সম্প্রতি হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের ব্যবস্থাপনা ও একাধিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে সিলেটের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে।
রোববার (২১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব জেতী প্রু স্বাক্ষরিত আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তবে প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
তবে, মাজার ইস্যুকে ঘিরে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার মুখে পড়েন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম।
জানা গেছে, গত শুক্রবার (১২ জুন) সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান। এ সময় তিনি মাজারের আয় ও ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেন।
এরই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকেলে মাজারে থাকা আগের দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি মাজারে মানুষের দানের নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার জন্য থাকা ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ সিলগালা করা হয়।
গত ১৮ জুন বিকেলে এসব পদক্ষেপ নেওয়ার পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনার জন্ম দেয়। এক পক্ষ এ উদ্যোগকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখলেও অন্য পক্ষ একে ঐতিহ্যবিরোধী ও অযাচিত হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে।
তিনি সিলেটের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সারওয়ার আলম বিভিন্ন উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিষয়ে একাধিক উদ্যোগ নেন। এর মধ্যে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের সিলেট অংশে জমি অধিগ্রহণ দ্রুত শেষ করার ঘোষণা থাকলেও অগ্রগতি সীমিত ছিল বলে জানা যায়।
এছাড়া ভূমিকম্পের পর নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ, ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ, জোরপূর্বক মার্কেটে থালা দেওয়া এবং অন্যান্য প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়েও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
তবে সাদাপাথর লুটের ঘটনার তদন্ত ও অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়েও তার দায়িত্বকালীন সময়ে নানা আলোচনা চলছিল। এখন পর্যন্ত সাদাপাথর তদন্ত হলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেননি।
সিলেটের সচেতন মহল বলছেন, জেলা প্রশাসক বেশ বাড়াবাড়ি করে অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা সিলেটের মানুষ শুধু মুখ বুঝে সহ্যই করেছে। এর ফল আজ ভোগ করতে হলো।
তিন দিনের মাথায় প্রত্যাহার
মাজারের দানবাক্স ও ডেগ সিলগালার ঘটনার মাত্র তিন দিনের মাথায় তাকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এলো। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে। তবে নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে কাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো ঘোষণা আসেনি।
প্রশাসনিক মহলে আলোচনা
প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, দায়িত্ব পালনকালে একাধিক আলোচিত সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ ঘিরে সারওয়ার আলমের কর্মকাণ্ড নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা চলছিল। সর্বশেষ মাজার ইস্যুতে নেওয়া পদক্ষেপই জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত তার প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডিসি সারওয়ার আলম বদলির বিষয়ে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সিলেট শাখার সদস্য সচিব আব্দুল করিম কিম কালবেলাকে বলেন, ‘সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাদাপাথর লুটের সময় তিনি লুটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও পাথর পুনঃস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এছাড়া র্যাবে ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই তিনি জনমনে পরিচিত ছিলেন।
তবে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নেওয়া কিছু পদক্ষেপ বিশেষ করে দানবাক্স ও ঐতিহাসিক দানের ডেগ সিলগালা এবং সেখানে পুলিশ ও আনসার মোতায়েন অনেকের কাছে বিতর্কিত ও অশোভন মনে হয়েছে।
এতে মাজার সংশ্লিষ্টদের সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে এবং ঐতিহ্য ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, সিলেটের ৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দরগাহ ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের হস্তক্ষেপ জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হলেও এর পেছনে অন্য কোনো উচ্চপর্যায়ের কারণ রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
সিলেট হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগার খাদেম ও ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না শাহজালাল মাজার ইস্যুতে ডিসির বদলি বিষয়ে তিনি বলেন, সিলেটের ৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দরগাহ ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের হস্তক্ষেপ জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হলেও এর পেছনে অন্য কোনো উচ্চপর্যায়ের কারণ রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। আল্লাহই ভালো জানেন।
উল্লেখ্যে, গত বছরের ১৮ অগাস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদে পদায়ন করা হয়।