আমি রাজনীতির কোনো মানুষ নই, ক্ষমতার মঞ্চে আমার কোনো আসন সংরক্ষিত নেই। ‘বিশ্লেষক’ অভিধাটিও আমার নামের পাশে বসে স্বস্তি পায় না। আমি কেবল একজন শব্দের শ্রমিক, সংবাদ সংগ্রহ করি, সত্যের ধুলো ঝাড়ি, আর সময়ের কণ্ঠস্বর শুনে তাকে ভাষা দিই। তবু এমন কিছু মুহূর্ত সামনে আসে, যখন নীরব থাকাও এক ধরনের বক্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। শব্দেরা নিজে থেকেই তখন জেগে ওঠে, আর সাদা কাগজের ভেতর কালো কালির আলোড়ন তোলে।
ছোটবেলায় আমার বাবা বলতেন, ‘সাংবাদিকতা এক অদ্ভুত সাধনা। এখানে একটিমাত্র পেশা সম্পর্কে জানলেই চলবে না; জানতে হবে সব পেশার মানুষকে। হতে হবে অল-ইন ওয়ান।’ তার সেই কথায় আমি বুঝতাম একজন সত্যিকারের সাংবাদিকের ভেতরে একটু ডাক্তার থাকতে হয়, যাতে সমাজের অসুখ শনাক্ত করতে পারে; একটু ইঞ্জিনিয়ার থাকতে হয়, যাতে ভাঙা কাঠামোর নকশা বুঝতে পারে; একটু পাইলট থাকতে হয়, যাতে দূর আকাশ থেকে সামগ্রিক দৃশ্য দেখা যায়; একটু উকিল থাকতে হয় যেন আইনের ধার সম্পর্কে জনা থাকে। আবার একটু মুচি, রিকশাচালক, কৃষক, দিনমজুরও থাকতে হয়, যাতে মাটির ঘ্রাণ না হারায়। কারণ রাষ্ট্রের গল্প কেবল সংসদ ভবনের মার্বেলে লেখা হয় না; তা লেখা হয় ধুলোমাখা পথেও, ঘামে ভেজা শার্টেও, শস্যের দানায়ও।
বাবার সেই শিক্ষা আমাকে শিখিয়েছে সাংবাদিকের কোনো গন্ডি নেই। তার সীমানা মানচিত্রের রেখায় নয়, বিবেকের ভেতরে। বাবার শিক্ষা আর নিজের দায়বোধ থেকেই আজ দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছু বলতে চাই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিরঙ্কুশ রায় কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার সমাপ্তি নয়, বরং নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের ব্যালটে লেখা হয়েছে জনতার প্রত্যাশা, আর সেই প্রত্যাশা আজ পাহাড়সম ভার হয়ে নেমে এসেছে নতুন সরকারের কাঁধে। বিজয়ের উল্লাস যত দ্রুত স্তিমিত হয়, দায়িত্বের নীরব আহ্বান তত গভীর হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র পরিচালনা মানেই কেবল ক্ষমতার আসনে বসা নয়; এটি আস্থা রক্ষার এক অবিরাম সাধনা। মানুষ উন্নয়নের পরিসংখ্যান নয়, ন্যায়বোধের আশ্বাস চায়; প্রতিশ্রুতির অলঙ্কার নয়, বাস্তবতার স্বস্তি চায়। শপথ নিতে যাওয়া নতুন সরকারের সামনে তাই এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তারা কি বিজয়কে অলংকার বানাবে, নাকি দায়িত্বের শপথে রূপ দেবে? ইতিহাস আজ অপেক্ষায়, আস্থার স্থপতি হয়ে ওঠার, অথবা সময়ের আরেকটি অধ্যায় হয়ে থাকার।
বিগত স্বৈরতান্ত্রিক অধ্যায়ের পর রাষ্ট্রের অর্থনীতি যেন ভোরের আগে সেই ধূসর মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আলো ফুটতে চায়, কিন্তু কুয়াশা এখনো কাটেনি। আর্থিক খাতের ভেতরে যে অনিয়ম, লুটপাট ও অর্থ-পাচারের গভীর খাদ সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রতিধ্বনি আজও বাজে ব্যাংকের করিডরে, বাজারের দরপত্রে, আর সাধারণ মানুষের হাহাকারে। ক্ষত শুকোয়নি; শুধু তার ওপর পাতলা প্রলেপ পড়েছে।
অন্তর্বতী সরকারের উদ্যোগ ছিল সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, শুদ্ধতার অঙ্গীকার। কিন্তু কাঠামোগত অবক্ষয়ের যে শেকড় বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত তা ছেঁটে ফেলা সহজ নয়। ফলে গতি হয়েছে ধীর আর প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান থেকেছে বিস্তর। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা সঞ্চয়, প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতা এসব যেন আশার ছোট ছোট প্রদীপ জ্বলার আগেই নিভে যায় যখন দেশের অর্থনীতির বিস্তৃত প্রান্তরে উদ্বেগের ছায়া দীর্ঘতর। ডলারের ঊর্ধ্বমুখী দাম আমদানিনির্ভর বাজারকে করে তুলেছে অস্থির; রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ; আর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের মন্থরতা স্পষ্ট করে দিয়েছে বিনিয়োগের সাহস কমেছে, কর্মসংস্থানের দিগন্ত সঙ্কুচিত হয়েছে।
এই চলমান বাস্তবতায় নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে কঠিন শব্দটি উচ্চারিত হয় এক নিঃশ্বাসে মূল্যস্ফীতি। এটি কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রতিদিনের বাজারের ঝুড়িতে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস। যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নাগালের বাইরে সরে যায়, তখন উন্নয়নের সব পরিভাষা অর্থহীন হয়ে পড়ে। অতএব সময়ের দাবি কেবল নীতি-প্রণয়নের নয়, আস্থার পুনর্গঠনের; কেবল পরিসংখ্যানের উন্নতির নয়, মানুষের জীবনে স্বস্তির প্রত্যাবর্তনের। অর্থনীতির এই সন্ধিক্ষণে দৃঢ়তা, স্বচ্ছতা ও দূরদৃষ্টিই হতে পারে নতুন ভোরের পূর্বাভাস।
অর্থনীতিবিদ ও নীতি-বিষেজ্ঞদের অভিমত, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সামনে প্রধান অগ্রাধিকার হবে আর্থিক খাতে শুরু হওয়া সংস্কার কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়া। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে বেড়ে ওঠা খেলাপিঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে আনা তাদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ স্থিতিশীলতা ফেরাতে সংস্কারের গতি বজায় রাখা এবং ঋণ শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এই দুই পথেই সরকারকে সমান দৃঢ়তা দেখাতে হবে।
নতুন সরকারের সূচনা মানেই কেবল শপথের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি এক ভারী দায়ভার কাঁধে তুলে নেয়ার মুহূর্ত। তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে, তাদের সামনে বাস্তব যে মানচিত্র উন্মুক্ত তা রঙিন নয়, বরং দাগে দাগে চিহ্নিত সংকটের রেখায়। জনমতের প্রত্যাশা যেমন প্রবল, তেমনি সময়ও নির্মমভাবে হিসাব চাইবে।
রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা যে শূন্যতা ও অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করেছে, তা পূরণ করা হবে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। প্রশাসনিক কাঠামোর পুনর্গঠন, নীতি প্রণয়নে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা এবং আস্থাহীনতার দেয়াল ভেঙে নতুন কর্মসংস্কৃতি গড়ে তোলা এসবই দাবি করে ধৈর্য, দক্ষতা ও দৃঢ়তা।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও দৃশ্যপট কম জটিল নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সংকুচিত; ব্যাংকঋণের বাড়তি সুদ বিনিয়োগকে করেছে শ্লথ; উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে অনিশ্চয়তা কর্মসংস্থানের পথকে করেছে কণ্টকাকীর্ণ। এই বাস্তবতায় কেবল নীতির ঘোষণা যথেষ্ট নয় প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা।
পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা, আন্তর্জাতিক আস্থার পুনর্গঠন এবং আইনশৃঙ্খলায় দৃশ্যমান স্থিতি ফিরিয়ে আনা সবকিছু মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে রয়েছে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব-রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে একদিকে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমন্বয় এই সূক্ষ্ম সমীকরণ সামলাতে প্রয়োজন বিচক্ষণ নেতৃত্ব।
এদিকে ১৭ বছর পর দেশে ফিরে তারেক রহমানের উচ্চারণ ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ রাজনীতির ভাষায় একটি অঙ্গীকার। এখন সেই অঙ্গীকারের পরীক্ষাকাল। পরিকল্পনা কেবল কাগজে নয়, বাস্তবতায় কতটা রূপ পায়, সেটিই নির্ধারণ করবে সরকারের পথচলার সাফল্য।
আমরা আশা করতে পারি, নতুন সরকার সংকটকে অজুহাত নয় বরং রূপান্তরের সুযোগ হিসেবে দেখবে। কারণ একটি জাতির অগ্রযাত্রা নির্ভর করে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনে নয় বরং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে। সময় এসেছে আস্থা পুনর্গঠনের, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার এবং রাষ্ট্রকে একটি সুসংগঠিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নেওয়ার। পথ কঠিন তবু নেতৃত্বের সাহস ও দূরদৃষ্টি থাকলে ইতিহাস অনেক সময় নতুন অধ্যায় লিখতে দ্বিধা করে না।
লেখক : মুসফিকুর রহমান সুভ, সাংবাদিক ও কলাম লেখক