টঙ্গীর সাপ্তাহিক পশু-পাখির হাট থেকে যা যা কিনবেন

সব সময়ই মানুষের কোলাহল আর যানবাহনের হর্নের শব্দে মুখরিত থাকে পুরো এলাকা। পোশাকের দোকান থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার—সবখানেই ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম, হকারদের হাঁকডাক আর মানুষের ব্যস্ততায় যেন এক মুহূর্তের জন্যও থামে না কোলাহল। ব্যস্ত সড়কগুলোতে মানুষের ভিড় এতটাই বেশি থাকে যে, স্বাভাবিকভাবে হাঁটাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তবে রোববার এলে এই চেনা দৃশ্যপটে যোগ হয় একেবারেই ভিন্ন এক শব্দ। চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে ভেসে আসে পাখির কিচিরমিচির, হাঁসের ডাক আর কবুতরের ডানা ঝাপটানোর শব্দ। যা পথচারী ও ক্রেতাদের মুগ্ধ করে। ঢাকা ও গাজীপুরের মাঝামাঝি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ টঙ্গীতে অবস্থিত এই সাপ্তাহিক পশু-পাখির হাট। উত্তরার আব্দুল্লাহপুর সেতু পার হলেই শুরু হয় টঙ্গীর ব্যস্ত এলাকা। আর প্রতি রোববার সেই ব্যস্ততার মধ্যেই বসে এই ব্যতিক্রমী হাট। এটি অনেকের কাছে হাঁসের হাট হিসেবে বিশেষ পরিচিত হলেও এখানে দেখা মেলে নানা প্রজাতির পাখি ও বিভিন্ন প্রাণীর। কেউ পছন্দের পাখি কিনতে আসেন, কেউ নতুন কোনো প্রজাতি দেখতে, আবার কেউ শুধুই পাখিদের কলকাকলিতে কিছুটা সময় কাটাতে। ছোট-বড় খাঁচায় থাকা পাখিদের ডাক, ক্রেতাদের দরদাম আর বি

টঙ্গীর সাপ্তাহিক পশু-পাখির হাট থেকে যা যা কিনবেন

সব সময়ই মানুষের কোলাহল আর যানবাহনের হর্নের শব্দে মুখরিত থাকে পুরো এলাকা। পোশাকের দোকান থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার—সবখানেই ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম, হকারদের হাঁকডাক আর মানুষের ব্যস্ততায় যেন এক মুহূর্তের জন্যও থামে না কোলাহল। ব্যস্ত সড়কগুলোতে মানুষের ভিড় এতটাই বেশি থাকে যে, স্বাভাবিকভাবে হাঁটাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তবে রোববার এলে এই চেনা দৃশ্যপটে যোগ হয় একেবারেই ভিন্ন এক শব্দ। চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে ভেসে আসে পাখির কিচিরমিচির, হাঁসের ডাক আর কবুতরের ডানা ঝাপটানোর শব্দ। যা পথচারী ও ক্রেতাদের মুগ্ধ করে।

ঢাকা ও গাজীপুরের মাঝামাঝি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ টঙ্গীতে অবস্থিত এই সাপ্তাহিক পশু-পাখির হাট। উত্তরার আব্দুল্লাহপুর সেতু পার হলেই শুরু হয় টঙ্গীর ব্যস্ত এলাকা। আর প্রতি রোববার সেই ব্যস্ততার মধ্যেই বসে এই ব্যতিক্রমী হাট। এটি অনেকের কাছে হাঁসের হাট হিসেবে বিশেষ পরিচিত হলেও এখানে দেখা মেলে নানা প্রজাতির পাখি ও বিভিন্ন প্রাণীর। কেউ পছন্দের পাখি কিনতে আসেন, কেউ নতুন কোনো প্রজাতি দেখতে, আবার কেউ শুধুই পাখিদের কলকাকলিতে কিছুটা সময় কাটাতে। ছোট-বড় খাঁচায় থাকা পাখিদের ডাক, ক্রেতাদের দরদাম আর বিক্রেতাদের হাঁকডাকে হাটজুড়েই তৈরি হয় এক ভিন্ন আবহ।

টঙ্গী সেতু পার হলেই ময়মনসিংহ রোডের সড়কঘেঁষা এলাকায় চোখে পড়ে দেশি মুরগির সারি। রাস্তার পাশে বসে আছেন একের পর এক বিক্রেতা। পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও দেখা যায় মুরগি নিয়ে বসে থাকতে। কারো সামনে খাঁচায় সাজানো দেশি মুরগি, আবার কারো কাছে রয়েছে মুরগির বাচ্চা। একটু এগিয়ে গেলেই খাঁচায় রাখা কোয়েল পাখির দেখা মেলে। কোথাও আবার হাঁস ও দেশি মুরগির ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। পথচারীদের অনেকেই থেমে এসব পাখি ও প্রাণী দেখছেন, কেউ করছেন দরদাম, আবার কেউ কিনে নিচ্ছেন পছন্দেরটি।

bird

এভাবে দেখতে দেখতে সামনে এগোলেই পূর্বপাশে চোখে পড়ে পশু-পাখির বিশাল মেলা। যেন ব্যস্ত সড়কের পাশেই গড়ে উঠেছে অন্যরকম এক জগৎ। কেউ খাঁচাভর্তি কবুতর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, কেউবা খরগোশ নিয়ে বসেছেন। এর মাঝেই হঠাৎ চোখে পড়ে এক কিশোরের হাতে থাকা টিয়া পাখিকে ঘিরে মানুষের জটলা। রঙিন টিয়াটিকে দেখতে ছোট-বড় অনেকেই ভিড় করেছেন। কেউ হাতে নিয়ে দেখছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ পাখিটির দাম নিয়ে বিক্রেতার সঙ্গে কষাকষি করছেন।

একটু সামনে যেতেই দেখা মেলে ময়না পাখি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক বিক্রেতার। এখানেও ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড়। এই সারিতেই রয়েছে বিড়াল, কবুতর, খরগোশ, কোয়েল, লাভবার্ডসহ নানা জাতের দেশি ও বিদেশি পাখি ও প্রাণী। প্রতিটি খাঁচার সামনেই যেন আলাদা আলাদা গল্প। কোথাও ক্রেতার দরদাম, কোথাও বিক্রেতার হাঁকডাক, আবার কোথাও দর্শনার্থীদের কৌতূহলী চোখ।

শুধু পাখি ও প্রাণীই নয়, হাটে রয়েছে রঙিন মাছেরও সমাহার। একটু সামনে এগোলেই দেখা যায় ছোট ছোট বাক্স ও পাত্রে পানি ভরে রাখা হয়েছে নানা রঙের মাছ। স্বচ্ছ পানির ভেতর রঙিন মাছগুলোর ছোটাছুটি সহজেই পথচারীদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। এসব মাছ মূলত বাসাবাড়ি কিংবা অফিসের অ্যাকুয়ারিয়াম সাজানোর জন্য বিক্রি করা হয়। মাছের দোকানের সামনেও দেখা যায় ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড়।

bird

এরপর ডানদিকে চোখ ফেরাতেই যেন একেবারে ভিন্ন দৃশ্য। সেখানে দেখা মেলে হাঁসের বিশাল এক রাজ্য। দেশি-বিদেশি নানা জাতের হাঁস নিয়ে সারি সারি বসে আছেন ব্যবসায়ীরা। কোনো হাঁস শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে, আবার কোনোটি ডাকাডাকি ও ডানা ঝাপটাচ্ছে। একপাশে কবুতর, টিয়া, ময়না, কোয়েলসহ নানা পাখির ডাকাডাকি; অন্যপাশে হাঁসের ডাক আর ডানা ঝাপটানোর শব্দ। সব মিলিয়ে পুরো হাট যেন এক জীবন্ত শব্দের মেলায় পরিণত হয়েছে।

মহাসড়কের পাশেই খাঁচায় সাদা রঙের কয়েকটি মুরগি নিয়ে বসে আছেন এক তরুণ। ব্যস্ত সড়কের পাশে এমন অস্বাভাবিক রঙের মুরগি দেখে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল তৈরি হয় পথচারীদের মধ্যে। আমিও কৌতূহল নিয়ে তার কাছে গিয়ে কথা বলি। জানা যায়, এটি ইউরোপিয়ান শর্ট সিল্কি জাতের মুরগি। যার বয়স এক থেকে দেড় মাস হবে। বিক্রেতার নাম মোহাম্মদ ফেরদৌস হাসান, বাড়ি জামালপুর। বর্তমানে তিনি ঢাকার নতুন বাজার এলাকায় থাকেন এবং ইউনাইটেড গ্রুপে চাকরি করেন। দীর্ঘদিন ধরে শখের বশে কবুতরসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জাতের পাখি পালন করে আসছেন। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের দিকে তার সংগ্রহে আরও অনেক ধরনের পাখি ছিল। তবে গত এক বছর ধরে চাকরির ব্যস্ততার কারণে পাখিগুলোকে আগের মতো সময় দিতে পারছেন না। ফলে ধীরে ধীরে পাখির সংখ্যা কমিয়ে এনেছেন তিনি।

