তুরস্কের ড্রোন বিপ্লব: ছোট ঘর থেকে বিশ্বজয়ের গল্প বায়রাক্তারের
একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণ বদলে দেওয়া এক জাদুকরী প্রযুক্তির নাম ‘ড্রোন’। আজ ইউক্রেনের রণাঙ্গন থেকে শুরু করে লিবিয়ার মরুভূমি কিংবা নাগারনো-কারাবাখের আকাশ—যেখানেই সামরিক ড্রোনের রাজত্ব, সেখানেই উচ্চারিত হয় একটি নাম: ‘বায়রাক্তার’। বিশ্বরাজনীতি ও আধুনিক সমরবিদ্যার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এই তুর্কি ড্রোন সাম্রাজ্যের পেছনে থাকা মূল কাণ্ডারি কোনো সেনাপ্রধান বা রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি হলেন এক নিভৃতচারী দূরদর্শী প্রকৌশলী। নাম তার ওজদেমির বায়রাক্তার। আজ তাকে পুরো বিশ্ব চেনে তুরস্কের ড্রোন শিল্পের জনক বা ‘ফাদার অব টার্কিশ ড্রোন’ নামে। ২০০০-এর দশকের শুরুতে যখন পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর নিষেধাজ্ঞা আর পরনির্ভরশীলতায় তুরস্কের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পঙ্গু হওয়ার উপক্রম, ঠিক তখন এক অদম্য প্রতিজ্ঞা নিয়ে বুক বেঁধেছিলেন ওজদেমির। মাত্র একটি ড্রিল মেশিন নিয়ে ইস্তাম্বুলের এক কোণে শুরু হওয়া তার সেই ছোট কর্মশালাই আজ তুরস্ককে পরিণত করেছে বিশ্বের অন্যতম ড্রোন পরাশক্তিতে। যুবক বয়সে গবেষণায় ব্যস্ত ওজদেমির বায়রাক্তার/ ছবি: বায়কার শৈশবেই মেধার স্ফুরণ ১৯৪৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ইস্তাম্বুলের সারিয়ের জেলার গারিপচে ন
একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণ বদলে দেওয়া এক জাদুকরী প্রযুক্তির নাম ‘ড্রোন’। আজ ইউক্রেনের রণাঙ্গন থেকে শুরু করে লিবিয়ার মরুভূমি কিংবা নাগারনো-কারাবাখের আকাশ—যেখানেই সামরিক ড্রোনের রাজত্ব, সেখানেই উচ্চারিত হয় একটি নাম: ‘বায়রাক্তার’। বিশ্বরাজনীতি ও আধুনিক সমরবিদ্যার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এই তুর্কি ড্রোন সাম্রাজ্যের পেছনে থাকা মূল কাণ্ডারি কোনো সেনাপ্রধান বা রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি হলেন এক নিভৃতচারী দূরদর্শী প্রকৌশলী। নাম তার ওজদেমির বায়রাক্তার।
আজ তাকে পুরো বিশ্ব চেনে তুরস্কের ড্রোন শিল্পের জনক বা ‘ফাদার অব টার্কিশ ড্রোন’ নামে। ২০০০-এর দশকের শুরুতে যখন পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর নিষেধাজ্ঞা আর পরনির্ভরশীলতায় তুরস্কের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পঙ্গু হওয়ার উপক্রম, ঠিক তখন এক অদম্য প্রতিজ্ঞা নিয়ে বুক বেঁধেছিলেন ওজদেমির। মাত্র একটি ড্রিল মেশিন নিয়ে ইস্তাম্বুলের এক কোণে শুরু হওয়া তার সেই ছোট কর্মশালাই আজ তুরস্ককে পরিণত করেছে বিশ্বের অন্যতম ড্রোন পরাশক্তিতে।

যুবক বয়সে গবেষণায় ব্যস্ত ওজদেমির বায়রাক্তার/ ছবি: বায়কার
শৈশবেই মেধার স্ফুরণ
১৯৪৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ইস্তাম্বুলের সারিয়ের জেলার গারিপচে নামের এক উপকূলীয় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ওজদেমির বায়রাক্তার। তার বাবা লুৎফি রেইস ছিলেন মৎস্যজীবী। কিন্তু শৈশব থেকেই ওজদেমিরের ঝোঁক ছিল যন্ত্রপাতির প্রতি। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি ভাঙা ইলেকট্রনিক ডিভাইস কুড়িয়ে নিজ ঘরে রেডিও তৈরি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন।
আরও পড়ুন>>
লুই ভুটন থেকে টিফানি/ যেভাবে লাক্সারি সাম্রাজ্যের রাজা হলেন বার্নার্ড আর্নল্ট
টিকটক দিয়ে বিশ্ব মাত, ৩৮ বছরেই শীর্ষ ধনীর কাতারে
পরের ধনে পোদ্দারি করেই শত কোটি ডলারের মালিক
পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ওজদেমির ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত কাবাতাস বয়েজ হাই স্কুল থেকে ১৯৬৭ সালে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন তুরস্কের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইস্তাম্বুল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে। ১৯৭২ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করার পর তিনি ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিন (অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন) নিয়ে উচ্চতর গবেষণা ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ইঞ্জিন নিয়ে তার এই গভীর জ্ঞানই পরবর্তীকালে ড্রোনের শক্তিশালী প্রপালশন সিস্টেম তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল।

কাজ করছেন ওজদেমির বায়রাক্তার/ ছবি: বায়কার
‘বায়কার মেশিনারি’র সূচনা
উচ্চশিক্ষা শেষ করে ওজদেমির বায়রাক্তার তুরস্কের বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান যেমন—বুরদুর ট্রাক্টর ও উজেল-এ কারিগরি প্রশাসক হিসেবে কাজ করেন। তবে অন্যের অধীনে কাজ করার চেয়ে নিজের দেশে নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরি করার স্বপ্ন তাকে তাড়া করে বেড়াত।
সেই স্বপ্ন থেকেই ১৯৮৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বায়কার মেশিনারি’। শুরুর গল্পটা অনেকটা রূপকথার মতো। কোনো বিশাল কারখানা বা সরকারি অনুদান নয়, মাত্র একটি বৈদুতিক ড্রিল মেশিন নিয়ে ইস্তাম্বুলের এক ছোট কর্মশালায় শুরু হয় কাজ। শুরুতে এই কোম্পানিটি তুরস্কের নিজস্ব গাড়ি শিল্পের জন্য বিভিন্ন ছোট ছোট মেকানিক্যাল পার্টস বা যন্ত্রাংশ তৈরি করত। ওজদেমির নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যেন তুরস্কের গাড়িগুলোতে কোনো বিদেশি পার্টস ব্যবহার করতে না হয়।

নিজেদের তৈরি ড্রোনের সামনে ওজদেমির বায়রাক্তার/ ছবি: বায়কার
ড্রোন নিয়ে গবেষণা
২০০০-এর দশকের শুরুতে ওজদেমির বায়রাক্তার বুঝতে পারেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে আকাশে এবং সেখানে মানুষের চেয়ে ড্রোন বা মনুষ্যবিহীন আকাশযানের ভূমিকা হবে প্রধান। সে সময়ে তুরস্ক ড্রোন প্রযুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো তুরস্ককে ড্রোন দিতে প্রায়ই নানা শর্ত জুড়ে দিত বা অস্বীকৃতি জানাত।
আরও পড়ুন>>
শ্রমিক থেকে পানি ব্যবসায়ী, আজ চীনের শীর্ষ ধনী
অনলাইনে বইবিক্রেতা থেকে শত কোটির মালিক
বাবার ক্যানসারে ভার্সিটি ছেড়েছিলেন, আজ সুইজারল্যান্ডের শীর্ষ ধনী
এই অপমান ও পরনির্ভরশীলতা ঘোচাতে ওজদেমির তার তিন ছেলে—হালুক, সেলচুক এবং আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে ড্রোনের ওপর মূল গবেষণা শুরু করেন। তার মেজো ছেলে সেলচুক বায়রাক্তার যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত এমআইটি থেকে ড্রোন প্রযুক্তির ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে বাবার সঙ্গে যোগ দেন।
গবেষণার প্রতি ওজদেমিরের নিষ্ঠা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তিনি জীবনের শেষ ২০ বছর বাড়ি যাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। ইস্তাম্বুলের ইকিতাল্লি শিল্প এলাকার কারখানার ল্যাবরেটরিই হয়ে উঠেছিল তার ঘর-সংসার। দিনরাত ল্যাবের কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে ড্রোনের কোডিং ও হার্ডওয়্যার ডিজাইন তদারকি করতেন তিনি।

সেনাবাহিনীর সঙ্গে ড্রোন পরীক্ষা করছেন ওজদেমির বায়রাক্তার/ ছবি: বায়কার
দুর্গম পাহাড়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে
ওজদেমির বায়রাক্তার কেবল ল্যাবরেটরিতে বসে থাকা কোনো ড্রোন গবেষক ছিলেন না। ২০০৫ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে যখন তুরস্কের প্রথম দেশীয় ড্রোন ‘বায়রাক্তার মিনি ইউএভি’র পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল, তখন তিনি সশরীরে চলে যান দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়ার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে।
সে সময় ওই অঞ্চলে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী পিকেকের বিরুদ্ধে তুর্কি বাহিনী অভিযান চালাচ্ছিল। ওজদেমির বায়রাক্তার তুর্কি সেনাদের সঙ্গে বাঙ্কারে থেকেছেন, তাদের সঙ্গে সাধারণ খাবার খেয়েছেন এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় ড্রোনগুলো কীভাবে কাজ করছে তা নিজে নোট করেছেন। সেনাদের ফিডব্যাক অনুযায়ী তিনি ড্রোনের সফটওয়্যারে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনতেন। একজন বেসামরিক প্রকৌশলীর ড্রোন পরীক্ষার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধক্ষেত্রের এত কাছে থাকার নজির ইতিহাসে বিরল।

টিবি২ ড্রোনের সামনে ওজদেমির বায়রাক্তার/ ছবি: বায়কার
ড্রোন শিল্পে বড় অবদান
ওজদেমির বায়রাক্তারের নকশা করা ড্রোনগুলো আজ বিশ্ব সামরিক কৌশলের পাঠ্যবই বদলে দিয়েছে। তার সবচেয়ে বড় দুটি অবদান হলো:
বায়রাক্তার টিবি২: এটি বিশ্বের সবচেয়ে ‘কম্ব্যাট-প্রুভেন’ বা যুদ্ধ-পরীক্ষিত ড্রোন হিসেবে পরিচিত। মাত্র কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের এই ড্রোনটি রাশিয়ার কোটি কোটি ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ট্যাংক ধ্বংস করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। এই ড্রোনের কারণে আজ বিশ্বের অন্তত ৩৪টিরও বেশি দেশ বায়কারের গ্রাহক।
বায়রাক্তার আকিন্সি: এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির হেভি-ডিউটি ড্রোন। এটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে সক্ষম এবং এর ভেতরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অনন্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন ওজদেমির।
২০২০ সালে নাগারনো-কারাবাখ যুদ্ধে আজারবাইজানের বিজয়ে এই ড্রোনের অনবদ্য ভূমিকার জন্য আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ ২০২১ সালে ওজদেমির বায়রাক্তারকে দেশটির সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘অর্ডার অব কারাবাখ’-এ ভূষিত করেন।

ড্রোনের সামনে ওজদেমির বায়রাক্তার/ ছবি: বায়কার
এক চিরন্তন লিগ্যাসি
কঠোর পরিশ্রম এবং দেশের প্রতিরক্ষা খাতকে স্বাবলম্বী করার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ওজদেমির নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি কখনোই নজর দেননি। ২০২১ সালের ১৮ অক্টোবর ৭২ বছর বয়সে ইস্তাম্বুলে এই মহান প্রকৌশলী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার মৃত্যুর পর সুযোগ্য পুত্র ও বায়কারের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা সেলচুক বায়রাক্তার টুইট করেছিলেন, ‘আমার প্রিয় বাবা, আমার পথপ্রদর্শক এবং দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ের মূল সেনানী আজ চলে গেছেন। তিনি তার রক্ত, জীবন ও স্বাস্থ্য আমাদের জাতির পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গ করে গেছেন।’
বর্তমানে ওজদেমির বায়রাক্তারের রেখে যাওয়া আদর্শ ও প্রতিষ্ঠানকে স্মরণে রেখে তুরস্কের বিভিন্ন শহরে তৈরি হয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্যাম্পাস। সেখানে নতুন প্রজন্মের শিশুদের বিনামূল্যে মহাকাশ বিজ্ঞান, এভিয়েশন এবং রোবোটিক্সের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
ওজদেমির বায়রাক্তার কেবল একটি ড্রোন কোম্পানির মালিক বা প্রকৌশলী ছিলেন না, তিনি ছিলেন তুরস্কের আত্মমর্যাদার প্রতীক। একটি ছোট ঘরে মাত্র একটি ড্রিল মেশিন নিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ তুরস্কের আকাশ সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, সদিচ্ছা এবং সঠিক দূরদর্শিতা থাকলে প্রযুক্তির দুনিয়ায় যে কোনো পরাশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব।
সূত্র: বায়কার, টিআরটি ওয়ার্ল্ড, বিবিসি, বারাকাহ ইনসাইডার
কেএএ/
What's Your Reaction?