‘তুই কি দেখতে পাস না?’—মায়ের সেই প্রশ্নের উত্তর আজও দিয়ে চলেছেন মুকলেস
শৈশবে ভাত খেতে বসে থালার বদলে পানির গ্লাসে হাত দিয়ে দিত ছোট্ট মুকলেস। তখন মা রুলি বেগম বলতেন, ‘তুই কি দেখতে পাস না?’ সময়ের সঙ্গে সেই প্রশ্নের উত্তর যেন নিজের জীবন দিয়েই দিয়ে চলেছেন মুকলেস আলী। দুই চোখের আলো হারিয়েও তিনি ভিক্ষার পথ বেছে নেননি; কঠোর পরিশ্রম করে আজও বৃদ্ধ মায়ের মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মুকলেস আলীর বয়স ৫২ বছর। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, তার জন্ম ১৯৭৪ সালের ২৩ আগস্ট। জন্মের পর কিছুটা দেখতে পেলেও ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি। তবে চোখের আলো নিভে গেলেও জীবনের প্রতি তার সংগ্রাম থেমে যায়নি। প্রতিদিন হাতে একটি ছালা নিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে তিনি পৌঁছান বশির উদ্দিন স-মিলে। সেখানে গাছের গুঁড়ির ছাল ছাড়ানো, কাঠের খড়ি কুড়িয়ে জড়ো করাসহ বিভিন্ন কাজ করেন। দিনের শেষে ১০০-২০০ টাকা আয় হয়। সেই সামান্য আয়েই চলে মা-ছেলের ছোট্ট সংসার। রুলি বেগম জানান, ১৪-১৫ বছর বয়স থেকেই মুকলেস স-মিলে কাজ শুরু করেন। প্রথমে বাড়ির পাশের মিলে কাজ করলেও পরে মিলটি প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে কলেজ মোড় এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। তবুও কাজ ছাড়েননি
শৈশবে ভাত খেতে বসে থালার বদলে পানির গ্লাসে হাত দিয়ে দিত ছোট্ট মুকলেস। তখন মা রুলি বেগম বলতেন, ‘তুই কি দেখতে পাস না?’ সময়ের সঙ্গে সেই প্রশ্নের উত্তর যেন নিজের জীবন দিয়েই দিয়ে চলেছেন মুকলেস আলী। দুই চোখের আলো হারিয়েও তিনি ভিক্ষার পথ বেছে নেননি; কঠোর পরিশ্রম করে আজও বৃদ্ধ মায়ের মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মুকলেস আলীর বয়স ৫২ বছর। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, তার জন্ম ১৯৭৪ সালের ২৩ আগস্ট। জন্মের পর কিছুটা দেখতে পেলেও ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি। তবে চোখের আলো নিভে গেলেও জীবনের প্রতি তার সংগ্রাম থেমে যায়নি।
প্রতিদিন হাতে একটি ছালা নিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে তিনি পৌঁছান বশির উদ্দিন স-মিলে। সেখানে গাছের গুঁড়ির ছাল ছাড়ানো, কাঠের খড়ি কুড়িয়ে জড়ো করাসহ বিভিন্ন কাজ করেন। দিনের শেষে ১০০-২০০ টাকা আয় হয়। সেই সামান্য আয়েই চলে মা-ছেলের ছোট্ট সংসার।
রুলি বেগম জানান, ১৪-১৫ বছর বয়স থেকেই মুকলেস স-মিলে কাজ শুরু করেন। প্রথমে বাড়ির পাশের মিলে কাজ করলেও পরে মিলটি প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে কলেজ মোড় এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। তবুও কাজ ছাড়েননি তিনি। প্রতিদিন মা তাকে রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে দিতেন, এরপর মুকলেস একাই মিলে পৌঁছে যেতেন। পরে গাছের ছাল বাড়িতে এনে দিতেন, যা তার বাবা শুকিয়ে বিক্রি করতেন। ২০১০ সালে বাবার মৃত্যুর পর পুরো সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে মুকলেসের কাঁধে। সেই দায়িত্ব আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন তিনি।
প্রায় ৩০ বছর ধরে কাঠের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত জালাল উদ্দিন বলেন, শুরু থেকেই মুকলেসকে একইভাবে পরিশ্রম করতে দেখছেন। কখনো কারও কাছে সাহায্য চাইতে দেখেননি। নিজের শ্রমেই তিনি জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তার আক্ষেপ, এত বছরেও মুকলেসের চোখের চিকিৎসার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বশির উদ্দিন স-মিলের মালিক এটিএম হাসানুজ্জামান জানান, প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ বছর ধরে মুকলেস তাদের মিলে কাজ করছেন। তিনি একাই মিলের সামনে পর্যন্ত হেঁটে আসেন। এরপর শ্রমিকরা তাকে ভেতরে নিয়ে যান। গাছের গুঁড়ির ছাল ছাড়ানো থেকে শুরু করে কাঠের খড়ি সংগ্রহ—সব কাজই তিনি দক্ষতার সঙ্গে করেন। কাজ শেষে শ্রমিকরা তাকে রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে দেন। সন্ধ্যায় সেখানে অপেক্ষা করেন তার মা, এরপর দুজনে একসঙ্গে বাড়ি ফেরেন।
প্রতিবেশী মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, অনেক সুস্থ-সবল মানুষও বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে চান না। অথচ দৃষ্টিহীন মুকলেস বছরের পর বছর ধরে বৃদ্ধ মাকে আগলে রেখেছেন। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রবাসী কিংবা সরকার এগিয়ে এলে পরিবারটির জীবন আরও সহজ হতে পারে।
মুকলেসের ছোট ভাই সোহেল রানা জানান, তিনি ছোটবেলা থেকেই বড় ভাইকে দৃষ্টিহীন অবস্থায় দেখেছেন। নিজে একটি মসজিদে মুয়াজ্জেম হিসেবে স্বল্প বেতনে চাকরি করেন। তিন সন্তান নিয়ে আলাদা সংসার চালাতে গিয়ে বড় ভাইকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করার সামর্থ্য তার নেই।
ভোলাহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাহিদ হোসেন বলেন, ‘একজন প্রতিবন্ধী হয়েও যে কর্মস্পৃহা তিনি দেখিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই ব্যতিক্রমী। সরকারি বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষও যদি পাশে দাঁড়ান, তাহলে তা তার জন্য বড় সহায়ক হবে।’
নিজের জীবন নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই মুকলেস আলীর। শান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি অন্ধ মানুষ, ভিক্ষা করতে চাই না। কর্ম করে খেতে চাই। চোখে যদি আবার আলো ফিরে পেতাম, তাহলে এই সুন্দর পৃথিবীটা দেখতে পারতাম। আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারতাম।’
দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও আত্মমর্যাদা আর পরিশ্রমকে আঁকড়ে ধরা মুকলেস আলীর জীবন কেবল সংগ্রামের গল্প নয়; এটি একজন সন্তানের দায়িত্ববোধ, আত্মসম্মান এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির অনন্য উদাহরণ। তার চোখে আলো নেই, কিন্তু তার শ্রমের আলোয় আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে বৃদ্ধ মায়ের জীবন।
What's Your Reaction?