তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি শুরু হয়ে গেছে? এখন বাংলাদেশ কী করবে

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরে এই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অনেক বিশ্লেষককে একটি নতুন প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছে। এটি কি শুধুই একটি আঞ্চলিক সংঘাত, নাকি এর পেছনে আরও বড় শক্তির প্রতিযোগিতা কাজ করছে? বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিকে বোঝার জন্য ইরান ও ইসরায়েল সংঘাতকে আলাদা করে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, এই সংঘাতের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ছায়া ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গত কয়েক বছরে ইরান ও চীনের সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলো বলছে, ইরানের তেলের বড় অংশ এখন চীনে রপ্তানি হয়। এতে একদিকে ইরান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কিছুটা স্বস্তি পায়, অন্যদিকে চীন কম দামে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারে। পাশাপাশি সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেই বিষয়টি শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সীমা ছাড়িয়ে যায়। চীন, রাশিয়া এবং ইরান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিকবার যৌথ নৌম

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি শুরু হয়ে গেছে? এখন বাংলাদেশ কী করবে

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরে এই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো অনেক বিশ্লেষককে একটি নতুন প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছে। এটি কি শুধুই একটি আঞ্চলিক সংঘাত, নাকি এর পেছনে আরও বড় শক্তির প্রতিযোগিতা কাজ করছে?

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিকে বোঝার জন্য ইরান ও ইসরায়েল সংঘাতকে আলাদা করে দেখলে পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, এই সংঘাতের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ছায়া ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গত কয়েক বছরে ইরান ও চীনের সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলো বলছে, ইরানের তেলের বড় অংশ এখন চীনে রপ্তানি হয়। এতে একদিকে ইরান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কিছুটা স্বস্তি পায়, অন্যদিকে চীন কম দামে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারে। পাশাপাশি সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

এখানেই বিষয়টি শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সীমা ছাড়িয়ে যায়। চীন, রাশিয়া এবং ইরান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিকবার যৌথ নৌমহড়া পরিচালনা করেছে। পারস্য উপসাগর ও আশপাশের অঞ্চলে তাদের কৌশলগত সমন্বয় বাড়ছে বলেও বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রভাবিত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থিত। বিশ্বের একটি বড় অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই অঞ্চলে অন্য কোনো বড় শক্তির কৌশলগত উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বাভাবিকভাবেই একটি উদ্বেগের বিষয়।

আজকের বিশ্ব হয়তো এখনও পূর্ণাঙ্গ বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ করেনি, কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি স্পষ্টভাবেই একটি নতুন শক্তি প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিচক্ষণতা, ভারসাম্য এবং দূরদর্শিতা। বড় শক্তির সংঘাতের ভেতরেও নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা, অর্থনৈতিক প্রস্তুতি শক্তিশালী করা এবং শান্তিনির্ভর কূটনীতিকে সামনে নিয়ে যাওয়াই হতে পারে বাংলাদেশের নিরাপদ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের পথ।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর সাম্প্রতিক হামলাকে শুধু ইরান ও ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। তারা মনে করেন, এটি এমন এক বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন যেখানে বড় শক্তিগুলো সরাসরি যুদ্ধ না করেও বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে তাহলে কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে?

বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। আজকের বিশ্বে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত এখনও ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়ার মতো শক্তিগুলো একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করা যায় না যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নতুন ধরনের প্রতিযোগিতা ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

এই প্রতিযোগিতা প্রকাশ পাচ্ছে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতের মাধ্যমে। ইউক্রেন যুদ্ধ, তাইওয়ান নিয়ে উত্তেজনা, দক্ষিণ চীন সাগরে বিরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বিশ্লেষকের কাছে একই বৃহত্তর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। অর্থাৎ বিশ্ব রাজনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে আঞ্চলিক সংঘাতগুলো ধীরে ধীরে বড় শক্তির প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।

এর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি জ্বালানি নিরাপত্তা। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। যদি এই অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে বা এই পথ বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মক ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি তখন অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।

এই বাস্তবতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এমন কথা এখনই বলা কঠিন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে বিশ্ব রাজনীতি একটি নতুন শক্তি প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করেছে। এখানে সরাসরি যুদ্ধের বদলে কৌশলগত চাপ, প্রক্সি সংঘাত, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাই বড় শক্তিগুলোর মূল অস্ত্র হয়ে উঠছে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার যুগে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোকে অত্যন্ত সতর্ক ও বাস্তববাদী হতে হয়।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপ বা আঞ্চলিক শক্তি সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে সবচেয়ে বিচক্ষণ কূটনৈতিক পথ। কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ও সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তাই বিকল্প জ্বালানি উৎস, এলএনজি সরবরাহের বৈচিত্র্য এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য। বৈশ্বিক অস্থিরতার সময় একটি দেশের অর্থনীতি যদি সীমিত কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে সেই দেশ দ্রুত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাই বাংলাদেশের জন্য নতুন রপ্তানি বাজার এবং নতুন অর্থনৈতিক অংশীদার তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

সবশেষে, বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শান্তি, সংলাপ এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। ইতিহাস দেখিয়েছে যে বড় শক্তির সংঘাতের সময় ছোট দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আজকের বিশ্ব হয়তো এখনও পূর্ণাঙ্গ বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ করেনি, কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি স্পষ্টভাবেই একটি নতুন শক্তি প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করেছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিচক্ষণতা, ভারসাম্য এবং দূরদর্শিতা। বড় শক্তির সংঘাতের ভেতরেও নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা, অর্থনৈতিক প্রস্তুতি শক্তিশালী করা এবং শান্তিনির্ভর কূটনীতিকে সামনে নিয়ে যাওয়াই হতে পারে বাংলাদেশের নিরাপদ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের পথ।

লেখক :  সিনিয়র আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।

এইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow