জ্বালানি সংকটে চট্টগ্রাম ফিসারি ঘাটে নোঙর শত শত ট্রলার

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর অস্থিতিশীলতার প্রভাবে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। চট্টগ্রামের ফিসারি ঘাট, দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, এই সংকটের প্রতিফলন হিসেবে বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার নৌকা ও ট্রলার জ্বালানি সংকটে পড়ে সমুদ্রে যেতে পারছে না। ফলে মাছ আহরণ কমে গেছে এবং এর প্রভাব পড়েছে বাজারে, মাছের দাম বেড়েছে। গভীর সাগরে মাছ শিকারে নিয়োজিত বড় স্টিল বডির ফিশিং ভ্যাসেলগুলোও অচল হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি না হওয়ায় লবণাক্ততা বেড়ে গেছে, সাগরে জেলি ফিশের প্রভাব বেড়েছে, আর মাছের পরিমাণ কমেছে। এ অবস্থায় ঘাটের দৃশ্য বিপরীতচিত্রের সারি সারি ট্রলার নোঙর করে বসে আছে। সব প্রস্তুতি থাকলেও নেই একমাত্র প্রয়োজনীয় জ্বালানি ডিজেল। ফলে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও নৌকার সংখ্যা কমেছে, এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে মাছের দামও বেড়েছে। নগর ও উপকূলীয় উপজেলার বিভিন্ন ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, জেলেরা কার্যত কর্মহীন অবস্থায় দিন পার করছেন। স্বাভাবিক সময়ে ঘাটে যে পরিমাণ ট্রলার থাকে, এখন তার অনেকাংশই স্থবির। ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ, কেউ বসে আছে, কেউ ছোটখাটো রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। কেউ জাল মেরামত করছেন, কেউ ট্রলারের ইঞ্জি

জ্বালানি সংকটে চট্টগ্রাম ফিসারি ঘাটে নোঙর শত শত ট্রলার

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর অস্থিতিশীলতার প্রভাবে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। চট্টগ্রামের ফিসারি ঘাট, দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, এই সংকটের প্রতিফলন হিসেবে বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার নৌকা ও ট্রলার জ্বালানি সংকটে পড়ে সমুদ্রে যেতে পারছে না। ফলে মাছ আহরণ কমে গেছে এবং এর প্রভাব পড়েছে বাজারে, মাছের দাম বেড়েছে।

গভীর সাগরে মাছ শিকারে নিয়োজিত বড় স্টিল বডির ফিশিং ভ্যাসেলগুলোও অচল হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি না হওয়ায় লবণাক্ততা বেড়ে গেছে, সাগরে জেলি ফিশের প্রভাব বেড়েছে, আর মাছের পরিমাণ কমেছে। এ অবস্থায় ঘাটের দৃশ্য বিপরীতচিত্রের সারি সারি ট্রলার নোঙর করে বসে আছে। সব প্রস্তুতি থাকলেও নেই একমাত্র প্রয়োজনীয় জ্বালানি ডিজেল। ফলে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও নৌকার সংখ্যা কমেছে, এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে মাছের দামও বেড়েছে।

নগর ও উপকূলীয় উপজেলার বিভিন্ন ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, জেলেরা কার্যত কর্মহীন অবস্থায় দিন পার করছেন। স্বাভাবিক সময়ে ঘাটে যে পরিমাণ ট্রলার থাকে, এখন তার অনেকাংশই স্থবির। ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ, কেউ বসে আছে, কেউ ছোটখাটো রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। কেউ জাল মেরামত করছেন, কেউ ট্রলারের ইঞ্জিন পরিষ্কার করছেন। অথচ এই সময়টিতে গভীর সাগরে মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত থাকতেন তারা।

চট্টগ্রামে কয়েক হাজার মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার ট্রলার কয়েকশ। এসব ট্রলারে প্রায় দুই লাখ জেলে ও শ্রমিক কাজ করেন। একটি গভীর সমুদ্রগামী ট্রলারের ইঞ্জিনের আকার অনুযায়ী এক হাজার থেকে দুই হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন। সাধারণত একবার জ্বালানি নিয়ে একটি ট্রলার ২৫–২৮ দিন সমুদ্রে থাকে। তবে বর্তমানে যে পরিমাণ জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে, তা দিয়ে ১২–১৪ দিনের বেশি সাগরে থাকা সম্ভব নয়। ফলে অনেক ট্রলার মালিক ট্রলার সাগরে পাঠাচ্ছেন না।

ফিলিং স্টেশন মালিক ও ডিলাররা জানাচ্ছেন, চাহিদার তুলনায় তারা অনেক কম জ্বালানি পাচ্ছেন। অগ্রিম টাকা জমা দিলেও প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। উদাহরণস্বরূপ, এক লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৪০ হাজার লিটার বা তারও কম। এই সংকটের মূল কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা পেট্রলিয়াম থেকে কম সরবরাহ পাওয়া। 

ট্রলার মালিকরা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক ট্রলার ঘাটে বসে আছে। কিছু ট্রলার এক সপ্তাহ আগে সমুদ্রে গেছে, তবে সেগুলো ফিরে এসে আবার সাগরে যেতে পারবে কিনা তা অনিশ্চিত। তেল না থাকায় ট্রলার বসে থাকলে লোকসান হচ্ছে এবং জেলেদের আয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তেলের দাম বেড়েছে, আবার পাওয়া গেলেও পর্যাপ্ত নয়।

ফিশিং বোট মালিক সমিতি সূত্র জানায়, বঙ্গোপসাগরে বিচরণ করা ফিশিং ট্রলি সমুদ্রে মাছের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। ট্রলিগুলো নাবিকদের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং রাডারের সহায়তায় মাছের অবস্থান নির্ধারণ করে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ধরে ফেলে। এতে মা ও বাচ্চা মাছ ধ্বংস হয়ে প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

ফিশিং ট্রলারের ব্যবসায়ী ফয়সাল হাবীব বলেন, কোনো বোট ১৮শ থেকে ২ হাজার লিটার, বড়গুলো সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার লিটার তেল নিয়ে সাগরে যায়। এখন এত তেল দেওয়া হচ্ছে না। তাই অনেক মালিকেরা সাগরে নামাচ্ছে না। কিছু দিরদ্র মানুষ এ পেশা ছাড়া অন্য কোনো পেশায় মানিয়ে নিতে পারছে না, তাই তারা যাচ্ছে সাগরে। পেটের দায়ে ঝুঁকি নিয়ে সাগরে যাচ্ছেন তারা।

এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয় আরেকটি দুশ্চিন্তা। ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা, যা মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও প্রজনন নিশ্চিত করার জন্য। জেলেরা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটে কাজ বন্ধ, তার ওপর দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা আসছে সামনে সব মিলিয়ে তারা চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

মৎস্য খাত সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, বছরে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে প্রায় ১৪৮ দিন মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রের ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা, মা ইলিশ রক্ষা কর্মসূচির ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, অভয়ারণ্যে মাছ ধরা বন্ধ, জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি। এসব কারণে বছরের একটি বড় সময় জেলেরা মাছ ধরতে পারেন না। বাকি সময় মাছ ধরে যে আয় হয়, তা দিয়েই পুরো বছর সংসার চালাতে হয়। এখন যদি সেই সময়েও জ্বালানি সংকটের কারণে মাছ ধরতে না পারেন, তাহলে জীবিকা বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

এই সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলছে জেলেদের পরিবারে মাসিক খরচ, পরিবারের আয়, ছেলেমেয়েদের শিক্ষা ও পড়াশোনা। মাসিক কিস্তি রয়েছে অনেকের। বেশির ক্ষেত্রে ক্ষতির মুখে পড়তে হয় কর্মজীবী জেলেদের। মালিক পক্ষ আয় থাকলে লাভবান হয়, না হলে লোকসান। তাদের মাসিক ও বছর আয়ে ভালো লাভ নেই।

জেলে শুক্কুর বলেন, আমরা তো দিনমজুরের মতো চাকরি করি, পেটের দায়ে কষ্ট। এত টাকা আয় নেই যে এক সপ্তাহ বসে থাকলে বউ-বাচ্চা চলবে, এক মাস বসে থাকলে লোন নিতে হবে, পরিবার চালাতে এখন খরচ বেশি।

ফিসারি ঘাটের রতন বলেন, আগে একবার তেল নিয়ে গেলে প্রায় এক মাস সাগরে থাকতে পারতাম, কিন্তু এখন যে তেল পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে ১০–১২ দিনের বেশি থাকা যাবে না। এত কম সময় সাগরে থেকে খরচ ওঠানো সম্ভব না, তাই অনেক ট্রলার সাগরে যাচ্ছে না।

একই কথা বলছেন জেলে শাহাজাহান। তিনি বলেন, কয়েকদিন ধরে ট্রলার ঘাটে বসে আছি। তেল না পেলে সমুদ্রে যাওয়া যাবে না। সামনে আবার মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে আরও বিপদে পড়তে হবে। 

আরেক জেলে বলেন, তেল পাওয়া গেলেও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। খরচ বেড়ে গেছে, কিন্তু মাছ আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

তেল নিয়ে তালবাহানা ও জটিলতা শুরু হলেও সরকার বারবার ঘোষণা করেছেন যে দেশে কোনো সংকট নেই। তবে সরেজমিনে দেখা চিত্র ভিন্ন। সরকারি সংস্থাগুলো সিন্ডিকেট ও অবৈধ মজুদের কার্যক্রম ভাঙতে মাঠে রয়েছে। নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল অবৈধ তেল উদ্ধার করা হয়েছে। দেশীয় কোনো সমস্যা নয়, এটি ন্যাশনাল লেভেলের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা নেতৃত্বে সোমবার (৩০ মার্চ) সলিমপুরের সিটি আবাসিক গেট সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ২৫ হাজার লিটার অবৈধ ডিজেল উদ্ধার করেছেন।

এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষকে জিম্মি করে ব্যবসা করছে, তারা ব্যবসায়ী নয় অপরাধী। তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। এ পর্যন্ত প্রায় ১০টি জাহাজ এসেছে এবং আজ সিঙ্গাপুর থেকে একটি জাহাজ রওনা হয়েছে, যাতে প্রায় ৩০ হাজার টন ডিজেল রয়েছে।

তিনি আরও সতর্ক করেন, পর্যাপ্ত অকটেন, পেট্রল ও ডিজেল মজুদ রয়েছে। অতিরিক্ত তেল মজুদ করা দরকার নেই। স্বাভাবিকভাবে সংগ্রহ করুন। কেউ অতিরিক্ত মজুদ করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসন জানায়, জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও অভিযান চালানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত জেলায় ৯৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রায় ৪–৪.৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং ১৮–২০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রশাসন বলছে, অবৈধ মজুদ ও অতিরিক্ত দামে জ্বালানি বিক্রির বিরুদ্ধে অভিযান ভবিষ্যতেও জোরদারভাবে চলবে।

চট্টগ্রাম বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন কালবেলাকে বলেন, জ্বালানি সংকট শুধু মৎস্য খাতে নয়, সব সেক্টরেই প্রভাব ফেলছে। আমরা নিজেরাই অভিযান চালাতে পারছি না তেলের কারণে। নানা সমস্যা সব জায়গায় দেখা দিয়েছে। এটা ন্যাশনালি সমস্যা এবং মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর মাছের প্রজনন মৌসুমে সরকার মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এ সময় জেলেরা সরকারিভাবে চাল, ডালসহ সহায়তা পেয়ে থাকেন। সরকারি সহায়তা চালু আছে। চাল, ডালসহ নানা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। আমরা জেলেদের পাশে আছি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow