নতুন সরকারকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জোর দিতে হবে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই গঠিত হতে যাচ্ছে নতুন সরকার। ক্ষমতার মসনদে বসার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন সরকারের সামনে হাজির হবে একগুচ্ছ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে সবচেয়ে জটিল, দীর্ঘমেয়াদি এবং কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন ইস্যু নিঃসন্দেহে রোহিঙ্গা সংকট। এই সংকট আর কেবল মানবিক সহায়তার বিষয় নয় বরং এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। তাই নতুন সরকারের জন্য এটি হবে নীতিগত দৃঢ়তা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং বাস্তববাদী নেতৃত্বের এক বড় পরীক্ষা। ২০১৭ সালে রাখাইনে সামরিক অভিযানের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। অভিযানের নেতৃত্বে ছিল Tatmadaw। বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় সীমান্ত খুলে দেয়। বিশ্ব সম্প্রদায় প্রশংসা করে। মানবতার উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাস্তবতা বদলেছে। প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেছে। প্রত্যাবাসন কার্যত শুরুই হয়নি। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির স্থা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই গঠিত হতে যাচ্ছে নতুন সরকার। ক্ষমতার মসনদে বসার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন সরকারের সামনে হাজির হবে একগুচ্ছ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে সবচেয়ে জটিল, দীর্ঘমেয়াদি এবং কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন ইস্যু নিঃসন্দেহে রোহিঙ্গা সংকট।
এই সংকট আর কেবল মানবিক সহায়তার বিষয় নয় বরং এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। তাই নতুন সরকারের জন্য এটি হবে নীতিগত দৃঢ়তা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং বাস্তববাদী নেতৃত্বের এক বড় পরীক্ষা।
২০১৭ সালে রাখাইনে সামরিক অভিযানের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। অভিযানের নেতৃত্বে ছিল Tatmadaw। বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় সীমান্ত খুলে দেয়। বিশ্ব সম্প্রদায় প্রশংসা করে। মানবতার উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাস্তবতা বদলেছে। প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেছে। প্রত্যাবাসন কার্যত শুরুই হয়নি। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির স্থায়ী রূপ নিতে বসেছে। অস্থায়ী ত্রাণ কাঠামো এখন দীর্ঘমেয়াদি বসতিতে পরিণত হয়েছে।
পাহাড় কেটে ঘর ও বন উজাড় করছে রোহিঙ্গারা। জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়—পরিবেশের ওপর মারাত্মক উদ্বেগজনক। এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। শ্রমবাজারে অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। মাদক ও মানবপাচার, অস্ত্রের বিস্তার এবং শিবিরকেন্দ্রিক সহিংসতা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
নতুন সরকারের সামনে তাই মৌলিক প্রশ্ন—এই সংকটকে কি কেবল ত্রাণ ব্যবস্থাপনার রুটিন ফাইল হিসেবে দেখা হবে, নাকি এটিকে কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হবে?
রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ গভীরভাবে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি নিরাপত্তা ও সামাজিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে। শিবিরে সক্রিয় অপরাধচক্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের মধ্যে অসন্তোষও বাড়ছে। ভূমি ব্যবহার, জীবিকা, অবকাঠামো—সবখানেই সৃষ্টি হচ্ছে বাড়তি চাপ। এই চাপ যদি রাজনৈতিক ক্ষোভে রূপ নেয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন সরকার যদি শুরুতেই সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত নীতি না নেয়, তাহলে রোহিঙ্গা সংকট ভবিষ্যতে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা ছিল তুলনামূলক উদার। United Nations High Commissioner for Refugees (UNHCR) এবং অন্যান্য সংস্থা খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু এখন তহবিল সংকট স্পষ্ট।
বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয় দাতাদের মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছে। ফলে রোহিঙ্গা তহবিল প্রায়ই চাহিদার তুলনায় কম পূরণ হচ্ছে। খাদ্য সহায়তা কমে গেলে হতাশা বাড়ে। হতাশা বাড়লে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ে। এটি শুধু মানবিক সমস্যা নয়—এটি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের ঘোষিত লক্ষ্য স্পষ্ট—স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই লক্ষ্যকে কঠিন করে তুলেছে। সামরিক শাসন, সশস্ত্র সংঘাত, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—এসবের মধ্যে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি।
দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়েছে, তালিকা বিনিময় হয়েছে, কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি নেই। নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ—এসব শর্ত ছাড়া প্রত্যাবাসন কোনভাবেই টেকসই হবে না। তাই শুধু দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন বহুপাক্ষিক চাপ ও সমন্বিত কূটনীতি।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ একা সফল হতে পারবে না। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জোট গড়ে তোলা জরুরি।
প্রথমত, আসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনসকে (আসিয়ান) আরও সক্রিয় করতে হবে। যদিও তাদের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা’ নীতি রয়েছে, তবুও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে তারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা বা সংক্ষেপে ওআইসির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বকে সংগঠিত রাখা দরকার। আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক সমর্থনে ওআইসি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।
তৃতীয়ত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো দেশগুলোকে নিয়ে একটি সমন্বিত কোর গ্রুপ গঠন করা যেতে পারে, যারা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে ধারাবাহিক চাপ বজায় রাখবে।
বাংলাদেশের কূটনীতিতে সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্ন হলো চীন ও ভারত। উভয় দেশই মিয়ানমারের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখে। নতুন সরকারের উচিত হবে এই দুই শক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী ব্লকের অংশ হিসেবে না দেখে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করা। সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, মানবপাচার প্রতিরোধ—এসব ক্ষেত্রে অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। সেই অভিন্ন স্বার্থকে ভিত্তি করেই সমন্বিত অবস্থান তৈরি করা যেতে পারে। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি এখানে অপরিহার্য বলে আমি মনে করি।
আন্তর্জাতিক জোটের পাশাপাশি দেশের ভেতরেও শক্ত নীতি প্রয়োজন। বিশেষ করে শরণার্থী শিবিরে আইনশৃঙ্খলা জোরদার। হোস্ট কমিউনিটির উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ। পরিবেশ পুনরুদ্ধার প্রকল্প। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি। দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা যেন হতাশা ও সহিংসতার জন্ম না দেয়—সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
বিএনপি নতুন ম্যান্ডেট পেয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—এই ম্যান্ডেট কি কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য, নাকি আন্তর্জাতিক পরিসরেও সক্রিয় নেতৃত্বের জন্য ব্যবহার করা হবে? সেটাই এখন দেখার বিষয়।
রোহিঙ্গা সংকট এমন একটি ইস্যু, যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
শেষ কথা:
নতুন সরকারের উচিত হবে শুরু থেকেই পরিষ্কার বার্তা দেওয়া—বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে হবে। সেই দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হলে দরকার জোটভিত্তিক কূটনীতি, কৌশলগত দৃঢ়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধান শুধু একটি মানবিক লক্ষ্য নয় বরং এটি নতুন সরকারের নেতৃত্বের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরীক্ষা।
লেখক:
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]
What's Your Reaction?