ডাবল বিলে দিশেহারা গ্রাহক, লোকসানে শিল্প-কারখানা

ফেনী শহর ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকট চলায় দুর্ভোগে পড়েছেন বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির প্রায় ৩২ হাজার আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহক। দিনভর কাঙ্ক্ষিত গ্যাস না পেয়ে একদিকে যেমন গৃহস্থালিতে বাড়তি খরচে সিলিন্ডার বা ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-কারখানাগুলোর। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের ভাষ্যমতে, কথা ছিল মাসশেষে নির্ধারিত বিল মেটালেই পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্ন সেবা। কিন্তু বাস্তবে মিলছে কেবল দীর্ঘ অপেক্ষা আর ভোগান্তি। তারা এখন আটকা পড়েছেন \'জ্বালানি ফাঁদে\'। গ্যাস না পেয়েও প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে পাইপলাইনের সরকারি বিল। অন্যদিকে সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা ব্যবহার করতে হচ্ছে ইলেকট্রিক চুলা। দ্বিগুণ খরচের বোঝা টানছেন গ্রাহকরা। রান্নাঘর থেকে হোটেল: বদলে যাওয়া রুটিন শহরের রামপুর, পূর্ব উকিলপাড়া, পেট্রোবাংলা, বাঁশপাড়া ও আলোকদিয়াসহ প্রায় প্রতিটি মহল্লাতেই একই চিত্র। ভোর চারটা থেকে সকাল ছয়টার মধ্যে যা একটু গ্যাসের চাপ থাকে, সকাল সাতটা বাজতেই তা শূন্যের ক

ডাবল বিলে দিশেহারা গ্রাহক, লোকসানে শিল্প-কারখানা

ফেনী শহর ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকট চলায় দুর্ভোগে পড়েছেন বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির প্রায় ৩২ হাজার আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহক। দিনভর কাঙ্ক্ষিত গ্যাস না পেয়ে একদিকে যেমন গৃহস্থালিতে বাড়তি খরচে সিলিন্ডার বা ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-কারখানাগুলোর।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের ভাষ্যমতে, কথা ছিল মাসশেষে নির্ধারিত বিল মেটালেই পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্ন সেবা। কিন্তু বাস্তবে মিলছে কেবল দীর্ঘ অপেক্ষা আর ভোগান্তি। তারা এখন আটকা পড়েছেন 'জ্বালানি ফাঁদে'। গ্যাস না পেয়েও প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে পাইপলাইনের সরকারি বিল। অন্যদিকে সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা ব্যবহার করতে হচ্ছে ইলেকট্রিক চুলা। দ্বিগুণ খরচের বোঝা টানছেন গ্রাহকরা।

রান্নাঘর থেকে হোটেল: বদলে যাওয়া রুটিন

শহরের রামপুর, পূর্ব উকিলপাড়া, পেট্রোবাংলা, বাঁশপাড়া ও আলোকদিয়াসহ প্রায় প্রতিটি মহল্লাতেই একই চিত্র। ভোর চারটা থেকে সকাল ছয়টার মধ্যে যা একটু গ্যাসের চাপ থাকে, সকাল সাতটা বাজতেই তা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। দুপুর গড়িয়ে গভীর রাত না হওয়া পর্যন্ত আর দেখা মেলে না আগুনের।

মূলত সঞ্চালন লাইনের জটিলতার কারণেই কাঙ্ক্ষিত চাপে গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। তবে নতুন লাইন নির্মাণ বা বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকেরা এ দুর্ভোগ থেকে কবে মুক্তি পাবেন, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি

পূর্ব উকিলপাড়ার গৃহিণী ফাহিমা আবেদীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাসায় তিন রকমের রান্নার ব্যবস্থা রাখতে হয়েছে- লাইন গ্যাস, সিলিন্ডার আর ইলেকট্রিক চুলা। রান্না করতে তিন জায়গায় খরচ করে এখন সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

ডাবল বিলে দিশেহারা গ্রাহক, লোকসানে শিল্প-কারখানাবৈদ্যুতিক চুলা

একই ভোগান্তির কথা জানান শহরতলীর আলোকদিয়ার কাজী রিয়াজ। তিনি বলেন, ‘গ্যাস আসে রাত বারোটায়, চলে যায় ভোর ছয়টায়। আমরা কি মানুষ নাকি রাতে জেগে রান্না করার যন্ত্র?’

সকালের নাস্তা ও দুপুরের খাবারের জন্য এখন অনেকেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন এলাকার হোটেল-রেস্তোরাঁর ওপর। এতে একদিকে যেমন দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ বহুগুণ বাড়ছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে শিশুদের নিয়ে।

লোকসানে কারখানা, আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি

সংকট কেবল বাসা-বাড়িতেই সীমাবদ্ধ নেই, স্থানীয় শিল্প-কারখানাতেও। গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে। প্রতিদিন গুণতে হচ্ছে লোকসান।

গ্যাস না পেয়েও প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে পাইপলাইনের সরকারি বিল, অন্যদিকে সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা ব্যবহার করতে হচ্ছে ইলেকট্রিক চুলা। দ্বিগুণ খরচের বোঝা টানছেন গ্রাহকরা

পুরাতন পুলিশ কোয়ার্টারের এক ভবনমালিক নিজাম উদ্দিন জানান, তার সাততলা ভবনের ভাড়াটিয়ারা গ্যাস না পেয়ে এখন লাইনের বিল দিতে রাজি হচ্ছেন না। একাধিকবার বাখরাবাদ গ্যাস অফিসে অভিযোগ জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। দীর্ঘদিন একই ভোগান্তি চলায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা এখন রাস্তায় নেমে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ডাবল বিলে দিশেহারা গ্রাহক, লোকসানে শিল্প-কারখানাগ্যাস না থাকায় মাটির চুলায় রান্না করছেন

ফেনী বিসিক শিল্প নগরীর কারখানা মালিক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বিল দিয়েও জাতীয় গ্রিডের গ্যাস পাচ্ছি না। কারখানায় যেসব অটোমেটিক মেশিন আছে, সেগুলো চালাতে নির্দিষ্ট ও নিরবচ্ছিন্ন প্রেশারের গ্যাস লাগে। চাপ হঠাৎ কমে গেলে রানিং চালানের কোটি টাকার প্রসেসিং নষ্ট হয়ে যায়। এখন বিকল্প হিসেবে চড়া দামে ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় বাজারে যেখানে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে, সেখানে এই লোকসান টেনে কারখানা চালু রাখা অসম্ভব। বাখরাবাদ গ্যাস যদি দ্রুত সুনির্দিষ্ট সমাধান না দেয়, তবে আমাদের মতো উদ্যোক্তাদের কারখানা বন্ধ করে রাস্তায় নামা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’

বিস্কুট ও বেকারি শিল্প মালিক আবদুল মোতালেব জানান, খাদ্য প্রস্তুতকারী শিল্পে সময়ের সঠিক হিসাব আর গ্যাসের প্রেশারটাই আসল। ওভেনে গ্যাসের প্রেশার না থাকলে বিস্কুট, ব্রেড কিংবা অন্যান্য বেকারি আইটেমের সঠিক কোয়ালিটি আসে না, পুরো ব্যাচটাই নষ্ট হয়ে যায়। গত তিন মাস ধরে সকালে বা দুপুরে আমরা কোনো কাজই করতে পারছি না। গভীর রাতে কোনোমতে অর্ধেক শক্তিতে কাজ সারতে হচ্ছে। কারখানার শ্রমিকদের অলস বসিয়ে রেখে প্রতি মাসে বেতন ও বিদ্যুৎ বিল গুনতে গিয়ে আমরা পুরো দেউলিয়া হওয়ার পথে। এভাবে চললে কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব।

পুরোনো পাইপলাইন ও অস্পষ্ট সমাধান

হঠাৎ কেন এই সংকট? বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ফেনী কার্যালয় সূত্র জানাচ্ছে, জেলার পুরোনো সঞ্চালন লাইনগুলোর পরিবহন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় এই চাপ সামলানো সম্ভব হচ্ছে না।

ডাবল বিলে দিশেহারা গ্রাহক, লোকসানে শিল্প-কারখানা

যোগাযোগ করা হলে বাখরাবাদ গ্যাসের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী মো. আখতারুজ্জামান সমস্যাটি স্বীকার করে জানান, মূলত সঞ্চালন লাইনের জটিলতার কারণেই কাঙ্ক্ষিত চাপে গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। তবে নতুন লাইন নির্মাণ বা বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকেরা এ দুর্ভোগ থেকে কবে মুক্তি পাবেন, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি।

ভুক্তভোগীদের দাবি, নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগপর্যন্ত অন্তত অন্তর্বর্তীকালীন কোনো উপায়ে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ গ্রহণ করুক কর্তৃপক্ষ। অন্যথায় দ্বিগুণ বিলের বোঝা আর সইবেন না তারা।

আবদুল্লাহ আল-মামুন/কেজে/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow