ডায়াবেটিস বাড়ায় স্ট্রোক ও স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকিও
বেশিরভাগ মানুষই ডায়াবেটিসকে এমন একটি রোগ হিসেবে মনে করেন, যার শুরু এবং শেষ—দুটোই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা করা, নিয়মিত ওষুধ খাওয়া, খাদ্যাভ্যাসে সতর্ক থাকা এবং এইচবিএ১সি পর্যবেক্ষণ—এসবই ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের অংশ। কিন্তু ডায়াবেটিসের প্রভাব এখানেই শেষ নয়। দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণহীন বা ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত না হলে এই রোগ শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে, বিশেষ করে মস্তিষ্কে রক্ত ও স্নায়ু সরবরাহকারী রক্তনালিগুলোকে। ডায়াবেটিসের সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি এটি স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং চিন্তাশক্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দৈনন্দিন জীবনে এগুলো সব সময় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। অনেকেই বছরের পর বছর সুস্থ অনুভব করলেও এ সময়ে রক্তে উচ্চ শর্করা নীরবে রক্তনালির ক্ষতি করতে থাকে। এমনকি উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। কেন ডায়াবেটিস স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় ডায়াবেটিসের সবচেয়ে গুরুতর জটিলতার একটি হলো স্ট্রোক। ডায়াবেটিস রোগীদের স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি সুস্থ
বেশিরভাগ মানুষই ডায়াবেটিসকে এমন একটি রোগ হিসেবে মনে করেন, যার শুরু এবং শেষ—দুটোই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা করা, নিয়মিত ওষুধ খাওয়া, খাদ্যাভ্যাসে সতর্ক থাকা এবং এইচবিএ১সি পর্যবেক্ষণ—এসবই ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের অংশ। কিন্তু ডায়াবেটিসের প্রভাব এখানেই শেষ নয়। দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণহীন বা ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত না হলে এই রোগ শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে, বিশেষ করে মস্তিষ্কে রক্ত ও স্নায়ু সরবরাহকারী রক্তনালিগুলোকে।
ডায়াবেটিসের সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি এটি স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং চিন্তাশক্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দৈনন্দিন জীবনে এগুলো সব সময় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। অনেকেই বছরের পর বছর সুস্থ অনুভব করলেও এ সময়ে রক্তে উচ্চ শর্করা নীরবে রক্তনালির ক্ষতি করতে থাকে। এমনকি উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
কেন ডায়াবেটিস স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়
ডায়াবেটিসের সবচেয়ে গুরুতর জটিলতার একটি হলো স্ট্রোক। ডায়াবেটিস রোগীদের স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি সুস্থ মানুষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। বেঙ্গালুরুর ইলেকট্রনিক সিটির কেআইএমএস হাসপাতালের স্নায়ুরোগ বিভাগের পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ডা. সুজিত কুমার বলেন, ‘গ্লুকোজ রক্তনালির ভেতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে সেগুলো সহজেই সংকুচিত ও শক্ত হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেখানে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি তৈরি হয়।’
মস্তিষ্কের কার্যক্রম সচল রাখতে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্তের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন। ডা. সুজিত কুমার বলেন, ‘মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্কের কোষ মারা যেতে শুরু করে।’ এ কারণেই স্ট্রোক সব সময়ই একটি জরুরি অবস্থা। যত বেশি সময় মস্তিষ্ক রক্তবঞ্চিত থাকবে, স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কাও তত বাড়বে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস সাধারণত একা আসে না। অনেক রোগীরই এর পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা কিংবা হৃদ্রোগও থাকে। এই সবগুলোই আলাদাভাবে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। আর একাধিক সমস্যা একসঙ্গে থাকলে স্ট্রোকের পাশাপাশি পুনরায় স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কাও অনেক বেড়ে যায়।
রক্তে উচ্চ শর্করা স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তিকেও প্রভাবিত করতে পারে
স্ট্রোকই একমাত্র উদ্বেগের বিষয় নয়। ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে এমনভাবেও মস্তিষ্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা শুরুতে বোঝা যায় না। বছরের পর বছর রক্তে শর্করা বেশি থাকলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ক্ষুদ্র রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেসও বাড়তে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে।
ডা. সুজিত কুমার বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে রোগীর স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ভাসকুলার ডিমেনশিয়া ও আলঝেইমার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তবে ডায়াবেটিস ও আলঝেইমারের মধ্যে এখনো নিশ্চিত কোনো সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি।’
রক্তে নিম্ন শর্করাও মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর
যদিও দীর্ঘমেয়াদে রক্তে উচ্চ শর্করা বেশি উদ্বেগের বিষয়, তবুও রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে যাওয়া বা হাইপোগ্লাইসেমিয়াও মস্তিষ্কের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। ডা. সুজিত কুমার বলেন, ‘তীব্র হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় বিভ্রান্তি, মাথা ঘোরা, খিঁচুনি এবং অচেতন হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। সময়মতো এটি শনাক্ত ও চিকিৎসা না করা হলে, বিশেষ করে বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’ এ কারণেই ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ব্যক্তিভেদে নির্ধারণ করা জরুরি। লক্ষ্য শুধু রক্তে শর্করা যতটা সম্ভব কমানো নয়; বরং সেটিকে নিরাপদ মাত্রায় রাখা।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ মানেই মস্তিষ্ককেও সুরক্ষিত রাখা
ডায়াবেটিসজনিত স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো রোগটি নিয়মিত নিয়ন্ত্রণে রাখা। এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ, নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা এবং নির্ধারিত চিকিৎসা পরিকল্পনা অনুসরণ করা। তবে শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না। ডা. সুজিত কুমারের পরামর্শ, ‘রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান পরিহার করা, মদ্যপান সীমিত রাখা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাও স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করে।’
স্ট্রোকের সতর্কসংকেত চিনে রাখুন
মস্তিষ্কে সমস্যার প্রথম লক্ষণ সাধারণত হঠাৎ দেখা দেয়। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে বাড়িতে বসে অপেক্ষা করা উচিত নয়। ডা. সুজিত কুমার বলেন, ‘শরীরের একপাশ হঠাৎ দুর্বল বা অবশ হয়ে গেলে, কথা বলতে বা বুঝতে সমস্যা হলে, হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন হলে, ভারসাম্য হারিয়ে ফেললে কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই তীব্র মাথাব্যথা শুরু হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।’ স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রোকের ধরন এবং রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রক্তপ্রবাহ পুনরুদ্ধারের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘স্ট্রোকের ক্ষেত্রে উপসর্গ শুরু হওয়ার পর আদর্শভাবে ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এর মধ্যে, অর্থাৎ সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু করা গেলে রোগীদের রক্তপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করা, স্ট্রোকের প্রভাব কমিয়ে দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতা ও জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।’ তবে চিকিৎসার সময়সীমা রোগীর অবস্থা, স্ট্রোকের ধরন এবং মস্তিষ্কের স্ক্যানের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে। তাই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ হলো—উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া।
ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করার রোগ নয়
ডায়াবেটিসকে অনেকেই শুধু রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের একটি রোগ হিসেবে দেখেন। কিন্তু এর প্রভাব অনেক বিস্তৃত। ডা. সুজিত কুমারের ভাষায়, ‘ডায়াবেটিস শুধু রক্তে শর্করার মাত্রাকেই প্রভাবিত করে না। ডায়াবেটিসের পাশাপাশি এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য সমস্যাও সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।’ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রত্যেকের জন্য এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হতে পারে—রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ শুধু আজকের পরীক্ষার ফল ভালো রাখার জন্য নয়; বরং আগামী বহু বছর ধরে মস্তিষ্ক, রক্তনালি এবং জীবনমান সুরক্ষিত রাখার জন্যও অত্যন্ত জরুরি।

অটোনমিক নিউরোপ্যাথি হলে করণীয় কী?
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
আরএএইচইউএল/এসইউ
What's Your Reaction?