মোহাম্মদ ফেরদৌস হাসান বলেন, ‌‘ছোটবেলা থেকেই পাখি পালনের প্রতি আমার আগ্রহ ও শখ রয়েছে। অনেক আগে থেকেই কবুতরসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জাতের পাখি পালন করে আসছি। চাকরির কারণে আগের মতো সময় দিতে পারছি না। তাই ধীরে ধীরে পাখির সংখ্যা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছি। টঙ্গী হাটে এক খাঁচা ইউরোপিয়ান শর্ট সিল্কি মুরগি বিক্রি করার জন্য নিয়ে এসেছি। এগুলোর এক জোড়া দাম ১ হাজার ২০০ টাকা দাম চাচ্ছি। ৮০০ টাকার দাম হলে বিক্রি করে দেব।’

bird

ফেরদৌসের মতে, ‘পাখি পালন করে লাভ করা যায়, তবে এর সঙ্গে অনেক ঝুঁকিও রয়েছে। খাবার, পরিচর্যা ও রোগবালাইসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত খেয়াল রাখতে হয়। ব্যবসা হিসেবে নিলে ঝুঁকিটা আরও বেশি মনে হয়। তাই আমি এটাকে পুরোপুরি পেশা বা ব্যবসা হিসেবে নিতে চাই না। চাকরির পাশাপাশি যতটুকু সময় দিতে পারি, শখের মতো করেই পাখি পালন করে যেতে চাই।’

হাটে ঘোরাঘুরির ফাঁকে হঠাৎ চোখে পড়ে তিনজন রিকশা থেকে একটি বাক্স নিয়ে নামছেন। রিকশা থেকে নামার পর তারা যখন বাক্সটি খুলে বিড়াল দুটিকে বের করেন; তখন মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে ভিড় জমে যায়। ক্রেতা-বিক্রেতার পাশাপাশি দর্শনার্থীরাও বিড়াল দুটিকে দেখতে এগিয়ে আসেন। কেউ দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছেন, কেউ আবার কাছে গিয়ে বিড়ালগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে দেখছেন। কেউবা আবার দামও জানছেন। এত সুন্দর বিড়াল দেখে আমিও কৌতূহলী হয়ে তাদের কাছে এগিয়ে যাই।

কিছুক্ষণ কথা বলার পর জানা যায়, শখের বশে পোষা দুটি বিড়াল তারা বিক্রি করতে আনছেন। বিড়াল দুটির মধ্যে একটি স্কটিশ ফোল্ড এবং অন্যটি পারশিয়ান জাতের। তিনজনের মধ্যে একজনের নাম সাইদ, পেশায় একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। উত্তরা ১৩ নম্বরে বসবাস করেন। ২০২৪ সালে ভাগনির শখ পূরণ করতে স্কটিশ ফোল্ড এবং পারশিয়ান জাতের চারটি বিড়াল কিনে আনেন। বাচ্চা দেওয়ার ফলে ধীরে ধীরে বিড়ালের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে তার বাসায় মোট ১৭টি বিড়াল আছে। এতগুলো বিড়াল একসঙ্গে দেখাশোনা ও পালন করা তার জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

bird

সাইদ বলেন, ‘হাটে আনা প্রতিটা বিড়ালের দাম ৪ হাজার টাকা করে চাচ্ছি। ক্রেতার সঙ্গে দামে মিললে বিক্রি করে দেব। শখ করে অনেক টাকা খরচ করে বিড়াল পালন শুরু করি। বর্তমানে এতগুলো বিড়াল পালন করা বেশ কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়েই কিছু বিড়াল বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

ক্রেতা-বিক্রেতাদের দরদাম, দর্শনার্থীদের কৌতূহল, শিশুদের উচ্ছ্বাস আর পশু-পাখির বিচিত্র ডাক মিলিয়ে রোববারের এই হাট হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল। ব্যস্ত সড়কের পাশে বসা এই পশু-পাখির হাটে শুধু কেনাবেচাই হয় না, এখানে একসঙ্গে দেখা মেলে নানা রং, নানা প্রজাতি আর মানুষের বিচিত্র আগ্রহের। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ক্রেতা, বিক্রেতা ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে থাকে।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow