টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া, এবার কি ছাড়িয়ে যাবে শেষ ষোলোর সীমা?
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ধারাবাহিক উন্নয়নশীল শক্তি অস্ট্রেলিয়া। ১৯৭৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলার পর দীর্ঘ ৩২ বছরের অপেক্ষা শেষে ২০০৬ সালে আবারও বৈশ্বিক মঞ্চে ফিরে আসে দেশটি। এরপর থেকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। টানা ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছে ‘সকারুজ’রা। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মাটিতে নতুন ইতিহাস গড়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে অস্ট্রেলিয়া। এখন পর্যন্ত দুইবার শেষ ষোলোতে পৌঁছানো দলটি এবার সেই সীমা অতিক্রম করে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনাল কিংবা তারও বেশি দূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। পপোভিচের নেতৃত্বে নতুন অভিযাত্রা অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান কোচ টনি পপোভিচ দেশটির ফুটবলে পরিচিত এক নাম। জাতীয় দলের হয়ে ৫০টিরও বেশি ম্যাচ খেলা সাবেক এই ডিফেন্ডার ২০০৬ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে ওঠা দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। ২০০৮ সালে অবসর নেওয়ার পরই কোচিংয়ে নাম লেখান তিনি। ঘরোয়া ফুটবলে একাধিক ক্লাবকে সাফল্য এনে দেওয়ার পর ২০২৪ সালের শেষদিকে গ্রাহাম আর্নল্ডের স্থলাভিষিক্ত হয়ে জাতীয় দলের দায়িত্ব পান। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের কঠিন সময় সফলভাবে পার করে দলকে মূল পর্বে তুলে এনেছেন পপোভিচ। ফলে তিনি এ
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ধারাবাহিক উন্নয়নশীল শক্তি অস্ট্রেলিয়া। ১৯৭৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলার পর দীর্ঘ ৩২ বছরের অপেক্ষা শেষে ২০০৬ সালে আবারও বৈশ্বিক মঞ্চে ফিরে আসে দেশটি। এরপর থেকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। টানা ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছে ‘সকারুজ’রা।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মাটিতে নতুন ইতিহাস গড়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে অস্ট্রেলিয়া। এখন পর্যন্ত দুইবার শেষ ষোলোতে পৌঁছানো দলটি এবার সেই সীমা অতিক্রম করে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনাল কিংবা তারও বেশি দূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
পপোভিচের নেতৃত্বে নতুন অভিযাত্রা
অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান কোচ টনি পপোভিচ দেশটির ফুটবলে পরিচিত এক নাম। জাতীয় দলের হয়ে ৫০টিরও বেশি ম্যাচ খেলা সাবেক এই ডিফেন্ডার ২০০৬ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে ওঠা দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।
২০০৮ সালে অবসর নেওয়ার পরই কোচিংয়ে নাম লেখান তিনি। ঘরোয়া ফুটবলে একাধিক ক্লাবকে সাফল্য এনে দেওয়ার পর ২০২৪ সালের শেষদিকে গ্রাহাম আর্নল্ডের স্থলাভিষিক্ত হয়ে জাতীয় দলের দায়িত্ব পান।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের কঠিন সময় সফলভাবে পার করে দলকে মূল পর্বে তুলে এনেছেন পপোভিচ। ফলে তিনি এখন এমন এক বিশেষ তালিকায় নাম লেখানোর অপেক্ষায়, যেখানে একই ব্যক্তি খেলোয়াড় ও কোচ—দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন।
বিশ্বকাপ ২০২৬-এ অস্ট্রেলিয়ার গ্রুপ ও সূচি
গ্রুপ পর্বে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিপক্ষ তুরস্ক, স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র ও প্যারাগুয়ে।
ম্যাচ সূচি
* ১৩ জুন, অস্ট্রেলিয়া বনাম তুরস্ক, ভেন্যু: বিসি প্লেস, ভ্যাঙ্কুভার
* ১৯ জুন, যুক্তরাষ্ট্র বনাম অস্ট্রেলিয়া, ভেন্যু: সিয়াটল স্টেডিয়াম
* ২৫ জুন, প্যারাগুয়ে বনাম অস্ট্রেলিয়া, ভেন্যু: সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়াম
স্কোয়াডে নতুন মুখ, বাদ পড়লেন অভিজ্ঞরা
১ জুন ঘোষিত বিশ্বকাপ স্কোয়াডে সবচেয়ে আলোচিত দুটি নাম টেটে ইয়েঙ্গি ও ক্রিস্টিয়ান ভলপাতো। এখনও জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক না হওয়া এই দুই ফরোয়ার্ডকে দলে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে সিডনিতে জন্ম নেওয়া সাবেক ইতালি যুব দলের খেলোয়াড় ভলপাতো দীর্ঘদিন অস্ট্রেলিয়ার ডাক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের আগে তিনি সকারুজদের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এছাড়া ১৮ বছর বয়সী প্রতিভাবান ডিফেন্ডার লুকাস হ্যারিংটনও জায়গা পেয়েছেন দলে। তবে অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড মার্টিন বয়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডিফেন্ডার কাই রাউলস স্কোয়াডে জায়গা পাননি।
যেভাবে বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করল অস্ট্রেলিয়া
এএফসি অঞ্চলের দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব শুরু করে অস্ট্রেলিয়া। দ্বিতীয় রাউন্ডে ছিল একচেটিয়া আধিপত্য—
* ৬ ম্যাচে ৬ জয়
* কোনো গোল হজম করেনি
* শতভাগ সাফল্য
তবে তৃতীয় রাউন্ডের শুরুটা সহজ ছিল না। ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর নিজেদের মাঠে বাহরাইনের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় তারা। পাঁচ দিন পর ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ড্র করার পর কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড পদত্যাগ করেন। এরপর দায়িত্ব নেন টনি পপোভিচ। তার অধীনে চীনকে হারানো এবং জাপানের মাঠে ড্র দিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় দলটি। পরবর্তীতে পুরো বাছাইপর্বে আর কোনো ম্যাচ হারেনি অস্ট্রেলিয়া।
২০২৫ সালের ৫ জুন পার্থে জাপানকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের খুব কাছে পৌঁছে যায় তারা। পাঁচদিন পর জেদ্দায় সৌদি আরবকে ২-১ গোলে হারিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট। ওই ম্যাচে গোল করেন- কনর মেটক্যালফ ও মিচ ডিউক।
বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস
কনফেডারেশন
বর্তমান: এএফসি
পূর্বে: ওএফসি (জানুয়ারি ২০০৬ পর্যন্ত)
প্রথম বিশ্বকাপ: পশ্চিম জার্মানি ১৯৭৪
সর্বশেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২
মোট অংশগ্রহণ: ৭ বার (১৯৭৪, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬)
সেরা ফলাফল: শেষ ষোলো (২০০৬ ও ২০২২)
টানা বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড: ৬টি
বিশ্বকাপে সামগ্রিক পরিসংখ্যান
* ম্যাচ: ২০
* জয়: ৪
* ড্র: ৪
* হার: ১২
* গোল: ১৭
* হজম: ৩৭
অস্ট্রেলিয়ার সেরা বিশ্বকাপ
জার্মানি ২০০৬: অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল গড়ে উঠেছিল ২০০৬ বিশ্বকাপে। দলে ছিলেন- হ্যারি কিউয়েল, টিম কাহিল, মার্ক শোয়ার্জার
ব্রাজিল, ক্রোয়েশিয়া ও জাপানকে নিয়ে গঠিত কঠিন গ্রুপ থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে তারা। তবে শেষ ষোলোতে নাটকীয়ভাবে বিদায় নিতে হয়। ইতালির বিপক্ষে ম্যাচের ৯৫তম মিনিটে ফ্রান্সেস্কো তত্তির পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে হেরে যায় সকারুজরা।
কাতার ২০২২
১৬ বছর পর আবারও শেষ ষোলোতে পৌঁছে অস্ট্রেলিয়া। ফ্রান্সের কাছে ৪-১ গোলে হেরে শুরু করলেও পরের দুই ম্যাচে- তিউনিসিয়াকে ১-০, ডেনমার্ককে ১-০। গোলে হারিয়ে নকআউট নিশ্চিত করে। শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলে হারলেও দুর্দান্ত লড়াই উপহার দেয় তারা।
লিওনেল মেসি ও হুলিয়ান আলভারেজের গোলে জেতে আর্জেন্টিনা, যারা পরে বিশ্বচ্যাম্পিয়নও হয়।
প্রথম বিশ্বকাপের গল্প
১৯৫৬ অলিম্পিকে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার পর প্রথমবার বিশ্বকাপ বাছাইয়ে অংশ নেয় অস্ট্রেলিয়া। শুরুটা ছিল ভয়াবহ। কম্বোডিয়ায় প্রায় ৬০ হাজার দর্শকের সামনে উত্তর কোরিয়ার কাছে ৬-১ গোলে হেরে যায় তারা। তবে আট বছর পর ইতিহাস গড়ে। হংকংয়ে দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে নিশ্চিত করে ১৯৭৪ বিশ্বকাপের টিকিট।
মূল পর্বে, পূর্ব জার্মানির কাছে ২-০ হার। স্বাগতিক পশ্চিম জার্মানির কাছে ৩-০ হার। চিলির সঙ্গে গোলশূন্য ড্র নিয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়।
বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ গোলদাতা
বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা টিম কাহিল। তিনি তিনটি টানা বিশ্বকাপে গোল করার বিরল কীর্তি গড়েছেন। বিশ্বকাপে মোট গোল: ৫।
জার্মানি ২০০৬
জাপানের বিপক্ষে ৩-১ জয়ে করেন জোড়া গোল।
দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০
জার্মানির বিপক্ষে লাল কার্ড দেখার পর সার্বিয়ার বিপক্ষে ২-১ জয়ে গোল করেন।
ব্রাজিল ২০১৪
চিলির বিপক্ষে গোল করার পর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে করেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ভলি গোল। এই গোলই ছিল বিশ্বকাপে তার পঞ্চম ও শেষ গোল।
সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড
বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন দুই ফুটবলার। ম্যাথিউ রায়ান: ১০ ম্যাচ, ম্যাথিউ লেকি: ১০ ম্যাচ। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২- তিনটি বিশ্বকাপেই নিয়মিত খেলেছেন দুজন।
কাতার বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে ওঠা দলেরও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তারা। ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নিলে এই রেকর্ড আরও বাড়ানোর সুযোগ থাকবে তাদের সামনে।
অস্ট্রেলিয়ার স্মরণীয় বিশ্বকাপ মুহূর্ত
বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার মাত্র চারটি জয় রয়েছে। তবে সবচেয়ে স্মরণীয় জয় নিঃসন্দেহে ২০০৬ সালে জাপানের বিপক্ষে। গ্রুপ ‘এফ’-এর ম্যাচে ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল সকারুজরা। এরপর শুরু হয় ইতিহাস। লুকাস নিলের লম্বা থ্রো থেকে বল পেয়ে টিম কাহিল গোল করে সমতা ফেরান। এর কয়েক মিনিট পর ২০ গজ দূর থেকে দুর্দান্ত শটে আবারও গোল করেন তিনি। যোগ করা সময়ে জন আলোইসির একক নৈপুণ্যে আসে তৃতীয় গোল।
ফলাফল: অস্ট্রেলিয়া ৩-১ জাপান। এটাই ছিল বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম জয়।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় জয়
বিশ্বকাপ ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় জয়ও এসেছে সেই জাপানের বিপক্ষেই। ২০০৬ বিশ্বকাপে ৩-১ ব্যবধানে জয়টি এখনও বিশ্বমঞ্চে সকারুজদের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। টিম কাহিলের জোড়া গোল এবং জন আলোইসির একটি গোলের সেই ম্যাচই বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার উত্থানের প্রতীক হয়ে আছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন স্বপ্ন
টানা ছয়টি বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা, বিশ্বমানের কয়েকজন ফুটবলার এবং সাবেক বিশ্বকাপার টনি পপোভিচের নেতৃত্বে এবার নতুন লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে অস্ট্রেলিয়া।
দু’বার শেষ ষোলোতে ওঠার সাফল্য পেছনে ফেলে এবার প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছে সকারুজরা। উত্তর আমেরিকার মাটিতে সেই স্বপ্ন কতদূর বাস্তবায়ন করতে পারে, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।
What's Your Reaction?