দেশে প্রথমবারের মতো একদিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আজ

নানা আলোচনা ও জল্পনার পর আজ বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় নির্বাচনের পর এই নির্বাচন কবে হবে, কিংবা আদৌ হবে কিনা এ নিয়ে নানা প্রশ্নও ছিল। এতসব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। একইসঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটেও ভোট দিবেন দেশের প্রায় পৌনে তেরো কোটি ভোটার। বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। এ সময় তিনি আগামী নির্বাচনকে ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন আখ্যা দিয়ে ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনের সাক্ষী হতে পারব। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে শেরপুর-৩ আসনের একজন প্রার্থী মারা গেছেন। এজন্য ওই আসনে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। ফলে ২৯৯টি আসনে অনুষ্ঠিত হবে ভোট। এতে ৫০টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলে লড়বেন ১৭৫৫ প্রার্থী। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সর

দেশে প্রথমবারের মতো একদিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আজ

নানা আলোচনা ও জল্পনার পর আজ বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় নির্বাচনের পর এই নির্বাচন কবে হবে, কিংবা আদৌ হবে কিনা এ নিয়ে নানা প্রশ্নও ছিল। এতসব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। একইসঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটেও ভোট দিবেন দেশের প্রায় পৌনে তেরো কোটি ভোটার।

বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। এ সময় তিনি আগামী নির্বাচনকে ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন আখ্যা দিয়ে ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনের সাক্ষী হতে পারব।

নির্বাচনের কয়েক দিন আগে শেরপুর-৩ আসনের একজন প্রার্থী মারা গেছেন। এজন্য ওই আসনে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। ফলে ২৯৯টি আসনে অনুষ্ঠিত হবে ভোট। এতে ৫০টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলে লড়বেন ১৭৫৫ প্রার্থী। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া। যে কারণে ভোটার উপস্থিতি নিয়েও এক ধরনের শঙ্কা দেখা গিয়েছিল।

তবে, এবারের নির্বাচনে দুদিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। আরও দুদিন সরকারি ছুটি থাকায় বাস, ট্রেন ও লঞ্চে ভিড় ঠেলে অনেককে বাড়ি যেতে দেখা গেছে; আমেজ ছিল অনেকটা ঈদ উৎসবের মতোই। আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া ভোট হলেও বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে সারা দেশে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের বেশিরভাগই অংশ নিতে পারেনি। যে কারণে এবারের নির্বাচন ঘিরে মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি। তবে তারা এটিও বলছেন যে যদি এই নির্বাচন নিয়েও কোনো প্রশ্ন তৈরি হয় তা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য সংকট আরো বাড়াবে।

বহুল প্রত্যাশিত সংসদ নির্বাচন

মাত্র দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মাত্র দুই বছরের মাথায় আরো একটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মূলত বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। ওই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের তিনদিন পর, ৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই বিএনপিসহ একাধিক রাজনৈতিক দল দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের দাবি তোলে। এ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপির মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতির এক পর্যায়ে গত বছরের জুনে লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। এরপর নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে যায়।

২০২৫ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে অধ্যাপক ইউনূস ঘোষণা দেন, রমজানের আগে ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবুও নির্বাচন আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সংশয় ছিল। অবশেষে ডিসেম্বর মাসে তফসিল ঘোষণা করা হয়। তবে তফসিল ঘোষণার পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত প্রায় দুই দশকের নির্বাচনী অভিজ্ঞতায় ভোটারদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। ফলে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। 

বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরে মাত্র তিনটি নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ছিল; ২০০১ সালের পরের নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাই এই নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনও ভোটের আগের দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একে দেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করে ভোটারদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।

তরুণ ভোটারদের ভূমিকা

এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ তরুণ ভোটার প্রথমবার বা নতুন প্রজন্ম হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। ফল নির্ধারণে তরুণ ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

সারা দেশে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে। এর মধ্যে ২১ হাজার ৫০৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভোটগ্রহণে দায়িত্ব পালন করবেন ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে রয়েছেন ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিসাইডিং অফিসার, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং অফিসার।

২৯৯টি আসনে ৬০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশ নিচ্ছে। দলীয় প্রার্থী রয়েছেন ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী ৮৩ জন। তাদের ৬৩ জন দলীয় এবং ২০ জন স্বতন্ত্র। পুরুষ প্রার্থী রয়েছেন ১ হাজার ৯৪৬ জন।

কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা

ভোটগ্রহণ চলবে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় ফলাফল ঘোষণায় সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৯ লাখের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১ লাখ ৩ হাজার, নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৫০০ সদস্য রয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন, সিসি ক্যামেরা ও বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের জন্য সব ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ফলাফল ঘোষণা নিয়ে প্রস্তুতি

এবার প্রথমবারের মতো প্রবাসী ভোটার ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। ফলে কেন্দ্রের ভোটের পাশাপাশি পোস্টাল ব্যালটও গণনা করতে হবে।

প্রতিটি কেন্দ্রে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যালট আলাদাভাবে গণনা করা হবে। ফলাফল কেন্দ্রেই টানানো হবে এবং নির্দিষ্ট ফরমে প্রস্তুত করে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। রিটার্নিং কর্মকর্তারা পোস্টাল ব্যালটসহ সব ফলাফল একত্র করে আসনভিত্তিক চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করবেন। এরপর নির্বাচন কমিশন পর্যায়ক্রমে আসনভিত্তিক ফল প্রকাশ করবে।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ভোট শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হতে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow