ট্রাম্পের ‘শুল্ক বোমা’ সামলাতে সম্ভাব্য করণীয়

1 day ago 7

‘এইমাত্র তিনি বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ব্যবস্থায় একটি পারমাণবিক বোমা ফেলেছেন’- ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কহার নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেন রোগফের তাৎক্ষণিক মন্তব্য এটি। একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে তিনি এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানান।

ট্রাম্পের এই ‘শুল্ক বোমার’ আঘাতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরাও অনেকটা ভীত। অর্থনীতিবিদদের শঙ্কা বাণিজ্যযুদ্ধের। শুল্কযুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে যথাযথ নীতি ও কৌশল দরকার বলে মনে করেন তারা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ট্রাম্পের নতুন শুল্কের উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়। এটা ভালোভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। এ ট্যারিফের কোনো স্থায়িত্বকাল দেওয়া হয়নি। এর সমাধান কী হবে সেটাও বলা হয়নি।’

প্রথমে বাংলাদেশকে নীতিটি বুঝতে হবে এবং এর থেকে লাভের জন্য আলোচনার সূচনা করতে হবে। অপরিপক্ব আচরণ আমাদের জন্য ফলদায়ক হবে না। যেহেতু এটি একটি পারস্পরিক কর ব্যবস্থা, তাই আমাদের আরও কৌশলগত ও সতর্ক হতে হবে।- সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

তিনি বলেন, ‘প্রথমে বাংলাদেশকে নীতিটি বুঝতে হবে এবং এর থেকে লাভের জন্য আলোচনার সূচনা করতে হবে। অপরিপক্ব আচরণ আমাদের জন্য ফলদায়ক হবে না। যেহেতু এটি একটি পারস্পরিক কর ব্যবস্থা, তাই আমাদের আরও কৌশলগত ও সতর্ক হতে হবে।’

মোয়াজ্জেম বলেন, ‘প্রক্রিয়াটা এখনো স্বচ্ছ না। এটা কবে উঠবে, এ বিষয়গুলো বাংলাদেশকে দেখতে হবে। পাশাপাশি অন্য দেশগুলো কীভাবে নেগোসিয়েশন করে সেটাও দেখতে হবে। ট্রেড নেগোসিয়েশনের ক্ষেত্রে আমেরিকান প্রিন্সিপালটা বোঝা উচিত হবে। কী ম্যাকানিজমে এটা করতে হবে সেটা বোঝার বিষয় আছে।’

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘হঠাৎ করে মার্কিন সরকার বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ কর আরোপ করেছে। এটা আমাদের কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে এটা রপ্তানি খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। সামগ্রিক রপ্তানি কমে যেতে পারে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্যের সবচেয়ে বড় একক বাজার।’

যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের আমদানির চেয়ে রপ্তানি অনেক বেশি। তাই যতটুকু আমদানি হচ্ছে সেখানে সরকার যদি ডিউটি কমিয়েও দেয় এর প্রভাব খুব একটা হবে না। এটা একটা সমাধান হতে পারে।- বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম

তিনি বলেন, ‘এখন তাৎক্ষণিক সমাধান হলো আমাদের সরকার ধীরে ধীরে তাদের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ডিউটি কমিয়ে দিতে পারে। এটা করলে আমাদের ক্ষতি নেই। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের আমদানির চেয়ে রপ্তানি অনেক বেশি। তাই যতটুকু আমদানি হচ্ছে সেখানে সরকার যদি ডিউটি কমিয়েও দেয় এর প্রভাব খুব একটা হবে না। এটা একটা সমাধান হতে পারে।’

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার এবং রপ্তানি বাড়ানোর আরও সুযোগ আছে, তাই সরকারকে এটা নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে। যেখানে গড় শুল্ক বেশি আছে, সেখানে কমানোর ব্যবস্থা করা যায়। অন্যদিকে, আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে তুলা আমদানি করি সেই তুলা দ্বারা প্রস্তুত করা পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশ দাবি করা।’

‘আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, যন্ত্রপাতি ও পোশাক শিল্পের জন্য যে সব পণ্য আমদানি করি তার অধিকাংশ শুল্কমুক্ত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১ শতাংশ। খুব বেশি কর আমারা আরোপ করিনি। সুতরাং, এটা যৌক্তিক বলে মনে হয় না।’ দাবি করেন তিনি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ বলেন, ‘সার্বিকভাবে যে চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের আছে তার ওপর এখন যদি করহার বেড়ে যায় অর্থাৎ, বাংলাদেশি পণ্যকে বেশি ট্যাক্স দিয়ে আমেরিকান মার্কেটে ঢুকতে হয়, সেটা আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেবে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও চাপের মধ্যে পড়বো।’

আমাদের দ্রুত আমেরিকান পণ্যের যে লিস্ট আছে যা তারা বাংলাদেশে রপ্তানি করে সেই লিস্ট থেকে কিছু পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোর কর কমিয়ে দিলে আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে খুব একটা প্রভাব পড়বে না।- অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ

এ সমস্যা থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তির জন্য তিনি কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। রিয়াজ বলেন, ‘আমাদের দ্রুত আমেরিকান পণ্যের যে লিস্ট আছে যা তারা বাংলাদেশে রপ্তানি করে সেই লিস্ট থেকে কিছু পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোর কর কমিয়ে দিলে আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে খুব একটা প্রভাব পড়বে না। একই সঙ্গে আমাদের সামগ্রিক কর ও সম্পূরক শুল্কের কারণেও অনেক সময় করহার বেড়ে যায়। সুতরাং, সেই সেক্টরের পণ্যগুলোতে সম্পূরক শুল্ক কীভাবে কমানো যায় সেটা একটু দেখতে হবে।

টেকসই বাণিজ্যের জন্য আমাদের দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেই জায়গায় মূল হচ্ছে আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। দক্ষতা ও প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের অবকাঠামো, বিশেষ করে রপ্তানির ক্ষেত্রে লজিস্টিকস অবকাঠামোতে অনেক দুর্বলতা আছে, সেটা আমাদের ঠিক করতে হবে।

নতুন বাজার খোঁজার প্রতি নজর দেওয়ায় গুরুত্বারোপ করে খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমার মনে হয় এই নতুন বাস্তবতা মেনে বাংলাদেশের উচিত হবে নতুন বাজার খোঁজা। উদীয়মান বেশ কিছু বাজার রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের কিছু কিছু দেশ রয়েছে। অথবা দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া রয়েছে। এসব দেশেও বাংলাদেশের নজর রাখা উচিত। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন মাথায় রেখে বাংলাদেশের উচিত হবে এখন থেকে আলাদা আলাদা দেশের জন্য আলাদা পদক্ষেপ নেওয়া।’

রপ্তানির চিত্র

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৮০০ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল, যা আগের বছরে ছিল ৭ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার।

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল ১০ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৭ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ছিল ২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬০১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের লোহার ইস্পাত আমদানি করে, তারপরে খনিজ জ্বালানি ৫৯৫ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার, তুলা ৩৬১ মিলিয়ন ডলার, তেল বীজ ৩৪১ মিলিয়ন ডলার এবং নিউক্লিয়ার রেক্টর আমদানি করে ১১১ মিলিয়ন ডলারের।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বেশিরভাগ আসে পোশাক থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের ৭ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার এসেছে তৈরি পোশাক থেকে। বাকিটা এসেছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, চামড়ার জুতা, ফার্মাসিউটিক্যালস ও বিভিন্ন কৃষিপণ্য থেকে।

আইএইচও/এএসএ/জেআইএম

Read Entire Article