দারিদ্র্য ও অপমান সয়েও সফল বগুড়ার ‘মিষ্টি কুমড়া রানি’

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানহাটের পরিচিত মুখ শিরিন তিনি পরিচিত ‘মিষ্টি কুমড়া রানি’ নামে একসময় দুই বেলা খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না প্রতিদিন ৫-৮ টন মিষ্টি কুমড়া বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ শিরিন পরিশ্রম দিয়ে সবাইকে ভুল প্রমাণ করেছেন কোলে এক বছরের শিশু। গর্ভে আরেক সন্তান। একটি ছোট গামছায় বাঁধা কয়েকটি কাপড়ই তখন তার সম্বল। পেছনে ফেলে এসেছেন ভাঙা সংসার, সামনে শুধুই অনিশ্চয়তা। অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানেই হয়তো থেমে যাবে এক নারীর জীবন। কিন্তু থামেননি তিনি। চোখের জলকে শক্তিতে বদলে নতুন করে শুরু করেছিলেন জীবনযুদ্ধ। আজ সেই নারীই বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানহাটের পরিচিত মুখ। শুধু মহাস্থান নয়, দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি সবজি বাজারে তিনি পরিচিত ‘মিষ্টি কুমড়া রানি’ নামে। ঠাকুরগাঁও থেকে চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনাসহ দেশের নানা প্রান্তে সবজিবাহী ট্রাকে নিয়মিত যায় তার সংগ্রহ করা মিষ্টি কুমড়া। পাইকাররা এক নামে চেনেন ‘শিরিন আপার কুমড়া’। একসময় দুই বেলা খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না। আজ তার ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও আড়তদার মিলিয়ে কয়েক ডজন মানুষের জীবিকা। সংগ্রামকে পুঁজি কর

দারিদ্র্য ও অপমান সয়েও সফল বগুড়ার ‘মিষ্টি কুমড়া রানি’
  • বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানহাটের পরিচিত মুখ শিরিন
  • তিনি পরিচিত ‘মিষ্টি কুমড়া রানি’ নামে
  • একসময় দুই বেলা খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না
  • প্রতিদিন ৫-৮ টন মিষ্টি কুমড়া বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ
  • শিরিন পরিশ্রম দিয়ে সবাইকে ভুল প্রমাণ করেছেন

কোলে এক বছরের শিশু। গর্ভে আরেক সন্তান। একটি ছোট গামছায় বাঁধা কয়েকটি কাপড়ই তখন তার সম্বল। পেছনে ফেলে এসেছেন ভাঙা সংসার, সামনে শুধুই অনিশ্চয়তা। অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানেই হয়তো থেমে যাবে এক নারীর জীবন। কিন্তু থামেননি তিনি। চোখের জলকে শক্তিতে বদলে নতুন করে শুরু করেছিলেন জীবনযুদ্ধ।

আজ সেই নারীই বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানহাটের পরিচিত মুখ। শুধু মহাস্থান নয়, দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি সবজি বাজারে তিনি পরিচিত ‘মিষ্টি কুমড়া রানি’ নামে। ঠাকুরগাঁও থেকে চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনাসহ দেশের নানা প্রান্তে সবজিবাহী ট্রাকে নিয়মিত যায় তার সংগ্রহ করা মিষ্টি কুমড়া। পাইকাররা এক নামে চেনেন ‘শিরিন আপার কুমড়া’।

একসময় দুই বেলা খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না। আজ তার ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও আড়তদার মিলিয়ে কয়েক ডজন মানুষের জীবিকা। সংগ্রামকে পুঁজি করে নিজের পরিচয় গড়ে তোলা এই নারী এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার নাম।

অভাবের সংসার থেকে অকাল বিয়ে

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থান গ্রামের নাগরকান্দি এলাকায় জন্ম শিরিন আক্তারের। বাবা আফজাল হোসেন ফকির কাঠের স’মিলে শ্রমিক ছিলেন। মা জহুরা বেগম গৃহিণী। পাঁচ ভাই-বোনের সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। ভাঙা টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ত ঘরে। অনেক দিনই দুবেলা খাবার জুটত না।

এরই মধ্যে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ভালোবেসে বিয়ে করেন এক বিবাহিত ট্রাকচালককে। কিন্তু সুখের সংসার গড়ার স্বপ্ন খুব দ্রুতই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। সতীনের নির্যাতন, স্বামীর অবহেলা আর মানসিক যন্ত্রণায় একসময় ভেঙে পড়ে সংসার। শেষ পর্যন্ত তালাক দিয়ে দেওয়া হয় তাকে। ২০০৩ সালে কোলে এক শিশু সন্তান আর গর্ভে আরেক সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন শিরিন। সেই ফেরাটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত।

shirin

ছোট্ট পানের দোকান থেকেই বদলে যায় জীবন

অভাবের সংসারে অন্যের করুণা নয়, নিজের পরিশ্রমকেই ভরসা করেন তিনি। দুই সন্তানকে নিয়ে শুরু করেন একটি ছোট্ট পানের দোকান। সেখান থেকেই ব্যবসার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে বরবটি ও শিম কেনাবেচা শুরু করেন। এরপর নিয়মিত যেতে থাকেন মহাস্থানের বৃহৎ সবজি হাটে। ভোরে কৃষকদের কাছ থেকে সবজি সংগ্রহ করতেন, আবার নিজেই বিক্রিও করতেন। পরে সেই সবজি ঢাকাসহ সিলেট ও চট্টগ্রামের বাজারে পাঠাতে শুরু করেন।

দুই দশক আগে মহাস্থানহাটে একজন নারীকে পাইকারি সবজি ব্যবসা করতে দেখা ছিল বিরল ঘটনা। হাটে আসার পর কটূক্তি, তাচ্ছিল্য, অপমান কিছুই বাদ যায়নি। কেউ কেউ কুপ্রস্তাবও দিয়েছেন। অনেকেই বলতেন, মেয়েমানুষ হয়ে হাটে ব্যবসা করবে?

শিরিন আক্তার বলেন, ‘আমি কারো কথায় কান দিইনি। অপমান শুনেছি, কিন্তু লক্ষ্য থেকে একচুলও সরিনি। মনে করেছি, কাজই একদিন সব প্রশ্নের উত্তর দেবে।’

তবে লড়াই শুধু সমাজের সঙ্গেই ছিল না। ব্যবসার শুরুতে কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা হারান তিনি। অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না। কিন্তু সেই ধাক্কাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় হয়ে ওঠে।

মিষ্টি কুমড়াতেই সাফল্য

ক্ষতির পর নতুন করে ভাবতে শুরু করেন তিনি। বাজার বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারেন, মিষ্টি কুমড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। শুরু করেন শুধু মিষ্টি কুমড়ার ব্যবসা। প্রথমদিকে প্রতিটি কুমড়া কিনতেন ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। বিক্রি করতেন ৩৫ থেকে ৩৮ টাকায়। লাভ হতো মাত্র ৫ থেকে ৮ টাকা। দিনে ৮০ থেকে ১০০টি কুমড়া বিক্রি করেই সন্তুষ্ট থাকতে হতো। কিন্তু তিনি শুধু বর্তমান বাজার দেখেননি, ভবিষ্যতের বাজারও বুঝেছিলেন।

মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের সঙ্গে অগ্রিম চুক্তি করে ক্ষেতের কুমড়া বুকিং দেওয়া শুরু করেন। ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকেন। পরে ট্রাকভর্তি কুমড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাতে শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ওজন হিসেবে প্রতি মণ কুমড়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে কিনে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার পাইকারদের কাছে প্রতি মণে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত লাভে বিক্রি করেন। মৌসুমে প্রতিদিন তার মাধ্যমে ৫ থেকে ৮ টন পর্যন্ত মিষ্টি কুমড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়।

shirin

কৃষক থেকে পাইকার

শুধু কেনাবেচা নয়, ব্যবসাকে আরও পেশাদার করেছেন শিরিন। নিজ বাড়ির পাশে তৈরি করেছেন বাতাস চলাচল উপযোগী সংরক্ষণাগার। অতিপাকা কুমড়া আলাদা রাখা হয়। পচন ঠেকাতে ছায়াযুক্ত শুকনো পরিবেশে সংরক্ষণ করা হয়। প্রতিদিন মোবাইল ফোনে দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্ডার নেন। এরপর স্থানীয় পরিবহনের মাধ্যমে সময়মতো পণ্য পাঠিয়ে দেন। এখন তার পরিকল্পনা আরও বড়। ভবিষ্যতে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ‘মিষ্টি কুমড়া রানি শিরিন আক্তার’ নামে নিজস্ব ব্র্যান্ড চালু করতে চান।

একসময় যে নারী দুই বেলা খাবারের চিন্তায় থাকতেন, আজ সেই ব্যবসার আয় দিয়ে কিনেছেন জমি, নির্মাণ করেছেন পাকা বাড়ি। ছেলেকে আলাদা বাড়ি করে দিয়েছেন এবং ব্যবসায় দাঁড় করিয়েছেন। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। নিজেও বর্গা জমি নিয়ে কৃষিকাজ করেন। সামনে একটি আধুনিক পোলট্রি খামার গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে তার।

সাফল্যের পথও তার জন্য সহজ ছিল না। পিঠ ও পায়ে দুই দফা বড় অস্ত্রোপচারে প্রায় ১২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এখনো প্রতিদিন ওষুধের পেছনে খরচ হয় প্রায় ১ হাজার টাকা। আগের মতো মাঠে ছুটতে পারেন না। তাই ১৫ জন কর্মীর একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। তারা মাঠে কাজ করলেও পুরো ব্যবসার পরিকল্পনা, ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবস্থাপনা এখনো তিনিই দেখেন।

শিরিন আক্তার বলেন, ‘এখন শরীর আগের মতো নেই। কিন্তু ব্যবসার প্রতিটি সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নিই। মাঝে মাঝে হাটে বসে কেনাবেচাও করি। এটা আমার ভালো লাগার জায়গা। আমি চাই, কোনো নারী যেন কারো কাছে হাত না পাতে। সবাই নিজের পায়ে দাঁড়াক।’

শিরিন আপা আমাদের অনুপ্রেরণা

মহাস্থানহাটে ১৫ বছর ধরে সবজি ব্যবসা করছেন রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘শিরিন আপা যখন প্রথম হাটে আসতেন; তখন আমরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। একা একজন নারী পেটি টেনে কুমড়া তুলছেন, দরদাম করছেন, লেনদেন করছেন। আজ তার কুমড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়। এটা আমাদের জন্যও গর্বের।’

আড়তদার আনোয়ার হোসেন বাবু বলেন, ‘শুরুতে অনেকে হাসাহাসি করত। কিন্তু শিরিন পরিশ্রম দিয়ে সবাইকে ভুল প্রমাণ করেছে। এখন অনেক পাইকার আগে থেকেই তার পণ্যের অপেক্ষায় থাকেন।’

shirin

হাট কমিটির সদস্য ও ব্যবসায়ী কুদ্দুস আলী বলেন, ‘আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে ব্যবসা করছি। শিরিন আপার মতো আত্মনির্ভর, সৎ ও পরিশ্রমী নারী খুব কম দেখেছি। নতুন যারা ব্যবসায় আসছেন, তাদের কাছেও তিনি অনুকরণীয়।’

মহাস্থানহাটে আজও ভোর হলে ট্রাক আসে, কৃষক আসে, পাইকার আসে। সেই ভিড়ের মধ্যেই একসময় অপমান সয়ে পথচলা শুরু করা নারীকে সবাই এখন সম্মানের চোখে দেখে। যে নারী একদিন ভাঙা সংসার, দারিদ্র্য আর সমাজের অবহেলা নিয়ে ফিরে এসেছিলেন বাবার বাড়িতে। আজ তিনিই দেশের বিভিন্ন জেলার সবজি ব্যবসায়ীদের কাছে নির্ভরতার আরেক নাম। মহাস্থানহাটের মানুষ তাকে এখন আর শুধু শিরিন আক্তার বলে চেনে না। তাদের কাছে তিনি একটাই নাম ‘মিষ্টি কুমড়া রানি’।

এলবি/এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow