চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে পোষ্য কোটা বা ওয়ার্ড কোটা প্রশাসনিকভাবে বাতিল করা হলেও বাস্তবে এ কোটায় ভর্তি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ও মেধাতালিকায় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি কিছুই। তবে, এ সংক্রান্ত এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট পোষ্য কোটার পক্ষে রায় দিয়েছেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে পোষ্য বা ওয়ার্ড কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির দ্বিতীয় সভায়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ওই সিদ্ধান্তের পরও ভর্তি প্রক্রিয়ায় গোপনে পোষ্য কোটায় শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে, পোষ্য কোটা বহাল রাখার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজি ও বিচারপতি রাজিউদ্দিন আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সংশ্লিষ্ট ভর্তি কমিটির কাছে রুল জারি করেন। পরবর্তীতে চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিচারপতি শশাংঙ্খা শেখর সরকার ও বিচারপতি উম্মে রহমানের বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে বলা হয়, ইতোপূর্বে জারিকৃত রুলনিশিটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। রুলনিশিতে স্নাতক প্রথম বর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের সন্তান ও স্বামী/স্ত্রীর জন্য ‘ওয়ার্ড কোটা’র বিধান দীর্ঘদিন ধরে প্রাপ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তা বহাল রাখার বিষয়টি উল্লেখ করা হয় এবং আদালত প্রয়োজনে উপযুক্ত ও ন্যায়সংগত আদেশ দিতে পারবেন বলেও উল্লেখ থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ জন শিক্ষক ও ৮৪ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমন্বয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিজীবী ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, যুগ-যুগ ধরে যেভাবে চলে আসছে, সেভাবেই বাস্তবায়ন করতে হবে। হাইকোর্ট এভাবেই আদেশ দিয়েছেন।
চিঠিতে ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত ভর্তি কমিটির ৭ নং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পোষ্য কোটার বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিপালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত করা এবং বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করায় উপাচার্য কে ধন্যবাদ জানায়। এতে পোষ্য কোটার সংখ্যা পূর্বের মতো ১৬৬ রাখার কথাও বলা হয়। তবে বাস্তবে কতজন শিক্ষার্থী এ কোটায় ভর্তি হয়েছে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য জানানো হয়নি। তবে, কর্মকর্তাদের দাবি, গত শিক্ষাবর্ষে জারি করা নিয়ম অনুযায়ী ৫৪ জন ভর্তি করানো হয়েছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা আমাদের অধিকার। হাইকোর্ট এতে রায় দিয়েছে। কিন্তু তারা প্রায় ৫৪ জন ভর্তি করিয়েছে। আমাদের আরও ১০ থেকে ১৫ জন পাশ করলেও তাদের ভর্তি করানো হয়নি। আমাদের দাবি না মানলে আমরা আবার কোর্টে যাব।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার এস.এম. আকবর হোছাইন বলেন, ‘কোটায় কতজন হয়েছে এ তথ্য আমাদের কাছে নেই। আপনি আইসিটি সেল বা ডিন অফিসে যোগাযোগ করুন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেল পরিচালক অধ্যাপক সাইদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আইসিটি সেল কোনো তথ্য দিতে পারবে না, আমরা মিডিয়া ডিল করি না। পোষ্য কোটা নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। আপনি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’
কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবাল শাহীন খান বলেন, ‘তালিকা আমরা দিতে পারছি না। ১০ তারিখে আমাদের মিটিং হবে, তারপর আমরা বলতে পারব।’
বিবিএ অনুষদের কর্তৃপক্ষ পোষ্য কোটা বিষয়ে দেখাতে পারেনি কোনো ফাইল না নথি। তারা জানায়, ‘আমরা কিছু বলতে পারছি না। ডিপার্টমেন্ট প্রতি ১ জন পোষ্য কোটায় ভর্তি দিলে দিতে পারে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট প্রশাসন আছে। আপনি উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক শামীম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খান বলেন, ‘আপনি উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’
এ ব্যাপারে উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, ‘এটি আদালতের রায় আমরা এ রায়ের কোটার বিপক্ষে লড়াই করেছিলাম। তবে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছি। রায়ে ১৬৬ জন ভর্তি করানোর কথা বলা হলেও আমরা সে অনুযায়ী ভর্তি দেইনি। এখন পর্যন্ত মোট কতজন ভর্তি হয়েছে তা নির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে ৫৪ জনের বেশি ১জনও ভর্তি করানো হবে না। এখানে কোনো ধরনের লুকোচুরি নেই। আপনাকে তথ্য কেন দেয়নি, তা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। তবে প্রয়োজন হলে সব তথ্য সরবরাহ করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পোষ্য কোটার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের ডাকা হয়েছিল, নির্দিষ্ট সময়সীমাও দেওয়া হয়েছিল। তবে, ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি, যেহেতু তারা পরিচিত। কিন্তু, কাগজপত্রের সব প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবেই সম্পন্ন করা হয়েছে।’
পোষ্য কোটা বন্ধের দাবিতে চবিতে হয়েছিল নানা আন্দোলন। ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর আন্দোলন শুরু করেছিল শিক্ষার্থীরা। এরপরে হয়েছিল নানা মানববন্ধন, আলোচনা, আন্দোলন, অবস্থান কর্মসূচি, মূল ফটকে তালা সহ নানা কর্মসূচি দেওয়া হয়। কোটার বিষয়ে করা হয়েছিল ৭ সদস্যের একটি কমিটি। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রতি বিভাগে ১ জন ও ২০২৫ -২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে এটি বাতিল করা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে চাকসুর এজিএস ও ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আইয়ুবুর রহমান তৌফিক বলেন, ‘পোষ্য কোটা একটি মীমাংসিত বিষয়। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে এটি ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছিল। এই মীমাংসিত বিষয়কে যদি আবারও জাগ্রত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে আমরা তা কোনোভাবেই মেনে নেব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসন যদি এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়ে থাকে, তবে লুকোচুরি না করে সেটি স্পষ্টভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা উচিত। আর যদি বিষয়টি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে আমরা এর তীব্র বিরোধিতা করছি এটি কখনোই হতে দেওয়া হবে না।’