দেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। এসব রোগের মধ্যে বার্ধক্যজনিত সমস্যা, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগ, স্ট্রোক ও পক্ষাঘাত অন্যতম। ৬৭ শতাংশ রোগীরই এসব রোগব্যাধিতে মৃত্যু হয়।
শুধু তাই নয়, শুনতে অবাক লাগলেও এ কথা সত্যি যে, শুধু একবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েই নিজের পকেট থেকে প্রত্যেক রোগীকে খরচ করতে হয় ৫৫ হাজার ১৩৪টাকা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ বিআইডিএস- ২০২৪ এর প্রতিবেদনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খানকে প্রধান করে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত ১২ সদস্যের স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্কার কমিশন সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেন। সেই প্রতিবেদনে বিআইডিএস এর বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণের স্বাস্থ্যের মাত্রা কোন স্তরে আছে (দি গ্লোবাল পজিশনিং অব হেলথ স্ট্যাটাস) তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপ প্রতিবেদনে উঠে আসে। গ্লোবাল কোয়ালিটি অব লাইফ ইনডেক্স- ২০২৪ এর জরিপ অনুযায়ী বিশ্বের ৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শুধু নাইজেরিয়ার ওপরে! অন্যদিকে, লন্ডনভিত্তিক ‘ইনক্লুসিভ হেলথ সিস্টেম স্কোর’ জরিপের তথ্যমতে পৃথিবীর ৪০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান সর্বনিম্নে।
স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশের জনগণের মধ্যে মূল স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলো বস্তুত অসংক্রামক রোগভিত্তিক। এ রোগগুলো থেকে শতকরা ৬৭ ভাগ মৃত্যু ঘটছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- বার্ধক্যজনিত সমস্যা, স্ট্রোক, প্যারালাইসিস, সেরিব্রাল পালসি, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, স্থূলতা, বাক ও ভাষার প্রতিবন্ধকতা, এডিএইচডি, মানসিক সমস্যা, শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী রোগ।
এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, বিকলাঙ্গতা, পক্ষাঘাত এবং বড় কোনো অস্ত্রোপচারের পর রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা খুবই জটিল ব্যাপার। হাড় ও মাংসপেশির ক্ষয়জনিত রোগ ছাড়া কিছু সংক্রামক রোগও বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক সমস্যার কারণ।
অন্যান্য প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ, নবজাতক এবং শিশু মৃত্যুহার; অপুষ্টি; স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব; সড়ক দুর্ঘটনা; শারীরিক অক্ষমতা এবং অস্ত্রোপচার পরবর্তী পুনর্বাসনের অসুবিধা। মানসিক ও চক্ষুরোগ, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট ইত্যাদির জন্য যেসব সেবা, উপকরণ ও সেবা প্রদানকারী লোকবল প্রয়োজন দেশে সেসবের ঘাটতি আছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ক্রয় ও সংগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণ, ইন্টারনেটভিত্তিক তথ্য প্রবাহ ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কর্মসূচি বাস্তবায়নের পর্যানুসরণ, তত্ত্বাবধান ও মূল্যায়ন কার্যক্রম সঠিক, সময়োপযোগী, কার্যকরী ও শক্তিশালী নয়।
এসব কার্যক্রমে অর্থায়নও অতি অল্প। জনবল ও কর্মসূচির ব্যবস্থাপনা, বাজেট ও পরিকল্পনা প্রণয়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নেতৃত্ব তৈরির যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ভালো কাজের পুরস্কার ও খারাপ কাজের তিরস্কার না থাকার কারণে এবং রাজনৈতিক জবরদস্তির কারণে কর্মসূচি ও কার্যক্রম বাস্তবায়নে সততার অভাব দেখা গিয়েছে।
তাছাড়া, অতিরিক্ত ওষুধ ও অন্যান্য সেবার মূল্য দেশে অনেক মানুষকে আর্থিকভাবে আরও দুর্বল করে দেয়। স্বাস্থ্যসেবায় সরকারের বরাদ্দ অত্যন্ত কম। এই উপমহাদেশে শুধু আফগানিস্তান ও মিয়ানমারই স্বাস্থ্যসেবার জন্য এত কম বরাদ্দ দেয়। স্বাস্থ্যসেবার খরচের বিশাল অংশ জনগণকে নিজের পকেট থেকে ব্যয় করতে হয়। চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে অসন্তুষ্টি আছে, বিশেষত হাসপাতালভিত্তিক সেবা নিয়ে। স্বীয় অর্থায়নে (আউট অফ পকেট) স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার কারণে দেশের ৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ পরিবারকে দারিদ্র্যের মুখে পড়তে হয়।
বিআইডিএস ২০২৪ জরিপে দেখা যায়, শুধু একবার হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সেবা নেওয়ার জন্য নিজস্ব খাত থেকে ব্যয় করতে হয় গড়ে ৫৫হাজার ১৩৪ টাকা। এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্যানুসারে বাংলাদেশে প্রতি ছয়জনের একজন অর্থের অভাবে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে অপারগ হন।
১২মে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে তার কার্যালয়ে ৬৪ জেলার সিভিল সার্জনদের অংশগ্রহণে প্রথমবারের মতো সিভিল সার্জন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।
সেই সভায় প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, শুধু স্বাস্থ্যব্যয় মেটাতে গিয়ে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ দরিদ্র হন। এর ফলে চিকিৎসা, আরও স্পষ্ট করে বললে ওষুধের খরচের কারণে আমাদের অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক খাতের অর্জন অর্থহীন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, মানুষ স্বাস্থ্যে মোট ব্যয়ের ৭০ শতাংশ তার নিজের পকেট থেকে খরচ করে। আবার সেই খরচের দুই-তৃতীয়াংশই ওষুধের পেছনে খরচ করে। এ কারণে ন্যায়সঙ্গত মুনাফার সুযোগ রেখে মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকার কর্তৃক যৌক্তিকভাবে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করা হলে তা দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য কল্যাণকর হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।
এমইউ/এএমএ/এমএস