ঝুলে থাকা নতুন রিফাইনারি বাস্তবায়নে আরও এক ধাপ এগোলো বিপিসি

১৩ বছর ঝুলে থাকা নতুন রিফাইনারি নির্মাণে আরও এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার ইআরএল-২ প্রকল্প বাস্তবায়নে এবার পরামর্শক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে তরল পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন বিপণন ও নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানটি। ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শরীফ হাসনাত জাগো নিউজকে বলেন, ‘মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল-২)’ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট (পিএমসি) নিয়োগে ২৫ মে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বিপিসি।’ তিনি বলেন, ‘১৫ দিনের মধ্যে প্রস্তাব গ্রহণ করে, শর্টলিস্ট যাচাই-বাছাই করে বাছাই করা আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিস্তারিত প্রস্তাব চাওয়া হবে। আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পিএমসি নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।’ এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদন (জিও) দেয় সরকার। প্রাক্কলিত ব্যয় বেশি থাকলেও এখন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ হাজার কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার ৬০ শতাংশ অর্থায়ন করবে এবং বিপিসি অর্থায়ন করবে ৪০ শতাংশ। প্রকল্পটি বাণিজ্যি

ঝুলে থাকা নতুন রিফাইনারি বাস্তবায়নে আরও এক ধাপ এগোলো বিপিসি

১৩ বছর ঝুলে থাকা নতুন রিফাইনারি নির্মাণে আরও এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার ইআরএল-২ প্রকল্প বাস্তবায়নে এবার পরামর্শক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে তরল পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন বিপণন ও নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।

ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শরীফ হাসনাত জাগো নিউজকে বলেন, ‘মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল-২)’ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট (পিএমসি) নিয়োগে ২৫ মে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বিপিসি।’

তিনি বলেন, ‘১৫ দিনের মধ্যে প্রস্তাব গ্রহণ করে, শর্টলিস্ট যাচাই-বাছাই করে বাছাই করা আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিস্তারিত প্রস্তাব চাওয়া হবে। আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পিএমসি নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।’

এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদন (জিও) দেয় সরকার। প্রাক্কলিত ব্যয় বেশি থাকলেও এখন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ হাজার কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার ৬০ শতাংশ অর্থায়ন করবে এবং বিপিসি অর্থায়ন করবে ৪০ শতাংশ। প্রকল্পটি বাণিজ্যিক অপারেশন শুরুর পর থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যয় উঠে আসবে।

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। অথচ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এর সক্ষমতা বাড়ানো যায়নি। প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণ করে দেশে পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন ও বিপণন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

ইআরএল-২ ঝুলে আছে ১৩ বছর

স্বাধীনতার ৪১ বছর পরে ২০১২ সালে ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২’ প্রকল্পটি হাতে নেয় বিপিসি। ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি। প্রকল্পটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইআরএলের পাশেই বাস্তবায়ন হওয়ার কথা।

বিপিসি সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৬ সালে নগরীর গুপ্তখাল এলাকায় ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর বর্তমান প্ল্যান্ট স্থাপিত হয়। ১৯৬৮ সালের ৭ মে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে এই রিফাইনারি। ফ্রান্সের টেকনিপ প্ল্যান্টটি নির্মাণ করে। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক ১৫ লাখ টন পেট্রোলিয়াম ক্রুড পরিশোধন করার সুবিধা রয়েছে।

পরবর্তীসময়ে জ্বালানি সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাড়াতে ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান স্থাপনার মধ্যে ৩০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতার ‘ইনস্টলেশন অব ইআরএল ইউনিট-২’ প্রকল্পটি হাতে নেয় বিপিসি। শুরুর দিকে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয় ধরা হলেও পরবর্তীসময়ে ২০১৬ সালে একাধিকবার সংশোধিত হয়ে ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের ফিড কন্ট্রাক্টর হিসেবে ফ্রান্সের টেকনিপকে নিয়োগ দেওয়া হয়। টেকনিপ প্রকল্পটির (ইআরএল-২) ডিজাইন সম্পন্ন করে।

ইআরএল-২

প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট (পিএমসি) হিসেবে নিয়োগ পায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড (ইআইএল)। ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করে বিপিসি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর উপস্থিতিতে চুক্তি সই অনুষ্ঠান হয়। ওইদিন মন্ত্রী বলেছিলেন, পরবর্তী বছরের মধ্যেই ইআরএল-২ প্রকল্পের ভৌত কাজ শুরু হবে। কিন্তু দীর্ঘ ১০ বছরের বেশি সময় পার হলেও প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

বারবার বেড়েছে ব্যয়

এর মধ্যে সময় গড়ানোর কারণে প্রকল্প ব্যয় আরও বেড়ে যায়। আবারও সংশোধন করে ২০২২ সালের শেষের দিকে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ৭০ শতাংশ জিওবি এবং ৩০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব অর্থ ব্যয় করার প্রস্তাব করা হয়।

এতে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি সরকারি জিওবি খাত থেকে ১৬ হাজার ১৪২ কোটি ৯৯ হাজার টাকা ঋণ হিসেবে অনুমোদন দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। অবশিষ্ট ৬ হাজার ৯১৬ কোটি ৯২ লাখ ৯৩ হাজার টাকা ব্যয় বিপিসির নিজস্ব অর্থায়ন থেকে মেটানোর কথা ছিল।

আরও পড়ুন

ইআরএল-২ প্রকল্পের ব্যয় কমলো ১২ হাজার কোটি টাকা
ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটে যুক্ত হচ্ছে এস আলম
আলোর মুখ দেখছে ইস্টার্ন রিফাইনারির ২য় ইউনিট, খরচ ২৩ হাজার কোটি

২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে প্রকল্প প্রস্তাবনাটি ফের সংশোধন করে প্রকল্প ব্যয় ২৩ হাজার ৭৩৬ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ হিসেবে জিওবি ফান্ড থেকে ১৬ হাজার ৬৩৫ কোটি ২৬ লাখ ৭৯ হাজার এবং বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩০ শতাংশ হিসেবে ৭ হাজার ১শ কোটি ৮৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা অর্থায়নের একটি প্রস্তাবনা অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় জ্বালানি বিভাগ।

প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষমাণ অবস্থায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে প্ল্যান্টটি নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে সমালোচিত শিল্পগ্রুপ এস আলম। ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে সমঝোতা স্মারকের একটি প্রস্তাবনা জমা দেয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বদলে যায় চিত্র। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে ইআরএল-২ প্রকল্পটি আবারও নিজস্ব ব্যবস্থায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় বিপিসি।

গত ১১ আগস্ট ‘মর্ডানাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)’ নামে পুনর্গঠিত ডিপিপি জ্বালানি ও খনিজ বিভাগে পাঠিয়েছে বিপিসি। নতুন ডিপিপিতে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৪৩ হাজার ৮৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

ইস্টার্ন রিফাইনারিইস্টার্ন রিফাইনারি

এর মধ্যে সরকারি অর্থায়নে ঋণ হিসেবে ৬০ শতাংশ এবং অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব আয় থেকে বহন করার কথা বলা হয়। সে হিসেবে প্রাক্কলিত ব্যয়ের ২৫ হাজার ৮৫২ কোটি ৫১ লাখ টাকার জিওবি এবং অবশিষ্ট ১৭ হাজার ২৩৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা বিপিসি বহন করবে বলে ওই সময়ের বিপিসি চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

পরে দুই দফায় কাটছাঁট করে বর্তমানে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩১ হাজার কোটি ৫৭ লাখ টাকা। মেয়াদ ২০৩০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত।

ইআরএল-২ চালু হলে কাটবে জ্বালানির অনেক সংকট

ইআরএল-২ এর মাধ্যমে ফিনিশড প্রডাক্ট হিসেবে এলপিজি, গ্যাসোলিন ইউরো-৫, জেট এ-১, ডিজেল ইউরো-৫, গ্রুপ-৩ বেজ অয়েল, ফুয়েল অয়েল, বিটুমিন ও সালফার পাওয়া যাবে।

মূলত বাংলাদেশে রিফাইনারি বা পরিশোধন কারখানার সক্ষমতা কম থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমে গেলেও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কিনে মজুত করা সম্ভব হয় না। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি স্থানীয় বাজারে অর্থাৎ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকায় তা পরিশোধন করে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হলে এ খাতে একদিকে যেমন আমদানি বাবদ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হতো অন্যদিকে আমদানিনির্ভরতা কমতো।

কিন্তু আমাদের রিফাইনারি বা পরিশোধন কারখানার সক্ষমতা কম থাকায় ১৫ লাখ টনের বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করা সম্ভব হয় না।

নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে বছরে ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করা যাবে এবং দেশের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদার ৪৫-৫০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে ক্রুড অয়েল ব্লেন্ডিং সুবিধা থাকায় জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যারেলপ্রতি ১৮-১৯ ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

ইআরএল সূত্রে জানা যায়, ইআরএল-২ প্রকল্পটি চালু হলে ইআরএলের দুই ইউনিট মিলিয়ে অপরিশোধিত তেল পরিশোধন ক্ষমতা প্রতি বছর দাঁড়াবে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে। এতে তখন মোট চাহিদার ৭৫ শতাংশ মেটানো সম্ভব হবে।

এমডিআইএইচ/এএসএ/এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow