দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন বোর্ড পরীক্ষা হয় কোন দেশে জানেন?
বাংলাদেশে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যেমন উত্তেজনা তৈরি হয়, তেমনি বিশ্বের অনেক দেশে একটি পরীক্ষাকে ঘিরে বছরের পর বছর চলে প্রস্তুতি। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সুনেউং আর চীনের গাওকাও যেন সেই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে কঠিন দুই উদাহরণ। দুটিই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরীক্ষা। কিন্তু একটি পরীক্ষার দিনকে ঘিরে গোটা দেশের রুটিন বদলে যায়, অন্যটিকে ঘিরে কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই চলে। প্রশ্ন হলো, কোনটি বেশি কঠিন-কোরিয়ার সুনেউং, নাকি চীনের গাওকাও? আসুন বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন দুটি পাবলিক পরীক্ষার আদ্যোপান্ত জেনে নেওয়া যাক- সুনেউং কী? দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সরকারি নাম কলেজ স্কোলাস্টিক অ্যাবিলিটি টেস্ট (সিএসএটি)। কোরিয়ান ভাষায় এটি পরিচিত ‘সুনেউং’ নামে। প্রতিবছর নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় দেশটির উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। সুনেউং কেবল একটি পরীক্ষা নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় এটি একটি বড় সামাজিক ঘটনা। পরীক্ষার ফল শিক্ষার্থীর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ কতটা, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
বাংলাদেশে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যেমন উত্তেজনা তৈরি হয়, তেমনি বিশ্বের অনেক দেশে একটি পরীক্ষাকে ঘিরে বছরের পর বছর চলে প্রস্তুতি। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সুনেউং আর চীনের গাওকাও যেন সেই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে কঠিন দুই উদাহরণ। দুটিই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরীক্ষা। কিন্তু একটি পরীক্ষার দিনকে ঘিরে গোটা দেশের রুটিন বদলে যায়, অন্যটিকে ঘিরে কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই চলে।
প্রশ্ন হলো, কোনটি বেশি কঠিন-কোরিয়ার সুনেউং, নাকি চীনের গাওকাও? আসুন বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন দুটি পাবলিক পরীক্ষার আদ্যোপান্ত জেনে নেওয়া যাক-
সুনেউং কী?
দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সরকারি নাম কলেজ স্কোলাস্টিক অ্যাবিলিটি টেস্ট (সিএসএটি)। কোরিয়ান ভাষায় এটি পরিচিত ‘সুনেউং’ নামে। প্রতিবছর নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় দেশটির উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।
সুনেউং কেবল একটি পরীক্ষা নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় এটি একটি বড় সামাজিক ঘটনা। পরীক্ষার ফল শিক্ষার্থীর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ কতটা, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে দেশটির শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন সীমিত হওয়ায় প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র।
পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীরা মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেয়। পড়াশোনার পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন বেসরকারি কোচিং বা ‘হাগওন’-এ যায়। ফলে কোরিয়ায় পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ও প্রতিযোগিতা নিয়ে সামাজিক বিতর্কও রয়েছে।
এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শুধু শিক্ষার্থী নয়, পুরো দেশই বিশেষ প্রস্তুতি নেয়
পরীক্ষার দিন বদলে যায় কোরিয়া
সুনেউংয়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শুধু শিক্ষার্থী নয়, পুরো দেশই বিশেষ প্রস্তুতি নেয়। পরীক্ষার্থীরা যাতে সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে, সেজন্য পরীক্ষার দিন পরিবহনব্যবস্থায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ইংরেজি শ্রবণ পরীক্ষা চলার সময় বিমান ওঠানামার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। শব্দদূষণ কমাতে বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ সতর্কতা থাকে। পরীক্ষার্থীদের দেরি হয়ে গেলে পুলিশ পর্যন্ত তাদের কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে সহায়তা করে। অর্থাৎ সুনেউং শুধু শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নয়, এটি যেন পুরো সমাজের সম্মিলিত পরীক্ষা।
কী থাকে সুনেউংয়ে?
সুনেউংয়ে সাধারণত কোরিয়ান ভাষা, গণিত, ইংরেজি, কোরিয়ান ইতিহাস, সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও দ্বিতীয় ভাষা/ক্লাসিক্যাল চীনা ভাষার মতো বিষয় থাকে। তবে শিক্ষার্থীর নির্বাচিত বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ভর্তি পরিকল্পনার ওপর পরীক্ষার কিছু অংশ নির্ভর করে।
পরীক্ষার অন্যতম কঠিন দিক হলো সময় ব্যবস্থাপনা। প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সঠিকভাবে উত্তর দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ভাষা ও গণিতের প্রশ্নে দীর্ঘ ও জটিল সমস্যা সমাধান করতে হয়। ইংরেজি পরীক্ষার শ্রবণ অংশও গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রেখে অডিও শুনে দ্রুত উত্তর দিতে হয়। এ সময় সামান্য শব্দও শিক্ষার্থীদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
চীনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা গাওকাও বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা
এবার আসুন জেনে নেওয়া যাক চীনের গাওকাও সম্পর্কে
চীনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা গাওকাও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের অনেকের কাছেই গাওকাও শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা নয়, বরং জীবনের গতিপথ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
গাওকাও সাধারণত একাধিক দিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়। অঞ্চলভেদে পরীক্ষার বিষয় ও কাঠামোয় কিছু পার্থক্য থাকলেও চীনা ভাষা, গণিত এবং বিদেশি ভাষা সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীর নির্বাচিত ধারার ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞান বা মানবিক বিভাগের বিভিন্ন বিষয় যুক্ত হয়।
গাওকাও কেন এত কঠিন?
গাওকাওয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর বিশাল প্রতিযোগিতা। চীনের জনসংখ্যা বিপুল হওয়ায় প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। বিশেষ করে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন সীমিত। ফলে একজন শিক্ষার্থী ভালো নম্বর পেলেও কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা পাওয়া নিশ্চিত নয়। এখানে শুধু মেধা নয়, পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন ও ক্যারিয়ারের সম্ভাবনাও অনেকাংশে যুক্ত হয়ে যায়। তাই চীনের অনেক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকের শেষ কয়েক বছর প্রায় পুরোপুরি গাওকাও প্রস্তুতিতে ব্যয় করে।
চীনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা গাওকাও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা
গাওকাওয়ের জন্য জীবনযাপনও বদলে যায়
চীনের অনেক এলাকায় শিক্ষার্থীরা ভোরে উঠে পড়াশোনা শুরু করে এবং রাত পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যায়। স্কুলে দীর্ঘ সময় ক্লাস ও অনুশীলনের পাশাপাশি বাড়িতেও চলে প্রস্তুতি। পরিবারগুলোও সন্তানদের পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করতে নানা ধরনের ত্যাগ স্বীকার করে। পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমানোর জন্য কোথাও কোথাও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরীক্ষাকেন্দ্রের আশপাশে যানজট, শব্দদূষণ ও অনিয়ম ঠেকাতেও প্রশাসন সতর্ক থাকে।
সবচেয়ে কঠিন কোনটা-সুনেউং নাকি গাওকাও
দুটি পরীক্ষার মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো কাঠামো ও প্রতিযোগিতার ধরন। সুনেউংয়ের ক্ষেত্রে পরীক্ষার নির্দিষ্ট সময়, মানসম্মত প্রশ্নপত্র এবং দেশব্যাপী একই ধরনের পরীক্ষা ব্যবস্থার কারণে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। পরীক্ষার একটি নম্বরও অনেক সময় শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয় বাছাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে গাওকাওয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বর, অঞ্চলভিত্তিক ভর্তি নীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন এবং শিক্ষার্থীর পছন্দ-সব মিলিয়ে প্রতিযোগিতার চিত্র আরও জটিল। সুনেউংয়ের বিশেষত্ব হলো একটি পরীক্ষাকে ঘিরে গোটা দেশের অংশগ্রহণ। আর গাওকাওয়ের বিশেষত্ব হলো বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা।
তাই কোনটি বেশি কঠিন, এর সরাসরি উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ দুটি পরীক্ষার কাঠামো ও উদ্দেশ্য এক নয়। ‘কঠিন’ বিষয়টি নির্ভর করে প্রশ্নের জটিলতা, পরীক্ষার সময়, প্রতিযোগিতার মাত্রা, শিক্ষার্থীর ওপর মানসিক চাপ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সম্ভাবনার ওপর।
সুনেউংয়ের ক্ষেত্রে একটি দিনের পরীক্ষায় দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে মনোযোগ ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে গাওকাওয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘ প্রস্তুতি, বিপুল প্রতিযোগিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য নম্বরের গুরুত্ব শিক্ষার্থীদের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করে। তাই এক কথায় বলা যায়, সুনেউং হলো নিখুঁত প্রস্তুতি ও সময় ব্যবস্থাপনার পরীক্ষা, আর গাওকাও হলো দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও তীব্র প্রতিযোগিতার পরীক্ষা।
চীনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা গাওকাও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা
পরীক্ষার বাইরেও রয়েছে আলাদা গল্প
এই দুই পরীক্ষার গল্প শুধু কঠিন প্রশ্ন কিংবা ভালো নম্বর পাওয়ার লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা। দক্ষিণ কোরিয়ায় সুনেউংয়ের দিন বিমান চলাচল থেকে শুরু করে যানবাহন পর্যন্ত বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় আসে। চীনে গাওকাওকে ঘিরে শিক্ষার্থী ও পরিবারের দীর্ঘ প্রস্তুতি গোটা সমাজে আলাদা আবহ তৈরি করে।
বাংলাদেশের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছে ফল প্রকাশ যেমন দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, তেমনি কোরিয়া ও চীনের লাখো শিক্ষার্থীর কাছে সুনেউং ও গাওকাও বছরের পর বছর পরিশ্রমের চূড়ান্ত পরীক্ষা। তাই কোন পরীক্ষাটি ‘দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন’ তার চেয়ে বড় সত্য হলো, এই দুই পরীক্ষা দেখিয়ে দেয় একটি পরীক্ষাকে ঘিরে একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার ও সমাজ কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে যেতে পারে।
কেএসকে
What's Your Reaction?