ও গান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। তা এই ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়েছে। ‘হাদির জিন্দাবাদ’, ‘গুলি-টুলি হাদিদের চুলটাও ছেঁড়ে না’, ‘হাদি তুই ফিরে আয়’—এই কবিতা ও সংগীত অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই কোটি কোটি মানুষের আবেগ, ক্ষোভ ও প্রত্যাশার ভাষা হয়ে উঠেছে। শত মিলিয়ন ভিউ এখানে কেবল ডিজিটাল সাফল্যের কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি প্রমাণ করে যে, কবিতা আজও মানুষের জীবনের বাস্তবতা ও সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে সবচেয়ে শক্তিশালী গণভাষায় রূপ নিতে পারে।
জিয়া হকের কবিতার প্রধান শক্তি তার কাব্যভাষা ও প্রতীকের গভীরতায়। তিনি ইতিহাস, ধর্ম, সভ্যতা ও সমকালকে এক সুতোয় গেঁথে এমন এক ভাষা নির্মাণ করেছেন, যা একই সঙ্গে আবেগময় ও গভীরভাবে চিন্তাশীল। ‘হাদি সাহারার ঊষর বালুতে আবে জমজম পানি’, ‘হাদি ইতিহাস পাখি আবাবিল মুসার হাতের লাঠি’ কিংবা ‘হাদি ওমরের অর্ধজাহান মোড়ানো শীতলপাটি’—পঙ্ক্তিগুলো নিছক কোনো স্লোগান নয়। এগুলো হাজার বছরের ইসলামি ইতিহাস, মানবিক সংগ্রাম ও ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষার প্রতীকী পুনর্গঠন। ফররুখ আহমদের পর বাংলা কবিতায় ইসলামি সভ্যতার ঐতিহ্যকে এতটা স্বতঃস্ফূর্ত ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে সমকালীন রাজনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করার দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল। সে কারণেই জিয়া হকের কবিতা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়েও দীর্ঘমেয়াদি সভ্যতামুখী সাহিত্যিক উচ্চারণে রূপ নেয়।
কবিতাগুলোর বিস্তৃত জনপ্রিয়তায় সংগীতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শিল্পী আবু উবায়দার কণ্ঠ জিয়া হকের কবিতাকে এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। ‘হাদির জিন্দাবাদ’ বা ‘হাদি তুই ফিরে আয়’ অনেকের কাছে কেবল গান নয় বরং এক ধরনের উচ্চকণ্ঠ হুংকার। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দীর্ঘসময়ে আন্দোলনের জন্য নতুন ও শক্তিশালী গণসংগীতের অভাব স্পষ্ট ছিল। মানুষকে প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে নিতে হয়েছে পুরোনো গান দিয়েই। সেই শূন্যতায় জিয়া হকের লেখা এবং আবু উবায়দার কণ্ঠ মিলিত হয়ে এক নতুন সাংস্কৃতিক ভাষা নির্মাণ করেছে। দেওয়াল লিখন, আবৃত্তি, শিশুদের কণ্ঠ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত উচ্চারণে এই কবিতা ও গান সত্যিকারের গণসংস্কৃতির রূপ পেয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জিয়া হকের কবিতার সাড়া সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে নজিরবিহীন। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে শত মিলিয়নের বেশি ভিউ অর্জন, রিলস প্ল্যাটফর্মে বিশ্বজুড়ে টপ সার্চে তার নাম উঠে আসা—এসব ঘটনা একজন কবিকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সেনসেশনদেরও পেছনে ফেলে একজন বাংলা কবির এই উত্থান কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি বাংলা কবিতার জন্যও এক গৌরবের মুহূর্ত। এই জনপ্রিয়তা দেখিয়ে দিয়েছে যে, মানুষ এখনো কবিতার সঙ্গে যুক্ত হতে চায়, যদি কবিতা তার জীবনের বাস্তবতা, স্বপ্ন ও সংগ্রামের ভাষা হয়ে উঠতে পারে।
তবে জিয়া হকের এই সাফল্য কোনো হঠাৎ পাওয়া খ্যাতির গল্প নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনা। ১৯৯১ সালের ১৫ ডিসেম্বর মাদারীপুর জেলার শিবচরে জন্ম নেওয়া এই কবি সপ্তম শ্রেণি থেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। দশম শ্রেণিতে পড়াকালীন প্রকাশিত কিশোরকাব্য ‘গন্ধরাজের ডানা’ দেড় হাজার কপি বিক্রি হওয়া প্রতিভার প্রাথমিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত। জাতীয় দৈনিকে তিন হাজারের বেশি লেখা, একাধিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া—সব মিলিয়ে তার সাহিত্যিক যাত্রা শ্রম, অধ্যবসায় ও সময়ের ফসল। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেও লেখালেখিই তার প্রকৃত সাধনা ও আত্মপরিচয়।
এ ধারাবাহিক সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি তিনি আগেই পেয়েছেন। কবি আল মাহমুদের মূল্যায়ন জিয়া হকের সাহিত্যিক সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। আল মাহমুদ উল্লেখ করেছিলেন যে, জিয়া হকের কবিতায় তিনি দেশপ্রেম, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং ধর্মের প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস খুঁজে পেয়েছেন, যা তাঁকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। তরুণ কবিদের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি জিয়া হকের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন। আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে নিঃসন্দেহে বলা যায়, সেই আশাবাদ কেবল সত্য হয়নি বরং নতুন মাত্রা পেয়েছে।
জিয়া হকের কবিতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সাহিত্য এখনো বিপ্লবের ভাষা হতে পারে এবং মানুষের ভেতরের আগুনকে জাগিয়ে তুলতে পারে। ‘হাদির জিন্দাবাদ’ কেবল একটি জনপ্রিয় গান নয়। এটি একটি সময়ের দলিল এবং একটি সাংস্কৃতিক মোড় বদলের স্পষ্ট চিহ্ন। এ কবিতার মধ্য দিয়েই জিয়া হক নিজেকে সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার লেখা আজকের সময়ের সঙ্গে সংলাপ করে এবং একই সঙ্গে আগামী দিনের পথরেখা আঁকে।
এসইউ
What's Your Reaction?